সরকারের উদাসীনতায় সংকটে জাতীয় স্বাস্থ্য হটলাইন
বেসরকারি সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ শেষ, ২২ মাস ধরে প্রকল্পের অর্থায়ন বন্ধ ও অর্থ সংকটে জনবল প্রায় অর্ধেক কমে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে দেশের জাতীয় টেলি-পরামর্শ সেবা ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’।
দেশের যেকোনো প্রান্তের নাগরিক ১৬২৬৩ হটলাইন নম্বরে কল করে বিনামূল্যে চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্যগত তথ্য ও প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা পেতে পারতেন।
২০১৫ সালে যাত্রা শুরুর পর চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত স্বাস্থ্য বাতায়নে ২ কোটি ৭২ লাখেরও বেশি কল এসেছে। বিশেষত প্রত্যন্ত ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকার অসংখ্য মানুষের জন্য এটি ভরসার জায়গা হয়ে উঠেছিল।
সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান সিনেসিস আইটি জানিয়েছে, তারা গত ২২ মাস ধরে কোনো অর্থ পায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটি জনবল অর্ধেকে নামিয়ে আনতে বাধ্য হয়েছে।
স্বাস্থ্য বাতায়নে প্রতিদিন গড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার কল আসে, কিন্তু জনবল কমে যাওয়ায় এখন মাত্র ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার কলের জবাব দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। এতে সেবা বঞ্চিত হচ্ছেন হাজারো মানুষ।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় হাসপাতাল ও ক্লিনিকে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়লে দূরবর্তী চিকিৎসা পরামর্শের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে স্বাস্থ্য বাতায়ন অপরিহার্য হয়ে উঠেছিল।
মহামারির সময় হটলাইনে ১ কোটি ৯ লাখের বেশি মানুষ ফোন করে।
‘আমরা যে সংকটে আছি তাতে আর কতদিন এই সেবা চালিয়ে যেতে পারবো—জানি না,’ বলেন সিনেসিস আইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোহরাব আহমেদ চৌধুরী। স্বাস্থ্য বাতায়ন শুরু থেকেই পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানে আছেন তিনি।
সর্বশেষ চুক্তির মেয়াদ ৩০ এপ্রিল শেষ হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি ১ বছরের জন্য মেয়াদ বৃদ্ধির আবেদন করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ৬ মাসের বর্ধিত মেয়াদের প্রস্তাব দেয়, যা এখনো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
শোহরাব বলেন, নতুন চুক্তির জন্য দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে সাধারণত ৮ থেকে ১০ মাস সময় লাগে, তাই মেয়াদ ৬ মাস বৃদ্ধি যথেষ্ট না।
তিনি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যেই প্রায় ২ মাস কেটে গেছে। এখন অনুমোদন পেলেও কার্যকরভাবে আর মাত্র ৪ মাস সেবা দেওয়া সম্ভব হবে। এরপর আবার শূন্যতা তৈরি হবে।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমের (এমআইএস) ই-হেলথ অপারেশনাল প্ল্যানের আওতায় স্বাস্থ্য বাতায়ন চালু হয়। বিনামূল্যের এই সেবায় চিকিৎসকের পরামর্শ, স্বাস্থ্যগত তথ্য ও অ্যাম্বুলেন্স-সংক্রান্ত তথ্য দেওয়া হয়।
চিকিৎসকেরা রোগীদের সমস্যা শুনে সরাসরি তাদের মোবাইল ফোনে ব্যবস্থাপত্র (প্রেসক্রিপশন) পাঠিয়ে দেন। সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ দেওয়া প্রায় ১০০ জন এমবিবিএস চিকিৎসক ও ২৫ জন স্বাস্থ্যতথ্য কর্মকর্তা পালাক্রমে এই সেবা দিতেন।
এপ্রিলে কল সেন্টারটিতে ১ লাখ ৯৭ হাজার কল আসে, যার মধ্যে ১ লাখ ১৬ হাজার ছিল চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে। মে মাসে কলের সংখ্যা কমে হয় ১ লাখ ৮২ হাজার, যার মধ্যে চিকিৎসা পরামর্শের জন্য ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কল। জনবল কমানোর প্রভাব এতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত বছর স্বাস্থ্য বাতায়নে ২৩ লাখ ৪৬ হাজার ৭৭৩টি কল এসেছিল। আর চলতি বছরের ২৪ জুন পর্যন্ত মোট কলের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৪৪৬টি।
একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন রেজাউল করিম। এই সেবাটি তিনি নিয়মিত ব্যবহার করেন। রেজাউল বলেন, তিনি সর্বশেষ দুই মাস আগে এই সেবা নিয়েছেন।
‘এটি খুবই ভালো একটি সেবা। যেকোনো সময় চিকিৎসা পরামর্শ পাওয়া যায়। একই চিকিৎসা নিতে বাইরে হাসপাতালে যেতে হলে অনেক বেশি সময় লাগতো, আর খরচও হতো,’ বলেন তিনি।
আরেক ব্যবহারকারী মিঠু হালদার জানান, গত এক বছরে তিনি তিনবার এই সেবা নিয়েছেন।
সেবাটি চালু থাকা নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘আমার মতো হাজারো মানুষের জন্য এটি বড় সুবিধা। একটি নির্ভরযোগ্য সেবা। সরকারের উচিত যেকোনো মূল্যে এটি চালিয়ে নেওয়া।’
স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাতের চতুর্থ কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) মেয়াদ ২০২৪ সালের জুনের পর শেষ হলে এই সমস্যার সূত্রপাত হয়। এই কর্মসূচি থেকে স্বাস্থ্য বাতায়নের অর্থায়ন আসতো।
অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৫ সালের মার্চে প্রস্তাবিত পঞ্চম কর্মসূচি বাতিল করে দেয়। ফলে অর্থ সংকটে পড়ে জনপ্রিয় এই সেবাটি।
যদিও চতুর্থ এইচপিএনএসপির অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে গত বছরের ডিসেম্বরে একটি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয় এবং তাতে স্বাস্থ্য বাতায়নকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে চলতি মাসের শুরুতে। ফলে প্রকল্পের কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি।
এদিকে, সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানটি ২২ মাস ধরে কোনো অর্থ পায়নি। ফলে তাদের প্রাপ্য বকেয়ার দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৪ কোটি টাকা। এপ্রিলে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় পরিস্থিতির আরও জটিল হয়েছে।
শোহরাব জানান, সেবাটি বুদ্ধিবৃত্তিক ও পরামর্শভিত্তিক হওয়ায় এর দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় লাগে। এ কারণে তারা এক বছরেরও বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করে আসছেন, কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
এখনো নতুন দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকার এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নেতৃত্বে পরিবর্তন আসার পর নতুন প্রশাসন চুক্তির মেয়াদ ৬ মাস বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অনুমোদনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ফাইলটি স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে পাঠায়।
গত ২৩ জুন শোহরাব দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘কিন্তু এখনো মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন মেলেনি।’
এদিকে, এপ্রিলের পর সিনেসিস আইটি তাদের জনবল ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে। চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়া এবং নবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে এই সিদ্ধান্তে আসতে হয়েছে বলে তিনি জানান।
তিনি বলেন, ‘২২ মাস ধরে সরকারের কাছ থেকে অর্থ না পেলেও আমাদের চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মীদের বেতন দিতে হয়েছে। এ জন্য আমাদের ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। জাতীয় স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আমরা সেবাটি চালু রেখেছি।’
যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস পরিচালক আবু আহাম্মদ আল মামুন বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই সেবাটি চালু রাখতে তারা কাজ করছেন এবং বর্তমান চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব ইতোমধ্যেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রস্তাবটি এখন অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।’ তিনি আরও জানান, আগামী মাসে নতুন ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মামুন বলেন, বিভিন্ন কারণে সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানের বকেয়া পরিশোধ করা সম্ভব হয়নি। তবে আগামী অর্থবছরের বাজেট থেকে সেই অর্থ পরিশোধ করা যাবে বলে তিনি আশা করছেন।
এক প্রশ্নের জবাবে মামুন বলেন, নতুন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান নিয়োগের দরপত্র প্রক্রিয়া জুলাই মাসে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য সচিব এম কামরুজ্জামান চৌধুরী বলেন, তারা সমস্যাটি সম্পর্কে অবগত এবং দ্রুত এর সমাধান হবে বলে আশা করছেন।
মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাবটি প্রায় দুই মাস ধরে উপদেষ্টার দপ্তরে আটকে আছে—এই প্রতিবেদক জানালে তিনি বলেন, ‘এটা হওয়ার কথা নয়। আমি বিষয়টি খতিয়ে দেখব।’