আইসিইউ সংকট, প্রতিদিন ‘কঠিন’ হচ্ছে ডেঙ্গু যুদ্ধ

হেলিমুল আলম
হেলিমুল আলম

নরসিংদীর বাসিন্দা মোহাম্মদ হারুনকে প্রায় ২ সপ্তাহ রাখা হয় আইসিইউতে। চারদিন আগে আগে তাকে তাকে সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয়।

সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি তার ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরে তাকে প্রথমে নরসিংদীর মনোহরদীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে একদিন থেকে জানা যায়, তার কিডনিতে পানি জমে গেছে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে রেফার করা হয়।

তার মেয়ে হিমি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ঢামেকের আইসিইউতে প্রায় ২ সপ্তাহ চিকিৎসা নিয়ে আমার বাবা কিছুটা সুস্থ হয়েছেন। এখন তাকে ৫০২ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।'

হারুনের ভাগ্যে আইসিইউ বেড মিলে গেলেও, অনেক মুমূর্ষু রোগীর ক্ষেত্রেই তা সম্ভব হচ্ছে না। উপচে পড়া রোগীর ভিড়ে একটি আইসিইউ বেড পেতে কঠিন সংগ্রাম করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।

ঢামেক হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ডের দায়িত্বপ্রাপ্ত চিকিৎসক ড. আনিকা ডেইলি স্টারকে বলেন, 'ডেঙ্গু শনাক্ত কোনো রোগীকেই সাধারণত আমরা ফিরিয়ে দিই না। কিন্তু গতদিন এক রোগীর সিসিইউ বা আইসিইউ প্রয়োজন ছিল। ঢামেকের দুটি ইউনিটের কোনোটিতেই আইসিইউ বেড খালি ছিল না। ওই রোগীকে পরে অন্য হাসপাতালে পাঠাতে হয়।'

ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ইতোমধ্যেই তিনটি ওয়ার্ড নির্ধারিত করা হয়েছে বলে জানান তিনি।

ঢামেক সূত্রে জানা গেছে, এই হাসপাতালে আইসিইউ বেডের সংখ্যা মোট ১১৩টি।

সরেজমিন পরিদর্শনে ওয়ার্ডগুলোতে অতিরিক্ত বেড দেখা গেছে। এর পরও বেড সংকটের কারণে অনেক রোগী মেঝেতে থেকেই চিকিৎসা নিচ্ছিলেন।

জুলেখা বেগম তার ১৭ বছরের ছেলে আবদুল্লাহ আল মুক্তাদিরকে বুয়েট মেডিকেল সেন্টার থেকে ঢামেকে নিয়ে এসেছেন। বেশ কয়েকদিন ধরে তীব্র জ্বরে ছেলেটির শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়েছে।

জুলেখা বলেন, 'ঢামেকে ভর্তি করার পর ছেলের প্লাটিলেট ৪০ হাজার থেকে বেড়ে ১ লাখ ৩০ হাজার হয়েছিল। কিন্তু গতকাল আবার কমে ১ লাখ ১০ হাজারে নেমেছে।'

'সাধারণ ডেঙ্গু রোগীদের ক্ষেত্রে প্লাটিলেট ওঠানামা স্বাভাবিক নয়। তবে অন্যান্য সংক্রামক জটিলতা থাকলে, বিশেষ করে ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমের মতো গুরুতর ক্ষেত্রে এটি হতে পারে,' বলেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত করা হয়েছে ১০০ বেড। কিন্তু অতিরিক্ত রোগীর কারণে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

ডা. নাজমুল জানান, হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু আক্রান্ত মুমূর্ষু রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। আইসিইউ বেডও সহসা পাওয়া যাচ্ছে না।

তাই কোনো কোনো রোগীকে ডেঙ্গুর জন্য নির্ধারিত ওয়ার্ডের বাইরেও চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি।

নাজমুল জানান, বেশিরভাগ ডেঙ্গু রোগী—এমনকি যারা শকে চলে গেছেন, সঠিক চিকিৎসা ও সহায়ক সেবার মাধ্যমে তাদের সাধারণ ওয়ার্ডেই সুস্থ করে তোলা সম্ভব।

খুব অল্প রোগীর ক্ষেত্রেই আইসিইউর প্রয়োজন হয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তবে যাদের হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক বা অন্যান্য জটিল রোগ রয়েছে, তাদের শুধু সাধারণ স্যালাইন থেরাপি দিয়ে কাজ নাও হতে পারে। ফলে যেসব হাসপাতালে আইসিইউ বেড খালি রয়েছে, সেখানে রোগী স্থানান্তরের প্রয়োজন পড়ে বলে জানান তিনি।

সাধারণ মানুষের, বিশেষ করে শহর ও গ্রামের নিম্নআয়ের মানুষের বাড়ির কাছাকাছি সহজে ডেঙ্গু পরীক্ষার সুবিধা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন এই চিকিৎসক।

তিনি বলেন, ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ অনেকেই জ্বর কমে গেলে নিজেদের ঝুঁকিমুক্ত ভেবে স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু করে দেন। এতে অনেক সময় পরে জটিলতা তৈরি হয়।

'কেউ যদি শুরুতেই জানতে পারেন তিনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত, তাহলে বাড়িতেই অবস্থান করবেন এবং অন্তত ১০ দিন বিশ্রামে থাকবেন,' বলেন ডা. নাজমুল আহসান।

এ বছরের শুরু থেকে গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত দেশে অন্তত ২৯৫ ডেঙ্গু রোগী মারা গেছেন। আর হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৯৫ হাজার ৪৫১ জন।