দূষিত বাতাসে বসবাস করছে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ
এ বছর প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আছে তাপপ্রবাহ ও দাবানল। এর পাশাপাশি মানবসৃষ্ট কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনগোষ্ঠী।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দূষিত ক্ষতিকর বাতাসে বসবাস করছে।
কোপার্নিকাস ক্লাইমেট অ্যাটমোসফিয়ার মনিটরিং সার্ভিস (সিএএমএস) চলতি বছরের প্রথম আট মাসের তথ্য প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। গবেষকরা জলবায়ু পরিবর্তন ও বায়ুদূষণের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয়টিও তুলে ধরেছেন।
তারা বলছেন, দাবানল, যানবাহন ও শিল্পকারখানা থেকে বাতাসে ছড়িয়ে পড়া নিঃসরণের সঙ্গে তাপ ও সূর্যের আলো বিক্রিয়া করে। এতে ভূমিস্তরে ওজোন গ্যাসের দূষণ তৈরি হয়। ফলে ফুসফুসের টিস্যুর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। আর এ থেকেই শ্বাসকষ্ট এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
গত কয়েক দশকে সবচেয়ে ক্ষতিকর বায়ুদূষণকারী উপাদানের নিঃসরণ কমানোর ক্ষেত্রে অগ্রগতি হয়েছে। তবে এটাও দেখা গেছে, ওজোন দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা আরও বেশি কঠিন। কারণ জলবায়ু পরিবর্তন ওজোন তৈরির অনুকূল পরিস্থিতিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চলতি বছর রেকর্ড তাপপ্রবাহ ও দাবানলে পুড়ছে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা। এসব অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে ওজোন দূষণ বেড়েছে।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছে, এল নিনোর প্রভাব দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় আরও দাবানল সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়ায় বড় ধরনের দাবানল হয়েছে।
এই শঙ্কার কারণ, পূর্বাভাস অনুসারে জুনে শুরু হওয়া এল নিনো এ বছরের শেষের দিকে চূড়ায় পৌঁছাতে পারে।
‘বায়ুদূষণ সীমান্তে থেমে থাকে না। এটি হাজার হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মহাদেশ ও মহাসাগর অতিক্রম করতে পারে এবং উৎসস্থল থেকে বহুদূরে বাতাসের মানকে প্রভাবিত করতে পারে,’ অ্যাটমোসফিয়ার ওয়াচ রিপোর্টে বলেন সিএএমএসের পরিচালক লরেন্স রুইল।
বায়ুমান ‘অত্যন্ত খারাপ’
বায়ুদূষণ ও দাবানল পর্যবেক্ষণে সিএএমএস স্যাটেলাইটের তথ্য ও কম্পিউটার মডেল ব্যবহার করে।
প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ১ জানুয়ারি থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিশ্বের ৩৪ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ মানের বাতাসে বসবাস করেছে। এ সময়টায় বাতাসে ওজোন গ্যাস বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত মাত্রার তুলনায় অনেক বেশি ছিল।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিকায় আট ঘণ্টার গড় হিসেবে প্রতি ঘনমিটার বাতাসে ১০০ মাইক্রোগ্রাম ওজোনকে সর্বোচ্চ মাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বের আরও ১৭ শতাংশ মানুষ ‘খুব খারাপ’ বাতাসে শ্বাস নিয়েছে, আর পাঁচ শতাংশ মানুষ ভালো বা গ্রহণযোগ্য মাত্রার ওজোনের সংস্পর্শে ছিল।
এশিয়ায় ওজোন দূষণের হার সবচেয়ে বেশি। এই মহাদেশে ৫৩ শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ বাতাসে শ্বাস নিয়েছে। আরও ২২ শতাংশ মানুষ ‘খুব খারাপ’ মাত্রার ওজোনের সংস্পর্শে ছিল। শিল্পায়ন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবহন খাতের পাশাপাশি দাবানল এবং কৃষিজ অবশিষ্টাংশ পোড়ানোর কারণে এশিয়ায় ব্যাপক নিঃসরণের জন্য দায়ী।
নয়াদিল্লি, ঢাকা, চীনের মেগাসিটি চংচিং ও পাকিস্তানের লাহোর ছিল সেই শহরগুলোর মধ্যে, যেগুলোর ওজোনের মাত্রা ‘অত্যন্ত খারাপ’ ছিল।
উত্তর আমেরিকার দুই-তৃতীয়াংশ ও ইউরোপের ৪৫ শতাংশ মানুষ ‘খারাপ’ বা ‘খুব খারাপ’ বায়ুর মানের সংস্পর্শে ছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওজোন ছাড়া অন্যান্য বায়ুদূষণকারী উপাদানের নিঃসরণ কমাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বিধিমালা কার্যকর হয়েছে।
ইউরোপিয়ান এনভায়রনমেন্ট এজেন্সির কর্মকর্তা ইয়ান মারনানে এক মিডিয়া ব্রিফিংয়ে বলেন, ইউরোপে প্রতি বছর ৬০ হাজার ‘অকালমৃত্যুর’ সঙ্গে ওজোন দূষণের সম্পর্ক আছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, উচ্চাভিলাষী নিঃসরণ কমানোর নীতি গ্রহণ করা হলেও উত্তর আমেরিকায় ওজোনের দূষণের মাত্রা তুলনামূলকভাবে অপরিবর্তিত রয়েছে।
আফ্রিকার বায়ুদূষণের উল্লেখযোগ্য কারণ বনভূমির আগুন, ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো ও রান্নার ধোঁয়া। অন্যদিকে সাহারা মরুভূমির ধূলিকণা ইউরোপ পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
এ বছর আফ্রিকার আট শতাংশ মানুষ ‘অত্যন্ত খারাপ’ বায়ুর মানের মধ্যে ছিল। মহাদেশটির ১৯ শতাংশ মানুষের জন্য বায়ুর মান ছিল ‘খুব খারাপ’ বা ‘খারাপ’।