এনইআইআর কি নজরদারির কাজে ব্যবহার হবে?

মাহমুদুল হাসান
4 January 2026, 16:01 PM

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর সময় সরকার এটাকে প্রযুক্তিগত ও নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। এর উদ্দেশ্য অবৈধ মোবাইল ফোন বন্ধ করা, চুরি হওয়া ডিভাইস ব্লক করা এবং দেশের বিশৃঙ্খল হ্যান্ডসেট বাজারে শৃঙ্খলা আনা।

তবে এনইআইআর চালুর পর থেকেই একটি প্রশ্ন আসছে যে, এই ব্যবস্থা কি শেষ পর্যন্ত নজরদারির (সার্ভেইলেন্স) কাজে ব্যবহার হতে পারে?

সরকারিভাবে এনইআইআরকে নজরদারি ব্যবস্থা নয়, বরং একটি নিয়ন্ত্রণ (রেগুলেটরি) ব্যবস্থা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবু নজরদারির প্রশ্ন নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।

এনইআইআর মূলত ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি (আইএমইআই), সিম কার্ড নম্বর বা এমএসআইএসডিএন এবং ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল সাবস্ক্রাইবার আইডেন্টিটি—নেটওয়ার্কে আসা ডিভাইসের এই তিন তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা।

এনইআইআরের জাতীয় ডেটাবেজে দেশে চালু থাকা সব মোবাইল ফোন ও সংযুক্ত সিমের তথ্য  সংরক্ষণ করা হয়। প্রতিটি মোবাইল ফোনের একটি ১৫ সংখ্যার অনন্য আইএমইআই নম্বর থাকে, যা ডিভাইসটির জন্য নির্দিষ্ট পরিচয় তুলে ধরে। একইভাবে প্রতিটি সিম কার্ড ও ফোন নম্বরও নির্দিষ্ট করা যায়।

এনইআইআর এই সব তথ্য একত্র করে একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থায় জমা রাখে। কোনো ফোন যখন মোবাইল নেটওয়ার্কে সংযুক্ত হয়, তখন সেটি বৈধ ও কার্যকর হবে কি না, তা নির্ধারণে এর তথ্য এনইআইআর ডেটাবেজের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হয়।

ডিভাইস নিয়ন্ত্রণের দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি যুক্তিসঙ্গত। কেননা, চুরি হওয়া ফোন ব্লক করা, চোরাই বা নকল হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্কে সংযুক্ত না করার ক্ষেত্রে এই পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব। এতে একদিকে ব্যবহারকারীরা যেমন নিরাপদ নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা পাবেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত এই খাতের ওপর সরকার নিয়ন্ত্রণ আনতে পারবে।

তবে এই কার্যকার ব্যবস্থাই নতুন করে উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে।

একটি নির্দিষ্ট ডিভাইস, একটি সিম কার্ড এবং একটি ফোন নম্বরকে স্থায়ীভাবে যুক্ত করার ফলে এনইআইআর প্রত্যেক মোবাইল ব্যবহারকারীর জন্য একটি শক্তিশালী ডিজিটাল পরিচয় তৈরি করে। যদিও এই ব্যবস্থা সরাসরি ফোনকল শোনা বা আড়ি পেতে মেসেজ পড়ার মতো প্রচলিত নজরদারির মতো কাজ করে না। কিন্তু এর মাধ্যমে কোন ডিভাইস কোন সিম সংযুক্ত করে ব্যবহার হচ্ছে এবং সেটি কখন নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে—সরকার এ তথ্য জানতে সক্ষম হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল ফোন সবসময়ই নেটওয়ার্ক টাওয়ারের সঙ্গে সংযুক্ত থাকে, এমনকি কল না করলেও থাকে। ফলে টেলিকম নেটওয়ার্কে বিপুল পরিমাণ মেটাডেটা তৈরি হয়। এই তথ্য যখন একটি কেন্দ্রীয় সিস্টেমে জমা হয়, তখন ডিভাইস ব্যবহার, স্থান পরিবর্তন ও যোগাযোগের ধরন বিশ্লেষণ করা তুলনামূলক সহজ হয়ে যায়। বিশেষ করে ভবিষ্যতে এই সিস্টেমকে অন্য ডেটাবেজের সঙ্গে যুক্ত করা হলে তার ব্যবহার বহুমাত্রিক হতে পারে। আর এখানেই নজরদারির কথা চলে আসে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট খাতের এক বিশেষজ্ঞ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এনইআইআর নিজে কোনো নজরদারি ব্যবস্থা নয়। এটি কল মনিটর করে না, বার্তা আটকায় না বা ইন্টারনেট কার্যক্রমে আড়ি পাতে না। এসব কাজ আলাদা "ল-ফুল ইন্টারসেপশন" ব্যবস্থার আওতায় পড়ে।'

'এনইআইআর সরাসরি আপনাকে নজরদারি না করলেও, অন্য সিস্টেমে যুক্ত হলে নজরদারিকে সহজ করে তুলতে পারে,' বলেন তিনি।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ ধরনের ব্যবস্থা চালু আছে। ভারত ও পাকিস্তানসহ বহু দেশে এ ধরনের ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম চালু আছে, যদিও সেগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে নজরদারি ব্যবস্থা বলা হয় না।

অস্ট্রেলিয়ায় হারানো বা চুরি যাওয়া ফোন সব নেটওয়ার্কে ব্লক করার জন্য একটি সেন্ট্রাল ব্যবস্থা আছে। সরকার নয় বরং অস্ট্রেলিয়ান মোবাইল টেলিকমিউনিকেশনস অ্যাসোসিয়েশন (এএমটিএ) এই ব্যবস্থা পরিচালনা করে।

যুক্তরাজ্যে ফোন হারালে নেটওয়ার্ক অপারেটর আইএমইআই ব্লক করে দেয়, ফলে নতুন সিম দিয়েও সেটি ব্যবহার করা যায় না।

অটোমেশন বিশেষজ্ঞ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক বইয়ের লেখক রাকিবুল হাসান ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ডিজিটাল আর্থিক সেবা ও অনলাইন বুকিং প্ল্যাটফর্মে বর্তমানে ব্যাপক হারে প্রতারণা চলছে। এসব ক্ষেত্রে ডিভাইস শনাক্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ডিজিটাল অর্থনীতির দিকে দ্রুত এগোনোর প্রেক্ষাপটে একটি সঠিক এনইআইআর ব্যবস্থা প্রতারণা কমাতে সহায়ক হতে পারে।'

তিনি বলেন, 'যেসব দেশে শক্তিশালী এ ধরনের কাঠামো রয়েছে, সেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র, মোবাইল নম্বর ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশন ব্যবস্থা একীভূতভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে এনআইডি ব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি মোবাইল নম্বর ও ডিভাইসের সঙ্গে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়নি।'

নজরদারি উদ্বেগ বিষয়ে রাকিবুল হাসান বলেন, 'এনইআইআর ব্যবস্থাকে অবশ্যই কঠোর আইনি সুরক্ষার আওতায় পরিচালনা করতে হবে। ডেটা অ্যাক্সেস, ডিভাইস ব্লক বা অন্য সিস্টেমের সঙ্গে সংযুক্তির ক্ষেত্রে বিচারিক বা আধা-বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।'

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) সাবেক সভাপতি ফাহিম মাশরুর বলেন, 'আমার কাছে এনইআইআরকে নজরদারি ব্যবস্থা মনে হয় না। এটি নির্দিষ্ট কাউকে লক্ষ্য করে তৈরি নয়, বরং একটি সার্বিক ব্যবস্থা। অনলাইন জুয়া ও আর্থিক প্রতারণা মোকাবিলায় এনইআইআর সহায়তা করতে পারে।'

নজরদারি প্রসঙ্গে মানবাধিকারকর্মী রেজাউর রহমান লেনিন বলেন, 'এনইআইআর নিয়ে একটি ভুল ধারণা তৈরি হয়েছে। এটি নজরদারি টুল নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র যোগাযোগ নজরদারির ক্ষেত্রে আইনসম্মত, সময়োপযোগী ও সঠিক সুরক্ষা নিশ্চিত করছে কি না।'

'নিরাপত্তা ও গোপনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য রাখতে আইনের বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা, সামঞ্জস্য, স্বচ্ছতা ও যথাযথ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা জরুরি,' যোগ করেন তিনি।

তবে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান অন্য ধরনের একটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন, 'অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা সাইবার সিকিউরিটি অর্ডিন্যান্স, ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা অর্ডিন্যান্স ও জাতীয় ডেটা গভর্ন্যান্স অর্ডিন্যান্স—এই সবগুলো মিলিয়ে রাষ্ট্রের হাতে জবাবদিহিহীন নজরদারি সক্ষমতা তৈরি হয়েছে।'

তার মতে, এনইআইআর থেকে পাওয়া তথ্য এই নজরদারি ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে পারে, যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গোপনীয়তার অধিকারের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

এ বিষয়ে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, 'গত ২৪ ডিসেম্বর উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত সংশোধিত টেলিকম অর্ডিন্যান্সে ডিভাইস ব্যবহারকারীদের সুরক্ষার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। এই অর্ডিন্যান্সে সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে নাগরিকদের ওপর নজরদারি বা হয়রানি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।'