সরকারি ডাক্তার-স্বাস্থ্যকর্মীদের শৃঙ্খলায় আনতে আসছে জিপিএস প্রযুক্তি
সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জিওফেন্সিং ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছে সরকার। উপস্থিতির রেকর্ডের সঙ্গে তাদের বেতন, ছুটি ও পদোন্নতির মতো বিষয়গুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
জিওফেন্সিং হলো এমন একটি প্রযুক্তি, যা জিপিএস বা মোবাইল নেটওয়ার্কের সাহায্যে নির্দিষ্ট কোনো স্থানের চারপাশে একটি অদৃশ্য বা ভার্চ্যুয়াল গণ্ডি তৈরি করে। কোনো ব্যক্তি বা ডিভাইস এই গণ্ডির ভেতরে প্রবেশ করলে বা বাইরে গেলে প্রযুক্তিটি তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারে।
গত ২০ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর ২৯ জুলাই স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ থেকে ইস্যু করা এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট সব দপ্তরকে এসব সিদ্ধান্ত দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়।
আগামী ১৫ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে অগ্রগতি প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্যও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এরপর ২৫ আগস্ট এই কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করার কথা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। সভা সংক্রান্ত নথি থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে প্রথমবার গিয়ে প্রধানমন্ত্রী হাম ও ডেঙ্গু পরিস্থিতি, স্বাস্থ্য অবকাঠামো এবং ব্যবস্থাপনা বিষয়ে একগুচ্ছ নির্দেশনা দেন। তবে সভায় উপস্থিত একজন এই প্রতিবেদককে জানান, সেদিন সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের উপস্থিতির বিষয়টি নিয়েই প্রায় এক ঘণ্টা ধরে আলাপ-আলোচনা চলে।
সভায় কর্মকর্তারা জানান, দেশের অনেক সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বায়োমেট্রিক হাজিরা পদ্ধতি চালু করা হলেও সেগুলো এখনো কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণ বা বিশ্লেষণ করার সুযোগ তৈরি হয়নি।
হাসপাতাল পরিচালকেরা সভায় জানান, শুধু বায়োমেট্রিক হাজিরা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ অনেক কর্মী হাজিরা দেওয়ার পর কর্মস্থল ছেড়ে বাইরে চলে যান।
এই সমস্যা সমাধানে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা কর্মস্থলে অবস্থান করছেন কি না, তা জিও-ফেন্সিং প্রযুক্তির মাধ্যমে যাচাই করার প্রস্তাব দেওয়া হয় সভায়।
এ ছাড়া, উপস্থিতির তথ্যকে সরকারের আইবাস++ সিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়েও আলোচনা হয়। এর ফলে সরকারি চাকরির বিধি অনুযায়ী বেতন, ছুটি ও পদোন্নতির মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তগুলো সরাসরি উপস্থিতির রেকর্ডের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হবে।
আইবাস++ মূলত সরকারের এমন একটি হিসাবরক্ষণ পদ্ধতি যার মাধ্যমে বেতন-ভাতার বিষয়গুলো দেখভাল করা হয়।
সভায় দেশের সব সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রের উপস্থিতির তথ্য পর্যালোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যেন সবচেয়ে ভালো এবং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানকে চিহ্নিত করা যায়। এর ফলে কর্তৃপক্ষ দ্রুত ও কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে।
সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, রোগীরা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে ডাক্তার পাবেন না—এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি জোর দিয়ে বলেন, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানের প্রত্যেক কর্মকর্তা-কর্মচারীকে অবশ্যই অফিস চলাকালীন কর্মস্থলে উপস্থিত থাকতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বায়োমেট্রিক হাজিরা, জিওফেন্সিং এবং ডিজিটাল তদারকির সমন্বয়ে একটি ‘সমন্বিত উপস্থিতি ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি’ চালুর নির্দেশ দিয়েছেন।
একইসঙ্গে সব সরকারি হাসপাতালের প্রতিদিনের হাজিরা কেন্দ্রীয়ভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য একটি ‘রিয়েল-টাইম ড্যাশবোর্ড’ তৈরির নির্দেশনাও দেন তিনি।
এর আলোকে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে বায়োমেট্রিক ব্যবস্থা পুরোপুরি সচল করা এবং জিওফেন্সিং পদ্ধতি চালু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে কর্মীদের উপস্থিতির হিসাব আইবাস++ সিস্টেমে যুক্ত করে বেতন-ভাতা ও পদোন্নতির সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের মান যাচাই করে সেরা এবং সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তালিকা তৈরি করা হবে এবং সেই অনুযায়ী পুরস্কার বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক প্রভাস চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রের প্রধানদের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারি নোটিশ, অনলাইন সভা ও বিভিন্ন সেমিনারের মাধ্যমে তাদের এ বিষয়ে অবগত করেছি। উপস্থিতি যেন আরও নিয়মিত হয় এবং তা সঠিকভাবে নথিবদ্ধ করা হয়, সেজন্য আমরা তাদের প্রতিনিয়ত উৎসাহিত করছি।’
তিনি আরও জানান, উপস্থিতির বিষয়টি এখন সাপ্তাহিক ও মাসিক সভার নিয়মিত আলোচ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং এসব উদ্যোগের ফলে এরইমধ্যে অনেক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দৃশ্যমান উন্নতি দেখা গেছে।
জিওফেন্সিং প্রযুক্তি চালুর বিষয়ে জানতে চাইলে প্রভাস চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, এ সংক্রান্ত কারিগরি নির্দেশিকা এখনো জারি করা হয়নি।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি কারিগরি বিষয়। এই পদ্ধতিতে কীভাবে হাজিরা শনাক্ত করা হবে বা এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে আমরা এখনো কোনো নির্দেশনা পাইনি। আমরা অপেক্ষায় আছি।’