ডিসেম্বরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ
কয়েক মাসের স্বস্তির রেশ কাটতে না কাটতেই আবার বাড়তে শুরু করেছে মূল্যস্ফীতির চাপ। ডিসেম্বর মাসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বেড়েছে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গতকাল সোমবার ডিসেম্বর মাসের মূল্যস্ফীতির চিত্র প্রকাশ করেছে। এতে দেখা গেছে, বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৪৯ শতাংশ।
এর আগের মাস নভেম্বরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ, আর অক্টোবরে নেমে আসে গত ৩৯ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ৮ দশমিক ১৭ শতাংশে।
সর্বশেষ এই মূল্যবৃদ্ধিতে গ্রাম ও শহর—উভয় এলাকার নিম্ন ও নির্দিষ্ট আয়ের মানুষের জীবনে খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের খরচে নতুন করে চাপ বাড়িয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর মুদ্রানীতি থাকা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। তাদের ভাষ্য, এই মূল্যবৃদ্ধির মূল কারণ বাড়তি চাহিদা নয়, বরং সরবরাহপক্ষের সীমাবদ্ধতা ও কাঠামোগত দুর্বলতাই এখানে বড় ভূমিকা রাখছে।
এই পরিস্থিতিতে বর্তমান উচ্চ নীতি সুদের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও আপাতত ঋণের সুদহার উচ্চ রাখার পক্ষেই মত দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা। একই সঙ্গে বাজার তদারকি আরও জোরদার করার প্রয়োজনীয়তার কথাও সামনে এসেছে।
ডিসেম্বরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সামান্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৭১ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল ৭ দশমিক ৩৬ শতাংশ। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়ায় এতে পারিবারগুলোর বাজেটে চাপ আরও বেড়েছে।
এদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতিও সামান্য বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা এক মাস আগে ছিল ৯ দশমিক ০৮ শতাংশ।
বিবিএসের তথ্যে দেখা গেছে, ডিসেম্বর মাসে গ্রাম ও শহরে পণ্য ও সেবার দামের পরিবর্তন পরিমাপকারী ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) বেড়েছে।
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) জানিয়েছে, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ডিসেম্বর মাসে চাল, আটা, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বেশি ছিল।
বাংলাদেশ প্রায় তিন বছর ধরে ধারাবাহিক মূল্যস্ফীতির চাপে রয়েছে। ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে ছিল, এরপর থেকে তা ৮ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। এই দীর্ঘস্থায়ী পরিস্থিতি সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক নীতিগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
তবে সূচকভিত্তিক হিসাবে ডিসেম্বর মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে সামান্য স্বস্তির ইঙ্গিত মিলেছে। বিবিএসের তথ্যমতে, নভেম্বরের ১৪৬ দশমিক ৬৬ থেকে ডিসেম্বরে খাদ্য সিপিআই কমে ১৪২ দশমিক ৮৮ হয়েছে। যদিও বার্ষিক হিসাবে খাদ্যপণ্যের দাম এখনও তুলনামূলকভাবে বেশি।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, মূল্যস্ফীতি এখনও অনেক বেশি এবং তথ্য-উপাত্তে স্থায়ীভাবে কমার কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এখন পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপগুলো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান ফল দিচ্ছে না। বর্তমান কড়াকড়ি ব্যবস্থাও দাম কমানোর জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের খাদ্য মূল্যস্ফীতি মূলত বিনিময় হার বা ঋণ পরিস্থিতির কারণে নয়। এটি মূলত আগের প্রবণতাই অনুসরণ করে। অর্থাৎ কাঠামোগত সমস্যা ও সরবরাহপক্ষের দুর্বলতাই খাদ্য মূল্যস্ফীতির প্রধান চালক। শুধু চাহিদাভিত্তিক নীতি দিয়ে এখানে কাজ হবে না।
জাহিদ হোসেনের মতে, নীতি শিথিল করার সময় এখনও আসেনি। পাশাপাশি বর্তমান কড়াকড়ি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য যথেষ্ট কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
একই সুরে কথা বলেছেন ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএম) নির্বাহী পরিচালক মুস্তাফা কে মুজেরি।
তিনি বলেন, 'এ পর্যন্ত গৃহীত নীতিগুলো কার্যকর হলে এত দিনে মূল্যস্ফীতি কমে আসার কথা ছিল। কিন্তু কয়েক মাস ধরে তা ৮ শতাংশের ওপরে রয়ে গেছে, যা বিদ্যমান নীতির কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি করছে।'
তিনি বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতি শুধু চাহিদানির্ভর না হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল মিলছে না।
মুজেরির মতে, বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা, মূল্যশৃঙ্খলের সমস্যা এবং সরবরাহপক্ষের নানা সীমাবদ্ধতা মূল্যস্ফীতিকে বাড়াচ্ছে। এতে প্রভাবশালী মধ্যস্বত্বভোগীরা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, বাড়তি দামের সুফল অনেক সময় কৃষকের মতো উৎপাদকরা পান না। অধিকাংশ লাভ চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে।
মুজেরির ভাষায়, শক্তিশালী বাজার তদারকি এবং মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সরবরাহব্যবস্থা ও ঋণনীতির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া বাংলাদেশের মতো দেশে শুধু সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি দিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।