এক্সপ্লেইনার

আইনজীবীর সনদ স্থগিত হয় কেন?

ফাহিমা কানিজ লাভা
ফাহিমা কানিজ লাভা

সাধারণ মানুষের কাছে আইনি লড়াইয়ের শেষ ভরসা তার আইনজীবী। কিন্তু সেই আইনজীবীই যদি পেশায় অনৈতিক কাজে জড়িয়ে পড়েন? 

বাংলাদেশে আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বাংলাদেশ বার কাউন্সিল’ এমন পরিস্থিতিতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি নানা কারণে আইনজীবীর সনদ স্থগিতের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

প্রশ্ন হলো, বার কাউন্সিল চাইলেই কি কারও সনদ স্থগিত বা বাতিল করতে পারে? আইনজীবী হওয়ার পেছনের পথটাই বা কেমন? আর যদি নিজের আইনজীবীর হাতে প্রতারিত হন, তবে একজন মক্কেলের করণীয় কী?

আইনজীবী হতে হলে কী করতে হয়?

বাংলাদেশে আইন পাস করলেই কেউ সরাসরি আদালতে প্র্যাকটিস করতে পারেন না। আইনজীবী বা ‘অ্যাডভোকেট’ হওয়ার পথটি দীর্ঘ ও শ্রমসাধ্য।

প্রথমে একজন ব্যক্তিকে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছর মেয়াদি এলএলবি (অনার্স) অথবা ল কলেজ থেকে আইন বিষয়ে ডিগ্রি (পাস) সম্পন্ন করতে হয়।  

বিদেশি ডিগ্রি (যেমন ব্যারিস্টার-অ্যাট-ল) থাকলেও বাংলাদেশে প্র্যাকটিস করতে বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট পরীক্ষায় অংশ নিতে হয়।

ডিগ্রি অর্জনের পর তাকে কমপক্ষে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর অধীনে ছয় মাস ‘পিউপিলেজ’ বা শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজ করতে হয়। এই সময়ে বার কাউন্সিলে ইন্টিমেশন ফরম জমা দিতে হয়।

এরপর তাকে বার কাউন্সিলের অধীনে তিনটি ধাপে পরীক্ষা দিতে হয়—এমসিকিউ (প্রিলিমিনারি), লিখিত ও মৌখিক (ভাইভা)। এই তিন ধাপে উত্তীর্ণ হওয়ার পর শিক্ষার্থীর উল্লেখিত বার অ্যাসোসিয়েশনে ফরমাল ভাইভা দিতে হয়। সেখানে উত্তীর্ণ হলে তিনি ওকালতি করার লাইসেন্স বা সনদ পান।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল কী করে?

বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আইন বিভাগের অধীনে সংবিধিবদ্ধ স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা। এটি ‘বাংলাদেশ লিগ্যাল প্র্যাকটিশনার্স অ্যান্ড বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২'-এর মাধ্যমে গঠিত।

সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আইনজীবী মো. আরিফ খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, বার কাউন্সিল হলো আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা। এর প্রধান কাজগুলো হলো আইনজীবীদের সনদ দেওয়া এবং তাদের জন্য আচরণবিধি তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করা। কোনো আইনজীবী যদি অনৈতিক, অবৈধ বা পেশাগত অসদাচরণে জড়ান, তবে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও বার কাউন্সিলের দায়িত্ব।

‘আইনজীবী’ সনদ স্থগিত হলে যা হয়

বার কাউন্সিল কোনো আইনজীবীর সনদ স্থগিত করলে তিনি কোনো আদালতে প্র্যাকটিস করতে পারেন না। অভিযুক্ত আইনজীবী নিজের ভিজিটিং কার্ড বা নাম-ফলকে ‘অ্যাডভোকেট’ পরিচয় ব্যবহার করে কোনো আইনি সেবা বা পরামর্শও দিতে পারবেন না।

তিনি কোনো আইনি দলিলে বা ওকালতনামায় স্বাক্ষর করতে পারবেন না। নিজেকে ‘অ্যাডভোকেট’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে পেশাদার কোনো কাজ করা তার জন্য বেআইনি।

স্থগিতাদেশ চলাকালে তিনি বার অ্যাসোসিয়েশন বা আইনজীবী সমিতির সদস্যপদ বা ভোটাধিকার সংক্রান্ত সুবিধাও সাময়িকভাবে হারাতে পারেন। এমনকি সংশ্লিষ্ট আইন সমিতি থেকেও তার সুযোগ-সুবিধা সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

স্থগিতের আইনি ভিত্তি ও বিচার প্রক্রিয়া

বার কাউন্সিল কি চাইলেই কারও রুটি-রুজি বন্ধ করতে পারে? এর জবাব আছে ‘দ্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অর্ডার, ১৯৭২’-এ।

এই আদেশের ৩২ ধারা অনুযায়ী, বার কাউন্সিলের নিজস্ব ‘ট্রাইব্যুনাল’ রয়েছে। যদি কোনো আইনজীবীর বিরুদ্ধে পেশাগত অসদাচরণ প্রমাণিত হয়, তবে ট্রাইব্যুনাল তাকে তিরস্কার, নির্দিষ্ট মেয়াদে সনদ স্থগিত, এমনকি চিরতরে বহিষ্কারও করতে পারে।

মক্কেলের সঙ্গে প্রতারণা, আদালতের অবমাননা, জাল দলিলাদি দাখিল বা আইনজীবীদের জন্য নির্ধারিত আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে বার কাউন্সিল সনদ স্থগিতের মতো ব্যবস্থা নিতে পারে। এটি একটি বিচারিক প্রক্রিয়া, তাই এর পূর্ণ আইনি ভিত্তি রয়েছে।

বিচার প্রক্রিয়া সম্পর্কে আইনজীবী মো. আরিফ খান বলেন, অভিযোগের ভিত্তিতে বার কাউন্সিল প্রথমে একজন আইনজীবীর সনদ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে। এরপর বার কাউন্সিলের নিজস্ব ট্রাইব্যুনালে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া শুরু হয়। তদন্তে অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে স্থগিতাদেশ স্থায়ী হতে পারে, আর সত্য না হলে স্থগিতাদেশ তুলে নেওয়া হয়।

অভিযুক্ত আইনজীবীর অধিকার ও আইনি সুরক্ষা

আইনজীবী মো. আরিফ খান আরও বলেন, একজন আইনজীবীর সনদ স্থগিত করা তার জন্য বড় ক্ষতি। তার রোজগার বন্ধ হয়ে যায়, সুনাম নষ্ট হয়। ফলে সনদ স্থগিত হলে অভিযুক্ত আইনজীবীও কিছু আইনি পদক্ষেপ নিতে পারেন।

তদন্ত চলাকালে ওই আইনজীবী সাময়িক স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য বার কাউন্সিলে আবেদন করতে পারবেন। বার কাউন্সিল আবেদন না রাখলে এবং সনদ স্থগিতের সিদ্ধান্ত বহাল রাখলে তিনি হাইকোর্টে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। ট্রাইব্যুনালের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৯০ দিনের মধ্যে হাইকোর্টে আপিলের সুযোগ রয়েছে।

মক্কেল কি আইনজীবীর বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনতে পারেন?

মক্কেল যদি মনে করেন আইনজীবী তার বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করেছেন, তবে তিনি অবশ্যই এর প্রতিকার পাবেন। আইনজীবী ফি নিয়ে যথাযথভাবে মামলা পরিচালনা করেননি বা অবহেলা করেছেন, এমন অভিযোগে মক্কেল তার বিরুদ্ধে বার কাউন্সিলে অভিযোগ করতে পারেন।

অভিযুক্ত আইনজীবী যে আইনজীবী সমিতির সদস্য, সেখানেও মক্কেল চাইলে লিখিত অভিযোগ জানাতে পারেন। সমিতি অভিযোগটি প্রাথমিক তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বার কাউন্সিলে পাঠাতে পারে।

ভুক্তভোগী মক্কেল সরাসরি বার কাউন্সিলের ট্রাইব্যুনালে লিখিত অভিযোগ করতে পারেন। এটি সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অভিযোগ গ্রহণ করে। প্রমাণ সাপেক্ষে ওই আইনজীবীর সনদ বাতিল করতে পারে।

আইনজীবী মো. আরিফ খান জানান—যদি আইনজীবীর কাজ বিশ্বাসভঙ্গ বা প্রতারণার পর্যায়ে পড়ে, তবে দণ্ডবিধির ৪০৬ ও ৪২০ ধারায় মামলা করা সম্ভব। তবে সাধারণত আগে বার কাউন্সিলে অভিযোগের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা হয়।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আইনজীবীর ফি মক্কেলের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নির্ধারিত হয়। আইনে কোনো নির্দিষ্ট সীমা বলা নেই। তবে কেবল মামলায় হেরে যাওয়ার কারণে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তোলা ঠিক নয়।

যদি অন্যায়ভাবে টাকা নেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তাহলে বার কাউন্সিল সেই টাকা ফেরত দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারে। তবে ভিত্তিহীন বা হয়রানিমূলক অভিযোগ করলে মক্কেলকে আইনি জটিলতায় পড়তে হতে পারে।

বার কাউন্সিলের সনদ স্থগিত বা বাতিলের মতো কঠোর সিদ্ধান্তগুলো কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থাই নয়, বরং এটি সাধারণ মানুষের মনে বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা ফিরিয়ে আনার একটি প্রক্রিয়া।

আইনজীবীদের কোনো ভুল পদক্ষেপে যেন সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেজন্য বার কাউন্সিলকে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।