বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও জ্বালানি সংকটে দুর্বল হচ্ছে মোবাইল নেটওয়ার্ক
‘দিনে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ থাকে না। বিদ্যুৎ চলে গেলে নেটওয়ার্কও থাকে না। বেশিরভাগ সময় ফোনে কথা বলতেই পারি না’—কথাগুলো বলছিলেন ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার চর বাহাদুরপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. মোশাররফ।
মোবাইল অপারেটর ও টাওয়ার কোম্পানিগুলো বলছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়ে গেছে। জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে নেটওয়ার্কের মান খারাপ।
বিদ্যুৎ না থাকলে অপারেটররা টাওয়ার সাইটে ব্যাটারি ব্যাকআপের ওপর নির্ভর করে। তবে বেশিরভাগ সাইটে ব্যাকআপ সক্ষমতা মাত্র চার থেকে ছয় ঘণ্টা।
রবি আজিয়াটার প্রধান করপোরেট ও নিয়ন্ত্রক বিষয়ক কর্মকর্তা শাহেদ আলম বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিভ্রাট চার থেকে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় স্থায়ী হলে ব্যাটারি রিচার্জ করার কোনো উপায় থাকে না।’
এরপর মোবাইল অপারেটরদের ভরসা জেনারেটর। তবে মাত্র প্রায় ২৫ শতাংশ টাওয়ারে স্থায়ী জেনারেটর রয়েছে। ফলে অনেককে বহনযোগ্য ইউনিটের ওপর নির্ভর করতে হয়।
‘আরও দুর্ভোগ হলো, আমরা টাওয়ার ও গুরুত্বপূর্ণ ডেটা সেন্টারগুলোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ পাচ্ছি না,’ বলেন শাহেদ।
দেশে মোট ৪৬ হাজার ৫৬৭টি টেলিকম টাওয়ার রয়েছে। এগুলো পরিচালনা করে টাওয়ার অবকাঠামো কোম্পানি ও মোবাইল অপারেটররা। এর মাধ্যমে ১৮ দশমিক ৫৮ কোটিরও বেশি গ্রাহক নেটওয়ার্ক সেবা পান। আর সারা দেশে অপারেটরদের প্রায় ২৭টি ডেটা সেন্টার রয়েছে।
টাওয়ার কোম্পানিগুলো গতকাল আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, জ্বালানি সংকট সারা দেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত করতে পারে।
বাংলাদেশ টাওয়ারকো অ্যাসোসিয়েশনের অন্তর্বর্তীকালীন সভাপতি ও ইডিওটিসিও বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজিং ডিরেক্টর সুনীল আইজ্যাক বলেন, ‘বাংলাদেশের সংযোগ ব্যবস্থার ওপর বাস্তব ও তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি হয়েছে।’
তিনি বলেন, টেলিকম খাত সব ধরনের ডিজিটাল ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের ভিত্তি। এটিকে ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না।
‘জ্বালানি বণ্টন ও সরবরাহ কাঠামোতে টেলিকম খাতকে অগ্রাধিকার না দিলে ধারাবাহিক বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হবে। এটি ব্যবসা, জরুরি সেবা ও দৈনন্দিন জীবনে প্রভাব ফেলবে। নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা এখন আর শুধু একটি খাতের বিষয় নয়; এটি জাতীয় প্রয়োজন,’ যোগ করেন তিনি।
টাওয়ার কোম্পানিগুলোর রিমোট মনিটরিং সেন্সরের মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্য অনুসারে, গত এক মাসে টাওয়ার সাইটগুলো চাহিদার বিপরীতে কম বিদ্যুৎ পাচ্ছে।
পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, মার্চের প্রথম সপ্তাহ থেকে এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহের মধ্যে ১২টি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ৯৩ শতাংশ থেকে কমে ৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে।
একটি টাওয়ার কোম্পানির কর্মকর্তা বলেন, দেশে হাজার হাজার টাওয়ার পরিচালনা অপারেটররা নিয়মিত কী পরিমাণ বিদ্যুৎ পাচ্ছে তা পর্যবেক্ষণ করে।
সুনীল বলেন, ‘আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেছি।’ এই কঠিন সময় মোকাবিলায় জ্বালানিতে প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার এবং নীতিগত সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এই কর্মকর্তা আরও মনে করেন, ডিজিটাল নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরতার পরিমাণ বিবেচনায় আগাম ও সমন্বিত পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহে মোবাইল অপারেটররা টেলিকম নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে অন্তত দুটি চিঠি পাঠিয়ে দেশব্যাপী আসন্ন বিঘ্নের আশঙ্কার কথা জানানো হয়েছে। অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ জানিয়েছে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে তাৎক্ষণিক সরকারি হস্তক্ষেপ ছাড়া টেলিকম কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
কারণ দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ বিভ্রাটে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো তারা ডিজেল জেনারেটরের মাধ্যমে চালাতে বাধ্য হচ্ছেন, জানিয়েছে সংস্থাটি।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অপারেটরদের বেস ট্রান্সসিভার স্টেশন (বিটিএস) পরিচালনায় প্রতিদিন ৫২ হাজার লিটারের বেশি ডিজেল এবং প্রায় ২০ হাজার লিটার অকটেন ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি ডেটা সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় আনুমানিক ৫০০ থেকে ৬০০ লিটার ডিজেল, অর্থাৎ প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার লিটার ব্যবহার করে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাকআপ বিদ্যুতের ওপর দীর্ঘ দিন নির্ভর করা যেতে পারে না। টাওয়ার সাইটের বিপরীতে ডেটা সেন্টার কল রাউটিং ও ইন্টারনেট ট্রাফিক পরিচালনা করে। এই স্তরে কোনো ‘শাটডাউন’ পুরো নেটওয়ার্কে বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি মোবাইল অপারেটরের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘যদি জ্বালানি ব্যবস্থাপনা করা না যায় এবং ডেটা সেন্টার বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে ব্যাপক কল ড্রপ, ইন্টারনেট বিভ্রাট ও সেবা বন্ধ হয়ে যাবে।’
যোগাযোগ করা হলে গ্রামীণফোনের প্রধান করপোরেট অ্যাফেয়ার্স কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ বলেন, ‘সারা দেশে নিরবচ্ছিন্ন টেলিকম সেবা বজায় রাখতে বর্তমান পরিস্থিতিতে সময়োপযোগী ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ প্রয়োজন।’
অগ্রাধিকারভিত্তিক বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা, জ্বালানি সরবরাহ সহজ করা ও জরুরি প্রয়োজনে জ্বালানি পরিবহন সহজ করতে সরকারের সহায়তা প্রয়োজন বলেও মত দেন তিনি।
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বলেন, ‘আমরা এক মাসের বেশি সময় ধরে সমন্বয়ের চেষ্টা করছি এবং টেলিকম মন্ত্রণালয় ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে কথা বলেছি। কিছু জায়গায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সরবরাহ দেওয়া হয়েছে।’
কিছু টাওয়ার সাইটে জ্বালানি সরবরাহ কম—স্বীকার করেন তিনি।
এমদাদ আরও জানান, এই পরিস্থিতির উন্নয়নে নিয়ন্ত্রক সংস্থা আগামীকাল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন এবং সপ্তাহের শেষে অন্যান্য অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করবে।