গল্প

পেতনিটা সন্ধ্যাবেলায় আসে

ইমদাদুল হক মিলন
ইমদাদুল হক মিলন

মিলু খানিক আগে মাঠ থেকে ফিরেছে। বাড়ির সঙ্গেই মাঠ। মাঠের ধারে একটা পুকুর। পাড়ার বড়রা এই মাঠে খেলতে আসে না। তারা যায় দূরের মাঠে। এখানটায় মিলুর সঙ্গে খেলা করে আশপাশের বাড়ির চার পাঁচটি ছেলেমেয়ে। প্রত্যেকেরই বয়স নয় দশ বছর। মিলুর প্রিয়বন্ধু আলমগির। এই দুজন সারাক্ষণই গলায় গলায়। আলমগির খুবই চটপটে, দুরন্ত ও সাহসী।

মিলু থাকে তার নানির কাছে। মা বাবা আর অন্যান্য ভাইবোন থাকে ঢাকায়। মিলু তার নানিকে খুব ভালোবাসে। নানিও তার জন্য পাগল। এজন্য সে নানাবাড়িতে থাকে। গ্রামের প্রাইমারি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে পড়ে।

নানাবাড়িটি বিশাল। বড় বড় কয়েকটা টিনের ঘর। বিশাল উঠোন। বাড়ির পিছন দিকে ফলের বাগান। বাগানের শেষ দিকে অনেকগুলো বাঁশঝাড়। ওদিকটায় সারাদিন পাখি ডাকে। হাওয়ায় শনশন করে বাঁশঝাড়। এতই নির্জন, নিরিবিলি বাগান, দিনেরবেলায়ও মিলু কখনও একা ওদিকটায় যায় না। তার ভয় করে। আর সন্ধ্যার দিকে যাওয়ার তো প্রশ্নই ওঠে না। সন্ধ্যা হওয়ার আগেই বাঁশঝাড়ের দিকটা অন্ধকার হয়ে যায়। তাকালেই গা ছমছম করে।

আজ বিকেলে খেলা শেষ করে ফিরেছে মিলু। নানির সঙ্গে সে থাকে বাগানের দিককার বড় ঘরটিতে। সেই ঘরে পাঁচটা কামরা। মিলুর নানা জাহাজের সারেং ছিলেন বলে বাড়ির ঘরগুলো অনেকটাই জাহাজের মতো। রাতেরবেলা এক কামরা থেকে অন্য কামরায় যেতেও মিলুর গা ছমছম করে। কোনও কোনও নির্জন দুপুরেও হয় একই অবস্থা। সে ভীতু ছেলে। ভূতের ভয়ে সারাক্ষণই কাতর হয়ে থাকে।

অলঙ্করণ: জয়ন্ত জন

এতবড় বাড়িটায় লোকজন তেমন থাকে না। নানার খেতখোলায় কাজ করে আলফু। বউ ছেলেমেয়ে নিয়ে বহু বছর ধরে এই বাড়িতে আছে। সে খেতখোলা, চাষবাস এইসব দেখে। বাড়ির হাটবাজার করার দায়িত্বও তার। আলফুর বউ করে রান্নাবান্না আর সংসারের কাজ। তার মেয়ের নাম পারু। সে সারাদিন আছে নানির সঙ্গে। মিলুর দেখাশোনার দায়িত্বও পারুর। আলফুর ছেলেটির নাম বাচ্চু। তার বয়স চার পাঁচ বছর। সে সারাক্ষণই আছে তার মায়ের সঙ্গে। রাতেরবেলা বাড়িটা তো নিঝুম হয়ে থাকেই, দিনেরবেলাও নিঝুম। এতবড় বাড়িতে এ কজন মাত্র মানুষ! নিরিবিলি তো হবেই!

আজ সন্ধ্যা হতে না হতেই চাঁদ উঠেছে। দিনের আলোর মতো জ্যোৎস্না। চারদিক ফকফক করছে। মিলু পড়তে বসেছে। জ্যোৎস্না রাত বলে সামনের জানালাটা খোলা। অন্য সময় সন্ধ্যা হতে না হতেই জানালাটা বন্ধ করে দেওয়া হয়। অন্ধকারে বাঁশঝাড়তলার দিকে তাকাতে মিলুর ভয় করে। বাড়ির সবাই তা জানে।

মিলু পড়ছে। নানি বসে আছেন অদূরে। দুজনের সামনেই হারিকেন জ্বলছে। এ সময় আলফু এসে ঢুকলো। নানির সামনে বসে কী কী সব হিসাব দিতে লাগল। নানি মনোযোগ দিয়ে হিসাবের খাতায় তা লিখতে লাগলেন। মিলু একবার সেদিকে তাকিয়ে খোলা জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। বাইরে ফকফক করছে জ্যোৎস্না। হাওয়ায় ভাসছে হাসনাহেনা ফুলের গন্ধ। বাঁশঝাড়ে শনশন শব্দ। বাঁশঝাড়ের তলা পর্যন্ত চাঁদের আলো পৌঁছাতে পারেনি। সেদিকটায় আবছা অন্ধকার। মিলু দেখে সেখানে পারু দাঁড়িয়ে আছে। পারু কখনও মাথায় ঘোমটা দেয় না। এখন সে মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে!

মিলু খুবই অবাক! কয়েক পলক তাকিয়ে পারুকে দেখল। তারপর নানির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখ নানি, পারু বাঁশঝাড়তলায় গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাথায় ঘোমটাও দিয়েছে।’

শুনে নানি আর আলফু দুজনেই চমকালেন। নানি কিছু বলার আগেই আলফু চট করে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে দিল। মিলু কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখে, পাশের কামরা থেকে বেরিয়ে এল পারু। ব্যাপারটার আগামাথা কিছুই সে বুঝতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে পারুর মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি এত তাড়াতাড়ি বাঁশঝাড়তলা থেকে কী করে এলে?’

অলঙ্করণ: জয়ন্ত জন

পারু অবাক! ‘বাঁশঝাড়তলা মানে? আমি আবার ওখানটায় গেলাম কখন? আমি তো পাশের কামরায় ছিলাম!’
    ‘কিন্তু আমি যে তোমাকে বাঁশঝাড়তলায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম! মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়েছিলে। এই মাত্রই তো দেখলাম!’

পারু কিছুই বুঝতে পারছে না। একবার নানির দিকে তাকায়, একবার আলফুর দিকে। আরেকবার তাকায় মিলুর দিকে।

এসময় আলফু বা নানি কেউ কিছু একটা ইশারা করলেন। পারু ব্যাপারটা বুঝে গেল। যেন হঠাৎ মনে পড়েছে এমন ভঙ্গিতে বলল, ‘না না, তুমি ঠিকই বলেছ। আমি বাঁশঝাড়তলায় গিয়েছিলাম। মাথায় ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম।’
      ‘এত তাড়াতাড়ি এলে কী করে?’
      ‘এক দৌড়ে চলে এসেছি! এই যে দেখ, এখনও হাঁপাচ্ছি।’
      ‘কোথায় হাঁপাচ্ছ?’
      ‘হ্যাঁ হ্যাঁ হাঁপাচ্ছি। তুমি বুঝতে পারছ না?’ বলেই জোরে জোরে শ্বাস টানতে লাগল পারু। ব্যাপারটার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝতে পারল না মিলু।

পরদিন আসল ঘটনা ফাঁস করল আলমগির। বিকেলবেলা খেলতে গিয়ে মিলুকে বলল, ‘তুই বাঁশঝাড়তলায় যাকে দেখেছিস, সে কিন্তু পারু না।’

মিলু অবাক! ‘তাহলে কে?’

‘ওটা একটা পেতনি। সন্ধ্যাবেলায় আসে। তোদের বাড়ির সবাই তা জানে। পাড়ারও অনেকে জানে। আমি শুনেছি বাবার কাছে। পেতনিটা তুই দেখে ফেলেছিস বলেই আলফু তাড়াতাড়ি জানালাটা বন্ধ করে দিয়েছে। পারু তো বাঁশঝাড়তলায় যায়ই নি! সে ছিল পাশের কামরায়। পেতনির কথা শুনে তুই যাতে ভয় না পাস, এজন্য বানিয়ে বানিয়ে ওসব কথা বলেছে। আজ পারু যখন আমার মাকে গিয়ে সব বলছিল, তখন আমি শুনে ফেলেছি।’

পেতনির কথা শুনে ভয় পেয়ে গেল মিলু। তারপর থেকে সন্ধ্যা হতে না হতেই ওই জানালাটা সে বন্ধ করে দেয়। যতক্ষণ লেখাপড়া করে ততক্ষণ পারুকে বসিয়ে রাখে পাশে।