কমেছিল হাম, সেপ্টেম্বরে দৈনিক গড় শনাক্ত বেড়ে ১২২৯

তুহিন শুভ্র অধিকারী
তুহিন শুভ্র অধিকারী

সরকারের নতুন টিকাদান কর্মসূচির মধ্যেই মে মাসের পর থেকে হামের সংক্রমণ ও হাসপাতালে ভর্তির হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৬ দিনে দেশে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২২৯ জন হাম ও হামের উপসর্গ থাকা রোগী শনাক্ত হয়েছেন। এটি মে মাসের দৈনিক গড় ১ হাজার ২২০ জন এবং এর মধ্যবর্তী সব মাসের গড়কে ছাড়িয়ে গেছে।

সেপ্টেম্বরে হাসপাতালে রোগী ভর্তির হারও সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়। এ মাসে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ৭২ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মে মাসে এই সংখ্যাটি ছিল ১ হাজার ২৩।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত মে মাসে দেশে মোট হাম আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩৭ হাজার ৮২৬ জন। এরপর জুন মাসে ৩৩ হাজার ৬৬, জুলাইয়ে ৩১ হাজার ৩২৭ এবং আগস্টে ৩২ হাজার ৯৩৪ জন শনাক্ত হয়। তবে সেপ্টেম্বরের প্রথম ২৬ দিনেই এ সংখ্যা প্রায় ৩২ হাজারে গিয়ে ঠেকেছে।

গতকাল সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় হামসদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৯৬ জনে পৌঁছেছে, যার বড় অংশই শিশু। একই সময়ে দেশে নতুন করে ১ হাজার ৩৪১ জনের হাম বা হামসদৃশ রোগের সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা এখন ২ লাখ ৯ হাজার।

কেন এই ঊর্ধ্বগতি

চলতি বছরের শুরুতে সরকার দুবার পদক্ষেপ নিলেও হামের প্রকোপ প্রত্যাশিত মাত্রায় কমেনি। গত এপ্রিল ও মে মাসে জরুরি হাম টিকাদান কর্মসূচি চালানো হয়। এরপর প্রথম দফায় বাদ পড়া শিশুদের টিকার আওতায় আনতে জুলাইয়ের শেষের দিকে একটি সম্পূরক কর্মসূচি নেয় সরকার।

জুলাই মাস পর্যন্ত আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার কমতে থাকায় মনে হয়েছিল টিকাদান কর্মসূচিগুলো কাজে আসছে। কিন্তু আগস্টে আবারও সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যু বাড়তে শুরু করে এবং সেপ্টেম্বরে তা নতুন রেকর্ড তৈরি করে।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগের টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং হাসপাতাল ও রোগীদের সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবই হাম ফিরে আসার মূল কারণ। এ ছাড়া আক্রান্ত শিশুদের দেরিতে শনাক্ত করা এবং তাদের বাড়িতে আইসোলেশনে রাখার ক্ষেত্রেও গাফিলতি ছিল।

গত ২৮ জুনের জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইনে সরকারের তথ্যে একটি বড় ধরনের অসংগতি ধরা পড়ে। ওই ক্যাম্পেইনে ২ কোটি ২৩ লাখ শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। এর অর্থ হলো, প্রায় ৩৮ লাখ ৮০ হাজার শিশু হামের টিকার আওতার বাইরে রয়ে গিয়েছিল।

বাদ পড়া এই শিশুদের টিকার আওতায় আনতে জুলাইয়ের শেষের দিকে আবারও টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ। গতকাল পর্যন্ত টিকা দেওয়া শিশুর সংখ্যা ১ কোটি ৯৯ লাখে পৌঁছালেও তত দিনে সংক্রমণ আবার বাড়তে শুরু করে।

পরিসংখ্যান বলছে, মে মাসে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২২০ জন শনাক্ত হলেও জুলাইয়ে তা কমে ১ হাজার ১০ জনে নেমেছিল। কিন্তু আগস্টে তা বেড়ে ১ হাজার ৬২ এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ২২৯ জনে পৌঁছায়।

একইভাবে মে মাসে দৈনিক গড়ে ১ হাজার ২৩ জন হাসপাতালে ভর্তি হলেও জুলাইয়ে তা কমে ৮৫০ জনে নামে। কিন্তু আগস্টে তা বেড়ে ৮৮৬ জন এবং সেপ্টেম্বরে ১ হাজার ৭২ জনে দাঁড়ায়।

মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। মে মাসে দৈনিক গড়ে সবচেয়ে বেশি ১০ জন মারা গেলেও জুলাইয়ে তা কমে ৩ দশমিক ৮৪-এ নেমে আসে। কিন্তু আগস্টে তা বেড়ে ৪ দশমিক ৩৯ এবং সেপ্টেম্বরে ৪ দশমিক ৭৩ জনে দাঁড়ায়। মে মাসের পর দৈনিক মৃত্যুর গড়ে সেপ্টেম্বরের পরিস্থিতিই সবচেয়ে খারাপ।

পরিস্থিতি সামাল দিতে গত শনিবার সরকার ‘ক্যাচ-আপ’ হাম টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো আগের কর্মসূচিগুলোতে বাদ পড়া ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ৩৪ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা।

তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, এই নতুন কর্মসূচির ফল রাতারাতি মিলবে না।

গতকাল জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, সাধারণত টিকা দেওয়ার তিন থেকে চার সপ্তাহ পর শিশুর শরীরে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। ‘তাই সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর ঘটনাগুলো আরও এক মাস চলতে পারে।’

তিনি আরও বলেন, যেহেতু অনেক বেশি বয়সী শিশুরাও আক্রান্ত হচ্ছে, তাই ১৫ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের টিকাদান কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। এর ফলে বৃহত্তর জনসংখ্যার মধ্যে ‘হার্ড ইমিউনিটি’ তৈরি হতে সাহায্য করবে।

এ ছাড়া যেসব শিশুর বয়স ছয় মাসের কম, তাদের মায়েদেরও টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি, যাতে মায়ের মাধ্যমে নবজাতক ইমিউনিটি বা প্রতিরোধক্ষমতা পেতে পারে।

মুশতাক হোসেন বলেন, ‘শুধু হাসপাতালভিত্তিক পদক্ষেপ দিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। কমিউনিটি বা সমাজ পর্যায়েও উদ্যোগ নিতে হবে, যা বর্তমানে একেবারে অনুপস্থিত।’