ফরিদপুরে পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে হুমকিতে ৯ গ্রাম

নিজস্ব সংবাদদাতা, ফরিদপুর

ফরিদপুরের সদরপুর উপজেলার ঢেউখালী ও আকোটেরচর ইউনিয়নের অন্তত নয়টি গ্রাম পদ্মা নদী ও আড়িয়াল খাঁ নদের তীব্র ভাঙনের কবলে পড়েছে। প্রতিদিনই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে পাকা সড়ক, বসতভিটা ও ফসলি জমি। ভিটেমাটি হারানোর আতঙ্কে অনেক পরিবার নিজেদের ঘরবাড়ি খুলে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিচ্ছে।

সরেজমিনে ঢেউখালী ও আকোটেরচর ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা নদীর ভাঙনে আকোটেরচর ইউনিয়নের শয়তানখালীর ঘাট, ছলেনামা, আকোট, কালিখোলা, মোল্লাকান্দা ও খালাসীগ্রাম এবং আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনে ঢেউখালী ইউনিয়নের চন্দ্রপাড়া, চর বলাশিয়া ও মুন্সিরচর এলাকা লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে।

চ
ছবি: স্টার

আকোটেরচর ইউনিয়নের শয়তানখালী ঘাটের চায়ের দোকানদার আলমগীর ব্যাপারী (৬৫) বলেন, গত দুই মাসে ঘাট এলাকার অন্তত ৫০০ মিটার পাকা সড়ক নদীতে চলে গেছে। ভাঙনের কারণে দুই মাসে আমার দোকানই সাতবার সরাতে হয়েছে।

একই এলাকার ৯০ বছর বয়সী হাসমত ব্যাপারী বলেন, পদ্মার পেটে আমার একতলা পাকা বাড়িটি চলে গেল। বছরের পর বছর আমরা স্থায়ী নদীশাসনের দাবি জানিয়ে আসছি। নেতারা আসেন, প্রতিশ্রুতি দেন, কিন্তু আমাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয় না।

ভাঙনের কবলে পড়ে শয়তানখালী ঘাট এলাকায় একলাস ফকিরের একটি ইটভাটার বেশিরভাগ অংশ নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ইটভাটার একতলা অফিস ঘরটিও ভেঙে সরিয়ে ফেলা হচ্ছে।

চ
ছবি: স্টার

আকোট গ্রামে সরকারি উদ্যোগে গড়ে তোলা একটি আদর্শ গ্রাম ও গুচ্ছগ্রামের প্রায় দুই শতাধিক পরিবার নতুন করে ভাঙনের ঝুঁকিতে পড়েছে। এর আগেও নদীভাঙনে নিঃস্ব হয়ে তারা এসব প্রকল্পে পুনর্বাসিত হয়েছিলেন।

আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা হাসি আক্তার জানান, নদীর ভাঙনমুখী সীমানা থেকে তাদের বসতি প্রায় এক কিলোমিটার দূরে হলেও যে গতিতে নদী এগোচ্ছে, তাতে তারা মারাত্মক আশঙ্কার মধ্যে রয়েছেন। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আকোট জনসংঘ উচ্চ বিদ্যালয়, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পিয়াজখালী বাজারসহ পুরো জনপদ নদীগর্ভে তলিয়ে যাবে।

আকোটেরচর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আসলাম বেপারী বলেন, শয়তানখালী ঘাট থেকে আকোট গ্রাম পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে তীব্র ভাঙন চলছে। ইতোমধ্যে ৩০ থেকে ৪০টি পরিবার ভিটেমাটি সরিয়ে নিয়েছে এবং অন্তত ৩৩ একর ফসলি জমি নদীতে গেছে। জিও ব্যাগে বালু ফেলে এই ভাঙন ঠেকানো সম্ভব নয়, স্থায়ী কাজ লাগবে।

চ
ছবি: স্টার

অন্যদিকে ঢেউখালী ইউনিয়নের চর বলাশিয়া গ্রামে আড়িয়াল খাঁ নদের গ্রাসে ইতোমধ্যে প্রায় অর্ধশতাধিক বসতঘর বিলীন হয়েছে। হুমকিতে রয়েছে চর বলাশিয়া মোল্লাগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।

ঢেউখালী ইউপি চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বয়াতী বলেন, ভাঙনের কারণে আমাদের ইউনিয়নের মানচিত্র ক্রমেই ছোট হয়ে আসছে। গত ১৯ জুলাই ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এলাকা পরিদর্শন করে গেছেন। তবে স্থায়ী বাঁধ তৈরি করা না হলে শুধু বালুর বস্তা ফেলে কোনো সমাধান আসবে না।

ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসীর দাবি—তারা কোনো ত্রাণ চান না, টেকসই ও স্থায়ী বাঁধের মাধ্যমে নদীভাঙন থেকে মুক্তি চান।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব হোসেন বলেন, সদরপুরের ভাঙন পরিস্থিতির বিষয়ে আমরা অবগত। চন্দ্রপাড়া, শয়তানখালী হয়ে আকোট গ্রাম পর্যন্ত ১১ কিলোমিটার এলাকায় নদীভাঙন রোধে স্থায়ী সমাধানের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সমীক্ষা (স্টাডি) শেষ হয়েছে। দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু হবে বলে আশা করছি।

তিনি আরও জানান, স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের আগপর্যন্ত তাৎক্ষণিক রক্ষাকবচ হিসেবে এলাকাগুলোতে আগামীকাল (২৪ জুলাই) থেকে বালুর বস্তা (জিও ব্যাগ) ফেলার কাজ শুরু হচ্ছে।