বৃষ্টি-বন্যায় কমেছে চাহিদা, আনারস নিয়ে হতাশ মধুপুরের ‍কৃষক

মির্জা শাকিল
মির্জা শাকিল

ভোরের আলো ফোটার আগেই টাঙ্গাইলের মধুপুরের জলছত্র বাজারে একে একে এসে থামে সারি সারি সাইকেল ও ভ্যান। প্রতিটি সাইকেলের পেছনে স্তূপ করে সাজানো শত শত আনারস। হলুদ-সবুজ রঙের ফলগুলো দূর থেকে দেখলে মনে হয়, প্রকৃতি যেন তার সবচেয়ে মিষ্টি উপহারগুলো এখানে এনে সাজিয়ে রেখেছে। কিন্তু সেই রঙিন দৃশ্যের আড়ালে আছে কৃষকের দীর্ঘশ্বাস, অনিশ্চয়তা ও লোকসানের গল্প।

একসময় যে আনারস বিক্রি করে কৃষকের মুখে হাসি ফুটত, এবার সেই আনারসই যেন তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) স্বীকৃত মধুপুরের আনারস এখন মৌসুমে কম দামে বিক্রি হচ্ছে। পাইকারি বাজারে মাঝারি আকারের একটি আনারসের দাম মাত্র ১৫ থেকে ২০ টাকা। বড় আকারের আনারস বিক্রি হচ্ছে ৩০ থেকে ৩৫ টাকায়।

একসময় যে আনারস বিক্রি করে কৃষকের মুখে হাসি ফুটত, এবার সেই আনারসই যেন তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একসময় যে আনারস বিক্রি করে কৃষকের মুখে হাসি ফুটত, এবার সেই আনারসই যেন তাদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ছবি: মির্জা শাকিল/স্টার

চাষিরা জানান, চারা, সার, সেচ, শ্রমিক ও রক্ষণাবেক্ষণসহ একটি আনারস উৎপাদন করতে আনুমানিক ২৫ থেকে ৩০ টাকা খরচ হয়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই উৎপাদন খরচও তুলতে পারছেন না কৃষকেরা।

বাজারে দাঁড়িয়ে হতাশা প্রকাশ করেন ইসহাক আলী। তিনি বছরের পর বছর ধরে তিনি আনারস চাষ করছেন। কিন্তু এমন দুরবস্থা আগে খুব একটা দেখেননি।

‘এভাবে চলতে থাকলে আনারস চাষ ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না,’ এভাবেই বললেন ইসহাক আলী।

এবারের এই দরপতনের পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ। টানা বর্ষণ, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা এবং সড়ক যোগাযোগে বিঘ্ন ঘটায় বড় শহরগুলোর বাজারে ফলের চাহিদা কমে গেছে। যেসব শহরে মধুপুরের অধিকাংশ আনারস যায়, সেখানে ক্রেতার সংখ্যা কমেছে, কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, টানা বৃষ্টির কারণে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে গেছে। ফলে একসঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামও দ্রুত কমেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, টানা বৃষ্টির কারণে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে গেছে। ফলে একসঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামও দ্রুত কমেছে। ছবি: মির্জা শাকিল/স্টার

মধুপুরের সবচেয়ে বড় আনারসের বাজার জলছত্র বাজারের ব্যবসায়ী চান মিয়া বহু বছর ধরে এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এবারের বাজার তাকে বিস্মিত করেছে।

তিনি বলেন, ‘গত বছর বড় আনারস ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি করেছি। এবার একই আকারের আনারস ৩০ থেকে ৩৫ টাকার বেশি বিক্রি করতে পারছি না। কেন এমন হলো, আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না। বন্যার প্রভাব হতে পারে, আবার মানুষের হাতে টাকাও হয়তো কম।’

বৃষ্টির আরেকটি প্রভাব পড়েছে ফলনেও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, টানা বৃষ্টির কারণে একই সময়ে বিপুল পরিমাণ আনারস পেকে গেছে। ফলে একসঙ্গে বাজারে সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় দামও দ্রুত কমেছে।

কৃষক তারিকুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও একই। তার মতে, বাজারে সরবরাহ সামান্য কমলেই আনারসের দাম আবার বাড়তে পারে।

,গত কয়েক বছরে ভালো লাভের আশায় অনেক কৃষক কলা চাষ ছেড়ে আনারস চাষে ঝুঁকেছেন।
,গত কয়েক বছরে ভালো লাভের আশায় অনেক কৃষক কলা চাষ ছেড়ে আনারস চাষে ঝুঁকেছেন। ছবি: মির্জা শাকিল/স্টার

এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে উৎপাদন বৃদ্ধিও। মোটর বাজারের ব্যবসায়ী শামসুল আলম বলেন,গত কয়েক বছরে ভালো লাভের আশায় অনেক কৃষক কলা চাষ ছেড়ে আনারস চাষে ঝুঁকেছেন। ফলে উৎপাদন বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে বাড়েনি চাহিদা। অতিরিক্ত সরবরাহের চাপ এখন উল্টো কৃষকের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ‘এখন ফলের ভরা মৌসুম, তাই দাম কম।’

টাঙ্গাইলের মধুপুর কেবল একটি উপজেলা নয়, বাংলাদেশের আনারস উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র।

টাঙ্গাইলের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা নার্গিস আক্তারের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ মৌসুমে টাঙ্গাইল জুড়ে ৭ হাজার ৭৭৩ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ করা হয়েছে, যার মধ্যে শুধু মধুপুরেই ৬ হাজার ৬৪০ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে এবং এর থেকে ২ দশমিক ৮৭ লাখ টন ফলন হয়েছে।

টাঙ্গাইলের মধুপুর কেবল একটি উপজেলা নয়, বাংলাদেশের আনারস উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র।
টাঙ্গাইলের মধুপুর কেবল একটি উপজেলা নয়, বাংলাদেশের আনারস উৎপাদনের প্রাণকেন্দ্র। ছবি: মির্জা শাকিল/স্টার

২০২৫-২৬ সালে চাষের জমি সামান্য বেড়ে ৭ হাজার ৭৯৪ হেক্টর হয়েছে এবং উৎপাদিত ফসলের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৮৮ লাখ টন।

চলতি ২০২৬-২৭ মৌসুমের জমি ও উৎপাদনের পরিসংখ্যান এখনও পাওয়া যায়নি বলে জানান তিনি।

কৃষকদের দাবি, শুধু উৎপাদন বাড়ানোর পরামর্শ দিলেই হবে না। প্রয়োজন আনারস সংরক্ষণের আধুনিক ব্যবস্থা, কোল্ড স্টোরেজ, প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং এমন একটি বাজারব্যবস্থা, যেখানে কৃষক ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে পারবেন। তাহলেই মৌসুমভিত্তিক দামের বড় ওঠানামা কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।