অ্যান্টার্কটিকার ‘কোট-টাই পরা ভদ্রলোক’ কেন বিপন্ন
অ্যান্টার্কটিকার বিস্তীর্ণ তুষার ঢাকা ভূমিতে তাদের সহজাত বিচরণ। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন কোট-টাই পরা ভদ্রলোক হেলে-দুলে এগিয়ে যাচ্ছেন। সেই এম্পেরর বা সম্রাট পেঙ্গুইন এখন বিপন্ন প্রাণী।
গতকাল বৃহস্পতিবার এই তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
জলবায়ু পরিবর্তনের সর্বশেষ বলি হতে চলেছে এই রাজসিক প্রাণী। হয়তো কোনো এক সময় ডাইনোসরের মতো সম্রাট পেঙ্গুইনের নামও শুধু ইতিহাসের বইতে উচ্চারিত হবে।
নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পথে আরও এক ধাপ এগিয়েছে এই প্রাণী। এমনটাই বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
কোনো একটি বন্যপ্রাণীর বিপন্ন বা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি কতটুকু, সেটার ওপর নজর রাখে দ্য ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশান অব নেচার (আইইউসিএন) নামের একটি সংগঠন।
পাশাপাশি, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বরফ বা বরফাচ্ছন্ন পরিবেশে বসবাস করে এমন প্রাণীদের ‘অস্তিত্ব সংকটের’ মাত্রা নির্ণয় করে সে অনুযায়ী তাদের শ্রেণিবদ্ধ করে আইইউসিএন।
সে ধারায় সম্রাট পেঙ্গুইনকে ‘প্রায় হুমকির মুখে থাকা’ প্রাণী থেকে’ ‘বিপন্ন প্রাণীতে’ উন্নীত করা হয়েছে।
যে কারণে বিপন্ন
মেরু অঞ্চলে সাগরে ভাসমান হিমবাহ বা বরফের টুকরোর ওপর বড় আকারে নির্ভরশীল সম্রাট পেঙ্গুইন। ওই শীতল পরিবেশেই জীবনযাপন, খাবারের জন্য শিকার ও প্রজনন করতে পারে এই প্রাণী। কিন্তু উষ্ণতা বেড়ে যাওয়ার কারণে দ্রুত গলে যাচ্ছে অ্যান্টার্কটিকার বরফ। ফলাফল, দ্রুত কমছে পেঙ্গুইনের সংখ্যা।
বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানী, সরকার ও অন্যান্য সংস্থার সমন্বয়ে গঠিত আইইউসিএন আশংকা প্রকাশ করেছে, ২০৮০ সাল নাগাদ সম্রাট পেঙ্গুইনের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে আসবে।
আইইউসিএন-এর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সদস্য ফিলিপ ট্রাথান এক বিবৃতিতে বলেন, মানুষের কারণে তৈরি জলবায়ু পরিবর্তন সম্রাট পেঙ্গুইনদের জীবনের প্রতি উল্লেখযোগ্য হুমকির কারণ।
ফিলিপ আইইউসিএন এর ‘রেড লিস্ট’ (বিপন্ন ও বিলুপ্তির মুখে থাকা প্রাণীর তালিকা) তৈরি ও হালনাগাদ করার প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত।
হুমকির মুখে থাকা প্রাণীদের লাল তালিকার রক্ষণাবেক্ষণ করে আইইউসিএন।
এটাই উদ্ভিদ, প্রাণী ও শৈবালের ‘বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার হুমকির’ মাত্রা সম্পর্কে জানার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও বিস্তারিত উৎস।
হুমকির মাত্রা নির্ধারণের জন্য ছয়টি শ্রেণী চিহ্নিত করা হয়েছে।
‘সবচেয়ে কম উদ্বেগ’ থেকে ‘বিলুপ্ত’—এই ছয়টি ধাপে প্রাণীদের নিশ্চিহ্নের ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
বুদ্ধিমান প্রাণী
অন্যান্য পেঙ্গুইন থেকে সম্রাট পেঙ্গুইন চিহ্নিত করার উপায় হলো এর গলা ও বুকের সোনালী বা কমলা রঙের একটি ছোপ।
যুগ যুগ ধরে অ্যান্টার্কটিকার বৈরি পরিবেশে টিকে থাকার অনন্য উদাহরণ তৈরি করে এসেছে এই প্রাণী।
শীতকালে সামুদ্রিক বরফের ওপর মসৃণ পৃষ্ঠে ডিম পাড়ে নারী পেঙ্গুইন। তারপর পুরুষ পেঙ্গুইনরা সেই ডিমগুলোকে তাদের পায়ের নিচে লুকিয়ে উষ্ণ রাখে। তারপর সেই বরফের ওপরই বাচ্চা পেঙ্গুইনগুলো বড় হয়।
কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বরফের পৃষ্ঠ অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে। শিশু পেঙ্গুইন পানিরোধক হয়ে ওঠার আগেই ভেঙে যাচ্ছে তাদের থাকার জায়গা।
২০১৬ সালের পর থেকে সমুদ্রপৃষ্ঠে বরফের মাত্রা আশংকাজনক হারে কমছে।
স্যাটেলাইট ছবি থেকে জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে ২০ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক সম্রাট পেঙ্গুইন ‘নিখোঁজ’ হয়েছে।
ফরাসি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিএনআরএস-এর বিজ্ঞানী ক্রিস্তফ বাবোঁদ বলেন, ‘এই গোত্রের প্রাণীর সঙ্গে সামুদ্রিক বরফ ও বরফখণ্ডের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ থাকে।’
‘তবে ২০১৬-২০১৭ থেকে শুরু করে অ্যান্টার্কটিকায় সামুদ্রিক বরফ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে গেছে। যার ফলে, বরফের অভাবে সম্রাট পেঙ্গুইনের টিকে থাকার বিষয়টি অনেক বেশি সংকটপূর্ণ হয়ে গেছে’, বলেন তিনি।
বিজ্ঞানী ফিলিপ ট্রাথান বলেন, সম্রাট পেঙ্গুইন একটি বুদ্ধিমান প্রাণী। এই রাজসিক প্রাণীটির করুণ, অবশ্যম্ভাবী পরিণতি আমাদেরকে দ্রুত পরিবর্তিত হতে থাকা পৃথিবীর বিষয়ে হুশিয়ারি দিচ্ছে।
গ্রিন হাউস গ্যাস নিঃসরণে এখনই রাশ টেনে ধরতে না পারলে আগামীতে এরকম আরও অনেক প্রাণী বিপন্ন হয়ে পড়তে পারে বলে আশংকা প্রকাশ করেন তিনি।



