ইরান যুদ্ধ বন্ধে ‘মঞ্চে’ পাকিস্তান, ‘দর্শকসারিতে’ ভারত

মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান
মোহাম্মদ ইশতিয়াক খান

‘আমি আনন্দের সঙ্গে ঘোষণা করছি, ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্র এবং যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা লেবানন ও অন্যান্য অঞ্চলসহ সর্বত্র অবিলম্বে যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দিয়েছে। এই যুদ্ধবিরতি তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হবে’—এ ধরনের ঘোষণা যে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের কাছ থেকে আসতে পারে, তা অনেকের চিন্তাতেই আসেনি।

২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬। এই দুর্যোগপূর্ণ দিনটিতে হঠাৎ করেই ইরানের বিরুদ্ধে যৌথভাবে সামরিক হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। 

প্রথমদিনের হামলাতেই প্রাণ হারান ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা।

ট্রাম্প ধরেই নিয়েছিলেন, শীর্ষ নেতৃত্বকে নির্মূল করলেই ‘তাসের ঘরের’ মতো ভেঙে পড়বে ইরান।

বাস্তবে তা হয়নি। এক অবিশ্বাস্য ও নজিরবিহীন পাল্টা হামলা শুরু করে ইরান। মধ্যপ্রাচ্যে প্রতিবেশী আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও কাতারের মতো মার্কিন মিত্রদের দিকে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে ইরান।

সমরবিদদের ভাষ্য: ইরানের শাহেদ ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ‘দামে সস্তা হলেও বেশ ধ্বংসাত্মক’।

এর মধ্যে পারস্য উপসাগরের কৌশলগত হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে বৈশ্বিক তেল-গ্যাস খাতকে অবরুদ্ধ করে তেহরান। সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ‘লেজেগোবরে’ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

 

এমন বাস্তবতায় বিবদমান পক্ষগুলোকে থামাতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় ইসলামাবাদ। আরও সুনির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, দেশটির সেনাপ্রধান আসিম মুনির।

অন্যদিকে, পাকিস্তানের প্রতিবেশী ও প্রধান প্রতিপক্ষ ভারতের নেতা নরেন্দ্র মোদির অস্বস্তিকর নীরবতা ও সার্বিক অনুপস্থিতিকে ‘কাপুরুষোচিত আচরণ’ আখ্যা দিয়েছে তার নিজের দেশেরই মানুষজন।


মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় পাকিস্তান


গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে দ্বিতীয় দফা হামলা শুরুর আগে ২০ দিনের ব্যবধানে তিনবার শান্তি আলোচনায় অংশ নেয় তেহরান-ওয়াশিংটন। তিনটি বৈঠকেই মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছিল ওমান। বৈঠকের মূল বিষয়বস্তু ছিল ইরানের পরমাণু প্রকল্প।

পরবর্তী বৈঠকের দিন হিসেবে ২ মার্চ নির্ধারণ করা হয়। দুই পক্ষ নিজ নিজ দাবিতে অটল থাকলেও বিশ্বজনতার আশা ছিল, একটি শান্তিপূর্ণ সমাধানে পৌঁছানো যাবে।
কিন্তু এরইমধ্যে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। শান্তি আলোচনার মধ্যে সংঘাত শুরুর বদনাম কুড়ান মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প।

হোয়াইট হাউসের বাইরের ফুলের বাগানে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স
হোয়াইট হাউসের বাইরের ফুলের বাগানে ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

 

এরপর একে একে কেটে যায় ৩৯টি দিন। ত্রিমুখী শক্তির সংঘাতে গোটা বিশ্বে নেমে আসে বিপর্যয়। অসংখ্য মানুষ হতাহত হন, অনেক জানমালের ক্ষতি হয়।

এই দীর্ঘ সময়ে দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে ওমান, মিশর বা তুরস্কের মতো মধ্যপ্রাচ্যের প্রথাগত মধ্যস্থকারীদের তেমন একটা উদ্যোগী হতে দেখা যায়নি।

গত ৬ এপ্রিল জানা যায়, ইরানে শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে রাতভর আলোচনা করেছেন।

তার একদিনের মাথায় এলো যুদ্ধবিরতির ঘোষণা।
ট্রাম্প নিজেই স্বীকার করে নেন—আসিম মুনির আর শেহবাজ শরিফ তার সামনে যে শান্তি প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন, তাতেই তিনি সম্মতি দিয়েছেন।

নিহত সেনার কফিন কাঁধে আসিম মুনির ও শেহবাজ শরীফ। ফাইল ছবি: রয়টার্স
নিহত সেনার কফিন কাঁধে আসিম মুনির ও শেহবাজ শরীফ। ফাইল ছবি: রয়টার্স

 

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচিও এই সংঘাত নিরসনে ইসলামাবাদের ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

যুদ্ধবিরতির ঘোষণা এক্সে পোস্ট করার পাশাপাশি আগামী সপ্তাহে ‘চূড়ান্ত আলোচনার’ সম্ভাব্য ভেন্যু হওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
সব মিলিয়ে, পাকিস্তানকে ‘বিশ্বমঞ্চে’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখে বিশ্ববাসী। মজার বিষয় হলো, গত ৩৯ দিনের একটি বড় সময় প্রতিবেশী আফগানিস্তানের সঙ্গে নিজেরাই সংঘাতে জড়িয়ে ছিল পাকিস্তান।

 

ভারতের ‘কাপুরুষের মতো আচরণ’ ও প্রতিক্রিয়া
 

সংঘাতের শুরু থেকেই নিজেদেরকে ‘ইসরায়েলের মিত্র’ হিসেবে তুলে ধরে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া থেকে দূরে থাকতে দেখা যায় নয়াদিল্লিকে। 

নেতানিয়াহু-মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ছবি: সংগৃহীত
নেতানিয়াহু-মোদির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সর্বজনবিদিত। ছবি: সংগৃহীত

 

পাশাপাশি, ভারতের সরকারি বয়ানে পাকিস্তানের ভূমিকাকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা দেখা যায়। দেশটির গণমাধ্যম দিয়েছে মিশ্র বার্তা।

তবে মোদি সরকারের এই অবস্থানকে ভালো চোখে দেখেননি বিরোধীরা।

 

কংগ্রেসের বক্তব্য


গত ২৬ মার্চ ইরান যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের মহাসচিব জয়রাম রমেশ।

Jairam Ramesh hails Kalpakkam reactor as landmark in India’s nuclear journey
ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেসের মহাসচিব জয়রাম রমেশ। ছবি: স্টেটসম্যান

 

তবে পাশাপাশি মোদি সরকারকেও ‘এক হাত’ নিতে ছাড়েননি তিনি।

তার অভিযোগ—ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদি মুখে বড় বড় কথা বললেও আদতে ‘কাপুরুষের’ মতো আচরণ করেন।

মোদির আচরণের কারণেই পাকিস্তানের মতো একটি ‘ভেঙে পড়া’ দেশ ‘মধ্যস্থতাকারীর বেশে’ আবির্ভূত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে—এমনটাই দাবি এই নেতার।

‘আগুনে আরও খানিকটা ঘি ঢেলে’ তিনি বলেন, ‘স্বঘোষিত বিশ্বগুরুর ব্যর্থতা পাকিস্তানের জন্য শাপে বর হয়েছে।’

নরেন্দ্র মোদির 'বিশ্বগুরু' প্রচারণা। ছবি: সংগৃহীত
নরেন্দ্র মোদির 'বিশ্বগুরু' প্রচারণা। ছবি: সংগৃহীত

 

উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বিজেপি মোদিকে ‘বিশ্বগুরু’ হিসেবে উপস্থাপনের পরিকল্পিত উদ্যোগ চালিয়ে এসেছে। ভারতীয় পুরাণ ও ইতিহাস মতে, স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন একজন ‘বিশ্বগুরু’। সাধারণত একজন জ্ঞানী, প্রজ্ঞাবান ও আধ্যাত্মিক নেতাকেই এই পদবী দেওয়া হয়।

তবে বিজেপির এই উদ্যোগ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হিতে-বিপরীত হয়েছে। নেটিজেনদের কাছে মোদির এই ‘টাইটেল’ হাস্য-তামাশার ইন্ধন জুগিয়েছে।

গত ২৬ মার্চ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী মত দেন, ‘মোদির পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে বিশ্বজুড়ে হাসাহাসি হয়। মানুষ তার এই নীতিকে রসিকতা হিসেবে দেখে।’

Closed-door hearing in Rahul Gandhi citizenship case as Centre cites ‘highly confidential’ records
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। ছবি: স্টেটসম্যান

 

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে পাকিস্তানের সাফল্যের উদাহরণ দিয়ে রাহুল বলেন, ‘মোদি নিজের পছন্দ অনুযায়ী পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছেন। এতে ভারতের কোনো উপকার হচ্ছে না।’


সরকারের ভাষ্য
 

সম্প্রতি এক সর্বদলীয় বৈঠকে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করেন। তিনি পাকিস্তানকে ‘দালাল’ আখ্যা দেন, এবং বলেন, তারা শান্তি প্রতিষ্ঠা করেনি, বরং ‘দুই পক্ষের পরিচিত’ দেশ হিসেবে এ ধরনের সুনাম কামিয়েছে।

Disease must never be used as weapon: EAM Jaishankar calls for stronger global biosecurity framework at BWC 50th anniv
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শংকর। ছবি: স্টেটসম্যান

 

তিনি উল্লেখ করেন, তৃতীয় পক্ষের সংঘাতে নাক গলানোর ইতিহাস আছে পাকিস্তানের। ভারত এ ধরনের ভূমিকায় যেতে চায় না।

প্রধানমন্ত্রী মোদির বরাত দিয়ে তিনি আরও বলেন, নয়াদিল্লি বরাবরই ট্রাম্পকে সরাসরি বলে এসেছে, এই সংঘাত সবার ক্ষতি করছে এবং এর দ্রুত নিরসন প্রয়োজন।

 

গণমাধ্যমের বয়ান


ভারতের গণমাধ্যমে পাকিস্তানের উদ্যোগ ও সাম্প্রতিক সাফল্যকে ছোট করে দেখানোর প্রবণতা দেখা গেছে

গত ২৪ মার্চ ডয়চে ভেলের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় আসা মোদির জন্য অস্বস্তির কারণ।

গত মাসে টাইমস অব ইন্ডিয়ার এক প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘পাকিস্তানের জয় মানেই ভারতের পরাজয় নয়।’

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণেই ভারত এই যুদ্ধ থামাতে এগিয়ে আসেনি।

তবে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত হওয়ার পরও সংবাদমাধ্যমটি উল্লেখ করে, ‘পাকিস্তানের কৌশলগত অবস্থান, গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক শক্তি ও ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক এই সংকটে তাদের মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকাকে শক্তিশালী করেছে।’

টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিণশট
টাইমস অব ইন্ডিয়ার প্রতিবেদন। ছবি: স্ক্রিণশট

 

গত মার্চে দ্য হিন্দুর এক মতামত কলামে দিল্লিভিত্তিক লেখক আদিত্য সিনহা বলেন, বলিউডের একের পর এক ছবিতে পাকিস্তানকে ‘জঙ্গি রাষ্ট্র’ হিসেবে দেখানো হয়। পাশাপাশি, বিজেপিও দেশটিকে ‘ভিক্ষুকের দেশ’ আখ্যা দিয়েছে। তা সত্ত্বেও, উপসাগরীয় অঞ্চলে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকায় ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। পাকিস্তানের এই ভূমিকায় চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের পৃষ্ঠপোষকতা আছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

হিন্দুর মতামত কলাম। ছবি: স্ক্রিণশট
হিন্দুর মতামত কলাম। ছবি: স্ক্রিণশট

 

অপরদিকে, বিশ্ব কূটনীতির মঞ্চে ভারত ‘ব্রাত্য’ হয়ে পড়েছে বলেও মত দেন তিনি। জানান, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ (আরএসএস) পাকিস্তানের পতনের স্বপ্ন দেখতে থাকলেও বিশ্ব তা কখনোই হতে দেবে না।

‘পাকিস্তানের আর্থিক সমস্যা অটুট থাকবে। মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে কর্মীদের কাছ থেকে রেমিট্যান্স কমে যাবে, যা অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ ফেলবে। ভারত আশা করতে পারে, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের পশ্চিম সীমান্তে ঝামেলা অব্যাহত রাখবে। কিন্তু এগুলোর সবই একসময় থেমে যাবে,’ যোগ করেন তিনি।

আজ বুধবার মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধবিরতির বিষয়ে আনন্দবাজারের এক সংবাদের শিরোনাম ছিল: ‘শরিফ-মুনিরের “পাকা মাথা”? না কি চিনের নীরব ভূমিকা? কোন পথে হেঁটে এল আমেরিকা-ইরানের যুদ্ধবিরতি?’

আনন্দবাজারের শিরোনাম। ছবি: স্ক্রিণশট
আনন্দবাজারের শিরোনাম। ছবি: স্ক্রিণশট

প্রতিবেদনে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করে নেওয়া হলেও চীন, তুরস্ক ও মিশরসহ অন্যান্য দেশের কথা উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, পাকিস্তান এককভাবে এই সাফল্য অর্জন করেনি।

চীনের ‘পরোক্ষ’ ও ‘নীরব’ ভূমিকার কথা ওই প্রতিবেদনে ফলাও করে জানানো হয়।

যদি দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকে এবং পরবর্তীতে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চালু হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে ভূরাজনীতিতে পাকিস্তানের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের অনেকে।