বাব আল-মানদেব প্রণালি কেন গুরুত্বপূর্ণ, হুতিরা বন্ধ করে দিলে কী হবে?
ইয়েমেনের হুতি সরকারের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি শান্তি প্রক্রিয়ায় বাধা দেওয়া অব্যাহত রাখেন, তবে বিদ্রোহীরা ইয়েমেন উপকূলে অবস্থিত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘বাব আল-মানদেব’ প্রণালি বন্ধ করে দিতে পারে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুসেইন আল-এজ্জি লেখেন, সানা (হুতি সরকার) যদি বাব আল-মানদেব বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়, তবে আসমান-জমিনের কোনো শক্তিই তা খুলতে পারবে না।
তিনি আরও লেখেন, সুতরাং ট্রাম্প এবং তার মিত্র দেশগুলোর উচিত অবিলম্বে শান্তি বিঘ্নিতকারী সব কর্মকাণ্ড বন্ধ করা এবং আমাদের জনগণের অধিকার ও সার্বভৌমত্বের প্রতি প্রয়োজনীয় সম্মান দেখানো।
এর আগে যুদ্ধ চলাকালে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির এক শীর্ষ উপদেষ্টা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন, তেহরান যেভাবে হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই ইরানের মিত্ররা চাইলে বাব আল-মানদেব নৌপথটিও বন্ধ করে দিতে পারে।
বাব আল-মানদেব লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নৌ-চলাচল পথ (শিপিং চোকপয়েন্ট), যা মূলত সুয়েজ খালের দিকে জাহাজ চলাচলের প্রধান মাধ্যম হিসেবে কাজ করে।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে তেহরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর থেকে এই পথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে।
স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়েই পরিবহন করা হয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার মধ্যে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার ঘোষণার পর আবারো বন্ধ করে দিয়েছে।
বাব আল-মানদেব প্রণালি বন্ধ হলে তা কেবল যুদ্ধের ময়দানেই প্রভাব ফেলবে না। এটি বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ সংকটকে আরও জটিল করে তুলবে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে বিশ্বের প্রতিটি দেশের কল-কারখানা, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা এবং পেট্রোল পাম্পগুলোতে।
বাব আল-মানদেব কোথায়, এর গুরুত্ব কী?
এই প্রণালি ভৌগোলিকভাবে উত্তর-পূর্ব দিকে ইয়েমেন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে হর্ন অব আফ্রিকা অঞ্চলের জিবুতি ও ইরিত্রিয়ার মাঝে অবস্থিত।
এটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা ভারত মহাসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশটি মাত্র ২৯ কিলোমিটার (১৮ মাইল) চওড়া, যার ফলে পণ্যবাহী জাহাজ আসা-যাওয়ার জন্য মাত্র দুটি চ্যানেল ব্যবহারের সুযোগ থাকে। বর্তমানে এই পথটি কার্যত ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ইয়েমেনভিত্তিক হুতি বিদ্রোহীরা ইরানের এক্সিস অব রেসিস্ট্যান্সের মূল একটি অংশ। এটি মূলত তেহরানের আদর্শিক বা কৌশলগত মিত্র গোষ্ঠীগুলোর একটি জোট।
এই প্রণালি সৌদি আরবের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পথ, যার মাধ্যমে তারা এশিয়ায় তেল রপ্তানি করে। যখন হরমুজ প্রণালি সচল থাকে, তখন সৌদি আরব ছাড়াও অন্য উপসাগরীয় দেশগুলো এই পথ ব্যবহার করে সুয়েজ খাল কিংবা মিশরের লোহিত সাগর উপকূলের সুমেদ পাইপলাইনের মাধ্যমে ইউরোপে তেল-গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানি রপ্তানি করে।
২০২৪ সালে প্রায় ৪১০ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য এই প্রণালি দিয়ে পার হয়—যা বিশ্বের মোট সরবরাহের ৫ শতাংশ।
যদি বাব আল-মানদেব ও হরমুজ প্রণালি উভয়ই বন্ধ হয়ে যায়, তবে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের ২৫ শতাংশ বা এক-চতুর্থাংশ বন্ধ হয়ে যাবে।
কেবল তেল নয়, বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১০ শতাংশ এই বাব আল-মানদেব দিয়েই সম্পন্ন হয়। চীন, ভারত ও এশিয়ার অন্যান্য দেশ থেকে ইউরোপে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে এই রুটটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমানে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাব আল-মানদেবের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বহুগুণ বেড়েছে।
সৌদি আরব ঐতিহাসিকভাবে তাদের তেল রপ্তানির জন্য প্রধানত হরমুজ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে এখন তারা বিকল্প হিসেবে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরের মাধ্যমে বাব আল-মানদেব দিয়ে অপরিশোধিত তেল রপ্তানির ওপর ক্রমেই বেশি জোর দিচ্ছে।
এজন্য তারা তাদের ‘ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন’ ব্যবহার করছে, যা পারস্য উপসাগরের নিকটবর্তী আবকাইক তেল শোধনাগার থেকে ইয়ানবু বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত। এক হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই পাইপলাইনটি পরিচালনা করে সৌদি তেল জায়ান্ট আরামকো।
জ্বালানিবিষয়ক ইন্টেলিজেন্স ফার্ম ‘কপলার’-এর তথ্যমতে, গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে এই পাইপলাইন দিয়ে দৈনিক গড়ে ৭ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেল তেল লোহিত সাগর উপকূলে পাঠানো হয়েছে।
কিন্তু মার্চ মাসে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হওয়ার পর সৌদি আরব এই পাইপলাইনের ব্যবহার ব্যাপক হারে বাড়িয়ে দেয়। মার্চের শেষ নাগাদ পাইপলাইনটির সর্বোচ্চ সক্ষমতা অনুযায়ী দৈনিক ৭০ লাখ (৭ মিলিয়ন) ব্যারেল তেল সরবরাহ করা হয়েছে—যা এ যাবৎকালের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ইরান ও তার মিত্ররা কীভাবে এটি বন্ধ করতে পারে?
হুতিরা আগেই প্রমাণ করেছে যে তারা এই জলপথ বন্ধ করতে সক্ষম। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের সময় তারা ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জাহাজের জন্য বাব আল-মানদেব প্রণালি অবরুদ্ধ করে দিয়েছিল।
জাহাজে ক্রমাগত হামলার আশঙ্কায় বিমা কোম্পানিগুলো ঝুঁকি নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় এই পথে জাহাজ চলাচল ব্যাপকভাবে কমে যায়। তবে ২০২৫ সালের মে মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি হওয়ার পর ইয়েমেনি গোষ্ঠীটি পুনরায় বাব আল-মানদেব খুলে দেয়।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে, গাজা যুদ্ধের সময়ের মতো আবারও নৌ-চলাচল ব্যাহত করা হুতিদের জন্য অত্যন্ত সহজ একটি কাজ হবে।
গত মার্চের শেষ দিক থেকে হুতি বিদ্রোহীরা ইসরায়েলে নিয়মিত ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে। এটি যুদ্ধে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণেরই প্রমাণ দেয়—তবে আপাতত তাদের এই লড়াই কেবল ইসরায়েলের বিরুদ্ধে, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয়।
অবশ্য সাবেক মার্কিন কূটনীতিক নাবিল খৌরি আল জাজিরাকে বলেন, ইসরায়েলের ওপর হুতিদের এই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ছিল মূলত ‘প্রতীকী অংশগ্রহণ’, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ নয়।
ইয়েমেনে নিযুক্ত সাবেক এই ডেপুটি চিফ অব মিশন আল জাজিরাকে বলেন, ‘এই অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কার মুখে তারা স্রেফ হুঁশিয়ারি হিসেবে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। বর্তমানে এই অঞ্চলে মার্কিন সেনারা আসছে। এমনও কথা শোনা যাচ্ছে যে, কোনো সমঝোতা না হলে ইরানের ওপর নজিরবিহীন সর্বাত্মক হামলা হতে পারে।’
হুতিরা যদি সত্যিই পুরোদমে যুদ্ধে জড়াতে চায়, তবে তাদের তুরুপের তাস হবে বাব আল-মানদেব প্রণালি পুরোপুরি অবরুদ্ধ করে দেওয়া।
খৌরি আরও বলেন, এজন্য তাদের স্রেফ যাতায়াতকারী কয়েকটি জাহাজে হামলা করতে হবে। এতেই লোহিত সাগর দিয়ে সব ধরনের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাবে। এটি হবে রেড লাইন অতিক্রম করা, যার ফলে ইয়েমেনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পাল্টা আক্রমণ শুরু হতে সময় লাগবে না।
বাব আল-মানদেব বন্ধ হলে বিশ্বে এর প্রভাব কী হবে?
এই রুটের ওপর নির্ভরশীলতার দিক থেকে ইউরোপীয় দেশগুলো বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ব্লুমবার্গ ও রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতালি, জার্মানি, ফ্রান্স ও স্পেনসহ বিভিন্ন দেশ মধ্যপ্রাচ্যের তেল আমদানির জন্য এই পথ ব্যবহার করে।
অন্যদিকে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কুয়েতের মতো তেল রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য এটি ইউরোপমুখী জ্বালানি সরবরাহের প্রধান পথ। একইভাবে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোও ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে এই রুটের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালিটি যদি বন্ধ হয়ে যায়, তবে তার প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী ও বহুমাত্রিক। দ্য গার্ডিয়ানের তথ্য বলছে, তখন জাহাজগুলোকে বিকল্প পথ হিসেবে আফ্রিকার দক্ষিণ প্রান্তের ‘কেপ অব গুড হোপ’ ঘুরে যাতায়াত করতে হবে। এতে ভ্রমণ সময় ১০ থেকে ১৫ দিন এবং জ্বালানি খরচ ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে, যা বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে। পাশাপাশি বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়বে। রয়টার্স ও আল জাজিরা জানিয়েছে, আধুনিক উৎপাদন পদ্ধতি বিশেষ করে ‘জাস্ট-ইন-টাইম’ কৌশলের ওপর নির্ভরশীল গাড়ি শিল্প, ইলেকট্রনিক্স ও খুচরা পণ্য খাত গুরুতর সংকটে পড়তে পারে।
এর বাইরে জ্বালানি বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দেবে এবং সরবরাহ কমে যাওয়ায় তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করবে।
বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রতিদিন এই প্রণালি দিয়ে যে পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবাহিত হয় তার আর্থিক মূল্য কয়েক বিলিয়ন ডলারের সমান। ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের জন্যও এই পথ বন্ধ থাকলে বৈশ্বিক বাণিজ্যে শত শত বিলিয়ন ডলারের বিশাল আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।
লোহিত সাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ বাব আল-মানদেব বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্বজুড়ে এক ‘দুঃস্বপ্নতুল্য’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ও কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের গার্টন কলেজের প্রেসিডেন্ট এলিজাবেথ কেনডল।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, এই প্রণালিটি অবরুদ্ধ হওয়া মানে এক ভয়াবহ বিপর্যয়কে আমন্ত্রণ জানানো। তার মতে, যদি হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি বাব এল-মান্দেবেও কড়াকড়ি বা অবরোধ বাড়তে থাকে, তবে ইউরোপের সঙ্গে বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবস্থা কেবল ক্ষতিগ্রস্তই হবে না, বরং তা পুরোপুরি অচল হয়ে যেতে পারে।
কেনডল মনে করেন, পরিস্থিতি এখন খাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছে এবং সবকিছুই পরবর্তী ঘটনাবলির ওপর নির্ভর করছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতি হুতিদের জন্য একটি তুরুপের তাস বা সুবিধাজনক অবস্থান হলেও তারা সম্ভবত সৌদি আরব বা আন্তর্জাতিক মহলের বড় কোনো কঠোর সামরিক পদক্ষেপ উসকে দিতে চাইবে না।