এক্সপ্লেইনার

স্পেসস্যুট কী, এর নিরাপত্তা কেমন

স্টার অনলাইন ডেস্ক

মহাশূন্য এক অনন্ত ও বাতাসহীন মৃত্যুপুরী। সেখানে পৃথিবীর মতো রক্ষাকারী বায়ুমণ্ডল নেই, নেই স্বাভাবিক বায়ুচাপও। এমন পরিবেশে কোনো মানুষ যদি হঠাৎ পড়ে যায়, তাহলে তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।

দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে শরীরের তরল পদার্থ বা রক্ত নিম্নচাপে ফুটতে শুরু করবে। বিজ্ঞানীরা একে ‘ইবুলিজম’ বলেন। আর অক্সিজেনের অভাবে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মানুষ জ্ঞান হারাবে, কয়েক মিনিটের মধ্যে মৃত্যু অবধারিত।

এই চরম বৈরী পরিবেশেই নভোচারীরা দিনের পর দিন কাজ করেন। কিন্তু কীভাবে?

এই মৃত্যুফাঁদে তাদের বাঁচিয়ে রাখে একটি মাত্র জিনিস—স্পেসস্যুট। দীর্ঘ ৫০ বছরেরও বেশি সময় পর নাসা যখন ‘আর্টেমিস-২’ মিশনে রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ ও জেরেমি হ্যানসেনকে নিয়ে আবার চন্দ্রাভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন স্পেসস্যুটের গুরুত্ব নতুন করে সামনে এসেছে।

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়, ১০ দিনের এই মিশনে যদি কোনো কারণে মহাকাশযানের কেবিনের চাপ কমে যায় বা কোথাও ছিদ্র তৈরি হয়, তাহলে এই স্যুটগুলোই হয়ে উঠবে নভোচারীদের একমাত্র ভরসা। এগুলো টানা ছয়দিন পর্যন্ত অক্সিজেন, তাপমাত্রা ও চাপ ঠিক রেখে তাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারবে।

স্পেসস্যুটে কাজ করছেন নভোচারীরা। ছবি: নাসা

স্পেসস্যুটকে সাধারণ পোশাক ভাবার অবকাশ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, এটি আসলে এক ধরনের স্বয়ংসম্পূর্ণ ‘ব্যক্তিগত ক্ষুদ্র মহাকাশযান’। সহজ করে বললে, মহাশূন্যে একজন নভোচারীর জন্য এটি এক ধরনের চলমান সুরক্ষা বর্ম।

মহাকাশযানের বাইরে কাজের জন্য তৈরি এই স্যুটের দুটি প্রধান অংশ থাকে—প্রেশার গারমেন্ট ও লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। পুরো স্যুটটি সাধারণত ১২ থেকে ১৬টি স্তরের সমন্বয়ে তৈরি হয়। এর ওজন ১০০ থেকে ১৩০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

ভয়ংকর তাপমাত্রা থেকে সুরক্ষা

মহাকাশে তাপমাত্রা ভয়াবহভাবে ওঠানামা করে। সূর্যের আলোয় তাপমাত্রা ২৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত উঠতে পারে, আবার ছায়ায় নেমে যেতে পারে মাইনাস ২৫০ ডিগ্রি ফারেনহাইটে।

নাসার তথ্য অনুযায়ী, এই চরম পরিস্থিতি সামাল দিতে স্যুটের ভেতরে একটি বিশেষ পোশাক থাকে। এতে ছোট ছোট টিউব বসানো থাকে, যার মধ্য দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। এই পানি শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে নভোচারীকে স্বাভাবিক রাখে।

এআই জেনারেটেড ইনফোগ্রাফ/নোটবুক এলএম

ক্ষুদ্র উল্কাপাত ও স্পেস ডাস্ট থেকে রক্ষা

মহাকাশে ভাসমান ধূলিকণা বা ‘স্পেস ডাস্ট’ এবং ক্ষুদ্র উল্কাপিণ্ড দেখতে তেমন ভয়ংকর মনে না হলেও, এগুলো অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ছুটে চলে। নাসার তথ্য অনুযায়ী, এদের গতি অনেক সময় বুলেটের চেয়েও বেশি হতে পারে।

স্পেসস্যুটের একাধিক শক্ত স্তর এই ক্ষুদ্র ও বিপজ্জনক কণাগুলোর আঘাত থেকে নভোচারীদের সুরক্ষা দেয়।

শ্বাস-প্রশ্বাস, বায়ুচাপ ও পানির ব্যবস্থা

স্পেসস্যুটের পেছনে থাকা ব্যাকপ্যাকই মূল লাইফ সাপোর্ট সিস্টেম। এটি নভোচারীদের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে।

একটি ফ্যানের মাধ্যমে পুরো স্যুটে অক্সিজেন ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং শরীর থেকে নির্গত কার্বন-ডাই-অক্সাইড সরিয়ে ফেলা হয়। একই সঙ্গে এটি স্যুটের ভেতরের বায়ুচাপ ঠিক রাখে, যাতে শূন্যচাপে শরীরের তরল ফুটে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

দীর্ঘ সময় কাজের জন্য স্যুটের ভেতরেই পানি পানের ব্যবস্থাও রাখা হয়।

তেজস্ক্রিয়তা ও চোখের সুরক্ষা

মহাকাশে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা অনেক বেশি, যা মানুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। স্পেসস্যুট এই তেজস্ক্রিয়তা থেকে শরীরকে বাঁচিয়ে রাখে।

স্যুটের হেলমেটটি প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এবং এতে স্বর্ণের প্রলেপযুক্ত বিশেষ ভাইজর থাকে। এটি সূর্যের তীব্র আলো থেকে নভোচারীর চোখ রক্ষা করে।

একটি ছোট কিন্তু দরকারি বিষয়ও এখানে রাখা হয়েছে। হেলমেটের ভেতরে একটি ফোম ব্লক থাকে, যাতে নাক চুলকালে নভোচারীরা সেখানে নাক ঘষে আরাম পেতে পারেন।

নিরাপদে ফেরার ব্যবস্থা

স্পেসওয়াকের সময় কোনো নভোচারী যদি দুর্ঘটনাবশত মহাকাশ স্টেশন থেকে দূরে সরে যান, তাহলে তার জন্যও ব্যবস্থা রয়েছে।

স্যুটের পেছনে ‘সেইফার’ নামে একটি ছোট জেট যুক্ত থাকে। এটি ব্যবহার করে নভোচারী নিজেই আবার স্টেশন বা নির্ধারিত স্থানে ফিরে আসতে পারেন।

মহাকাশ গবেষণায় এই আধুনিক স্পেসস্যুট নভোচারীদের টানা সাত ঘণ্টা পর্যন্ত মহাশূন্যে কাজ করার সুযোগ দেয়।

ভবিষ্যতের স্পেসস্যুট যেমন হতে পারে। ছবি: নাসা

‘আর্টেমিস-২’ মিশনের মতো চন্দ্রাভিযান কিংবা ভবিষ্যতে মঙ্গল গ্রহে মানুষের চলাফেরার পরিকল্পনা—এসব সম্ভব হচ্ছে এই উন্নত সুরক্ষা প্রযুক্তির কারণে। নাসা ভবিষ্যতের মিশনের জন্য আরও উন্নত স্পেসস্যুট তৈরির কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে বিভিন্ন গ্রহের কঠিন পরিবেশেও নভোচারীরা সহজে কাজ করতে পারেন।