অনুমতি ছাড়াই সংরক্ষিত বনে টাওয়ার বসাচ্ছে টেলিটক
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার একটি সংরক্ষিত বনের ভেতরে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়াই মোবাইল টাওয়ার স্থাপনের অভিযোগ উঠেছে টেলিটকের বিরুদ্ধে। ইতোমধ্যে সেখানে মাটি কেটে ফাউন্ডেশন নির্মাণের কাজ শেষ করেছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন মোবাইল অপারেটর প্রতিষ্ঠানটি।
বন আইন অনুযায়ী, সংরক্ষিত বনে অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, স্থাপনা নির্মাণ বা অন্য কোনো ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনা নিষিদ্ধ। তবে এসব বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে টেলিটক টাওয়ার নির্মাণের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহ ধরে ফটিকছড়ির ভুজপুর থানার করেরহাট রেঞ্জের হেয়াকো বিটের ঝিলতলী বাজার মসজিদ-সংলগ্ন এলাকায় টাওয়ারটির নির্মাণকাজ চলছে। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, স্থানটি শতবর্ষী রামগড়-সীতাকুণ্ড রিজার্ভ ফরেস্টের আওতাভুক্ত।
চট্টগ্রাম উত্তর বনবিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মো. মাহদী হাসান ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বন আইন অনুযায়ী সংরক্ষিত বনে প্রবেশ করতেও অনুমতি প্রয়োজন। সেখানে অনুমতি ছাড়াই টাওয়ার নির্মাণ শুরু করা হয়েছে। বন বিভাগের একটি টহলদল ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।’
তবে টেলিটকের টাওয়ার নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক (পিডি) আখতারুল ইসলাম বলেন, ‘টাওয়ার নির্মাণের আগে আমরা স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি ভাড়া নিই। এক্ষেত্রেও সেটিই করা হয়েছে। হয়তো জমির মালিক তথ্য গোপন করে আমাদের কাছে জমি ভাড়া দিয়েছেন। তা না হলে সংরক্ষিত বনের ভেতরে টাওয়ার নির্মাণের প্রশ্নই আসে না।’
‘আমরা জমিটির মালিকানার বিষয়টি খতিয়ে দেখব। যদি এটি সংরক্ষিত বন হয়ে থাকে, তাহলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব এবং কর্তৃপক্ষের অনুমতির বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে,’ যোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগ সূত্র জানায়, তৎকালীন আসাম-বেঙ্গল বন বিভাগের অধীনে কলকাতা গেজেটের মাধ্যমে রামগড়-সীতাকুণ্ড বনাঞ্চলটিকে সংরক্ষিত বন হিসেবে ঘোষণা করা হয়। উত্তর চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বিস্তৃত এ বনটির আয়তন ৮৪ হাজার একরের বেশি।
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ওয়াটারশেড, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল এবং পরিবেশগত সুরক্ষাবলয়। বনটিতে ২৫ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১২৩ প্রজাতির পাখি, আট প্রজাতির সরীসৃপ এবং অন্তত ২৫ প্রজাতির গাছ রয়েছে।
বনটি নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বন ও পরিবেশবিদ্যা ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমেরারি অধ্যাপক কামাল হোসেন। ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘সংরক্ষিত বনের ভেতরে কোনো ধরনের স্থায়ী অবকাঠামো নির্মাণই বনের জন্য ভালো নয়। এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের সময় মাটি কাটা, মানুষের যাতায়াত ও পরবর্তী রক্ষণাবেক্ষণ বনের স্বাভাবিক পরিবেশে প্রভাব ফেলে।’
‘বনটি আগে থেকেই দখল ও বসতির চাপে রয়েছে। সেখানে মোবাইল টাওয়ার স্থাপন হলে নেটওয়ার্ক সুবিধা বাড়বে, যা নতুন করে বসতি ও অন্যান্য কর্মকাণ্ড বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে বন দখলের চাপ আরও বাড়বে এবং বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ও উপ-বন সংরক্ষক মোহাম্মদ হোছাইন বলেন, ‘সংরক্ষিত বনে কোনো স্থাপনা নির্মাণ বা ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার এখতিয়ার কেবল মন্ত্রণালয়ের। আমরা টাওয়ারের নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ দিয়েছি। নির্দেশনা অমান্য করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আর অনুমতির আবেদন এলে সেটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।’