যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ড: কী, কেন এবং কারা প্রভাবিত হবেন?
যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা বন্ডের তালিকায় বাংলাদেশসহ ৩৮ দেশকে যুক্ত করেছে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর। নতুন এই নীতির আওতায় এসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের জন্য ভিসা আবেদনের সময় সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত 'ভিসা বন্ড' বা জামানত দিতে হতে পারে।
সর্বোচ্চ বন্ডের অঙ্ক ১৫ হাজার ডলার, যা প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৩১ টাকা হিসেবে বাংলাদেশি মুদ্রায় দাঁড়ায় প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। নতুন যুক্ত হওয়া দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নিয়ম আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে।
এর ফলে অনেক দেশের নাগরিকদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পাওয়া এখন আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে যাচ্ছে।
কী এই ভিসা বন্ড? কেন চালু করা হলো এই বন্ড? আর কারাই বা এতে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবেন—চলুন জেনে নেওয়া যাক।
ভিসা বন্ড কী?
ভিসা বন্ড হলো একধরনের ফেরতযোগ্য আর্থিক জামানত। কোনো দেশের সরকার নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের অস্থায়ী ভিসা দেওয়ার আগে এ ধরনের বন্ড বা জামানত নিতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো—ভিসাধারীরা যেন ভিসার শর্ত মেনে চলেন, বিশেষ করে নির্ধারিত সময় শেষ হলে দেশটি ত্যাগ করেন।
যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবছর শিক্ষার্থী, পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের বিপুলসংখ্যক নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা দিয়ে থাকে। যেমন—বি-১ (ব্যবসা) ও বি-২ (পর্যটন) ভিসা। এসব ভিসার মেয়াদ কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে কয়েক বছর পর্যন্ত হতে পারে।
কিন্তু কেউ যদি অনুমোদিত সময়ের চেয়ে বেশি দিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করেন, সেটিকে বলা হয় ভিসা ওভারস্টে—যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন আইনের লঙ্ঘন।
নতুন নিয়মে কী বলা হয়েছে?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ঘোষিত নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের বি-১ (ব্যবসা) ও বি-২ (পর্যটন) ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যেতে হলে সর্বোচ্চ তিন স্তরের যেকোনো একটি বন্ড জমা দিতে হতে পারে—৫ হাজার ডলার, ১০ হাজার ডলার ও ১৫ হাজার ডলার।
আবেদনকারী পৃথিবীর যেখান থেকেই ভিসার জন্য আবেদন করুন না কেন, এই নিয়ম সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে।
ভিসা সাক্ষাৎকারের সময় কনস্যুলার কর্মকর্তা আবেদনকারীর ব্যক্তিগত অবস্থা বিবেচনা করে বন্ডের পরিমাণ নির্ধারণ করবেন। ভ্রমণের উদ্দেশ্য, চাকরি, আয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও দক্ষতা—এসব বিষয় এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বন্ড জমা দেওয়ার জন্য আবেদনকারীকে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অনলাইন প্ল্যাটফর্ম পে.গভ (Pay.gov)–এর মাধ্যমে সম্মতি জানাতে হবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগের 'আই-৩৫২' ফরমও পূরণ করতে হবে।
ভিসার সব শর্ত মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করলে এই বন্ডের অর্থ ফেরত পাওয়া যাবে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে আরও জানানো হয়েছে, ভিসা পাওয়া ব্যক্তিদের নির্দিষ্ট কয়েকটি বিমানবন্দর দিয়েই যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ ও দেশত্যাগ করতে হবে। সেগুলো হলো—বোস্টন লোগান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (বিওএস), জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জেএফকে) ও ওয়াশিংটন ডুলাস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (আইএডি)।
কবে থেকে কার্যকর হবে?
এই ভিসা বন্ড ব্যবস্থা আপাতত ১২ মাস মেয়াদি একটি পরীক্ষামূলক (পাইলট) কর্মসূচি হিসেবে চালু করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নতুন করে তালিকাভুক্ত দেশগুলোর জন্য এই নিয়ম আগামী ২১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হবে। এই সময়ের মধ্যে তালিকা পর্যালোচনা করা হবে এবং প্রয়োজন হলে দেশ যুক্ত বা বাদ দেওয়া হতে পারে।
কেন এই নীতি চালু করা হলো?
মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব দেশের নাগরিকদের মধ্যে ভিসা ওভারস্টের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, মূলত সেসব দেশকেই এই নীতির আওতায় আনা হয়েছে।
সরকারি প্রতিবেদনে দেখা যায়, প্রতিবছর লক্ষাধিক নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসাধারী অনুমোদিত সময় শেষ হওয়ার পরও যুক্তরাষ্ট্রে থেকে যান।
মার্কিন কর্তৃপক্ষ মনে করছে, ভিসা বন্ড চালু করলে ওভারস্টে কমবে এবং ভিসা ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরবে। এটি ট্রাম্প প্রশাসনের অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ জোরদারের সামগ্রিক নীতির অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
কোন দেশগুলো বেশি প্রভাবিত হবে?
সাম্প্রতিক ট্রাম্প প্রশাসনের এই ঘোষণায় মোট ৩৮টি দেশ এ তালিকায় রয়েছে। এর মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপাল আছে। আরও রাখা হয়েছে আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার অনেকগুলো দেশ।
প্রাথমিকভাবে মালাবি ও জাম্বিয়ার নাগরিকদের ওপর এ নীতি প্রয়োগের কথা জানানো হয়েছিল। পরে ধাপে ধাপে আরও দেশ যুক্ত করা হয়।
তবে কানাডা ও মেক্সিকোর নাগরিক এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা ওয়েভার প্রোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত ৪০টির বেশি দেশের নাগরিকরা এই ভিসা বন্ডের আওতার বাইরে থাকবেন।
ছাড় বা মওকুফের সুযোগ আছে কি?
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, সীমিত কিছু ক্ষেত্রে বন্ড মওকুফ করা হতে পারে। যেমন কেউ যদি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাজে ভ্রমণ করতে আসেন, বা জরুরি মানবিক প্রয়োজনে আসেন। তবে সাধারণ পর্যটক বা ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের ক্ষেত্রে এই ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা খুব কম।
আগে কি এমন ব্যবস্থা ছিল?
ভিসা বন্ডের ধারণা একেবারে নতুন নয়। নিউজিল্যান্ড একসময় ওভারস্টে নিয়ন্ত্রণে এ ব্যবস্থা চালু করলেও পরে তা বাতিল করে।
২০১৩ সালে যুক্তরাজ্য কিছু 'উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' দেশের জন্য ভিসা বন্ড চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
ট্রাম্প প্রশাসনের প্রথম মেয়াদে ২০২০ সালেও যুক্তরাষ্ট্রে ভিসা বন্ড কর্মসূচি চালুর চেষ্টা হয়েছিল। তবে করোনা মহামারির কারণে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ কমে যাওয়ায় সেটি আর পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বাংলাদেশে এর প্রভাব কতটা পড়তে পারে?
বাংলাদেশ এই তালিকায় যুক্ত হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণ করতে আগ্রহী অনেক পর্যটক ও ব্যবসায়িক ভ্রমণকারীদের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে।
সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার বন্ডের অঙ্ক বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮ লাখ টাকার বেশি। ফলে মধ্যবিত্ত ভ্রমণকারীদের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে যেহেতু এই বন্ড ফেরতযোগ্য, তাই যারা নিয়ম মেনে সময়মতো যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগ করবেন, তাদের জন্য এটি স্থায়ী খরচ নয়। বরং একে একটি অস্থায়ী আর্থিক নিশ্চয়তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশের ভ্রমণকারীদের জন্য এটি যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণে আরও সতর্ক হওয়ার একটি স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে।