২০২৬ সালে কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বাংলাদেশের অর্থনীতি?

আহসান হাবিব
আহসান হাবিব
1 January 2026, 06:20 AM

টানা কয়েক বছর অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার পর ২০২৬ সাল নিয়ে নতুন করে সতর্ক আশা কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা।

তাদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন দেশের অর্থনীতিতে আস্থা ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।

এই স্থিতিশীলতার সুফল হিসেবে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময় ধরে যে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে, তা ২০২৬ সালে কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

তাদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা এবং দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে স্থিতিশীলতা ফিরতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতির চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে, কারণ নতুন সরকারকে নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় নিতে হবে।

এরই মধ্যে স্বস্তির খবর এসেছে বৈদেশিক লেনদেন ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে। গত এক বছরে অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির বড় ঘাটতিগুলো সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে এবং রিজার্ভ কমে যাওয়ার ধারা থামাতে সফল হয়েছে।

২০২৫ সালে আর্থিক খাত ছিল বড় চাপের মধ্যে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ায় ২০২৬ সালে ঋণপ্রদান ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে কিছুটা শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, নতুন বছরের সবচেয়ে বড় আশার বিষয় হলো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। তার মতে, নতুন সরকারকে এই রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কাজে লাগিয়ে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।

পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এম মাসরুর রিয়াজও একই মত পোষণ করেন। তিনি বলেন, আগামী বছরের সবচেয়ে বড় আশার জায়গা জাতীয় নির্বাচন।

তিনি মনে করেন, চলমান সংস্কার ও পাঁচ বছরের নীতিগত স্থিরতা ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগে আগ্রহ বাড়াবে। এতে কর্মসংস্থান বাড়বে, মানুষের আয় ও কেনাকাটার ক্ষমতা বাড়বে, আর অর্থনীতিও গতি পাবে।

রিয়াজ আরও বলেন, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা থাকলে বিদেশি বিনিয়োগকারী, বাণিজ্য অংশীদার ও উন্নয়ন সহযোগীরা আরও সক্রিয় হবে। পাশাপাশি বড় কোনো বৈশ্বিক সংকট না এলে জ্বালানি ও খাদ্যের কম দাম এবং শক্তিশালী বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থা প্রবৃদ্ধিকে সহায়তা করবে।

অন্যদিকে সিপিডির মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৫ সালের অনেক সমস্যা ২০২৬ সালেও থেকে যাবে। বিনিয়োগ এখনো ধীরগতির, আর মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

তিনি বলেন, বাজার তদারকি ও সরবরাহপক্ষের উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি বাড়তে থাকা ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দিতে সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য করব্যবস্থাকে ডিজিটাল করা, ভ্যাট ফাঁকি কমানো এবং আরও মানুষকে আয়কর ব্যবস্থার আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।

তার মতে, আয় ও সম্পদের বৈষম্য কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধীর হয়ে পড়েছে, যা ব্যবসার খরচ কমানো, দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা এবং বিশেষায়িত শিল্পপার্ক গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পণ্য ও রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার কথা বহুদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় এসব উদ্যোগ এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।

এম মাসরুর রিয়াজ ২০২৬ সালের জন্য চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। প্রথমত, চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দেশের ভেতরের চাহিদাসহ যেসব খাতের গতি কমে গেছে, সেগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করা। তৃতীয়ত, ব্যাংক, বিমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারসহ পুরো আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। চতুর্থত, একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

তিনি বলেন, কিছু উন্নতি হলেও মূল্যস্ফীতি এখনো বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির প্রায় ২২ শতাংশের কাছাকাছি আটকে আছে। রপ্তানি ও পণ্যের বৈচিত্র্যও এখনো দুর্বল। গত ১৫ মাসে ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলো খুব কম লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা পেয়েছে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) সভাপতি কামরান টি রহমান বলেন, এখন সবার নজর নির্বাচনের দিকে। নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হলে এবং একটি গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় এলে তারা অর্থনৈতিক সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করবে।

তিনি আরও বলেন, একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে সংলাপের সুযোগ বাড়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির বিষয়ে আগাম ধারণা পাওয়া যায়, যা উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়ায়। তার মতে, গণতান্ত্রিক সরকার এলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি হবে।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, এসব পরিবর্তন রাতারাতি আসবে না।