হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিতে নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছি: ট্রাম্প

স্টার অনলাইন ডেস্ক

ইসলামাবাদে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনা কোনো চুক্তি ছাড়াই ভেস্তে গেছে। প্রায় একদিনব্যাপী ম্যারাথন বৈঠকের পরও দুই পক্ষের মধ্যে মৌলিক মতপার্থক্য দূর করা সম্ভব হয়নি বলে জানা গেছে। 

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র বৈঠকের পর দীর্ঘসময় চুপচাপ ছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। এরপর নীরবতা ভাঙলেন এক ‘বিস্ফোরক’ নির্দেশনায়।  

আজ রোববার বার্তা সংস্থা এএফপি এই তথ্য জানিয়েছে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে পোস্ট করে জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটান ট্রাম্প। বাংলাদেশ স্থানীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে তিনি দুইটি বার্তা পোস্ট করেন। 

প্রথম পোস্টে তিনি স্বীকার করেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ম্যারাথন আলোচনা ‘বেশ ভালোভাবেই এগিয়েছে’ এবং ‘বেশিরভাগ বিষয়ে উভয় পক্ষ ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পেরেছে।’ 

সেরেনা হোটেলে আলোচনার আয়োজন করা হয়। ছবি: রয়টার্স

তবে এটাও উল্লেখ করতে ভুলেননি ট্রাম্প যে ইরান তাদের পরমাণু প্রকল্পের বিষয়ে কোনো ধরনের ছাড় দিতে রাজি হয়নি। 

এরপর ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা নৌবাহিনী। অবিলম্বে তারা হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশ বা সেখান থেকে বের হয়ে আসার চেষ্টারত সকল জাহাজকে আটকে রাখার প্রক্রিয়া শুরু করবে।’ 

‘ইরানীরা যদি আমাদের দিকে অথবা কোনো শান্তিপূর্ণ নৌযানে গুলি চালায়, তাহলে তাদেরকে বোমা মেরে নরকে পাঠানো হবে’, যোগ করেন তিনি। 

ট্রাম্পের দীর্ঘ পোস্টের অংশবিশেষ। ছবি: স্ক্রিণশট
ট্রাম্পের দীর্ঘ পোস্টের অংশবিশেষ। ছবি: স্ক্রিণশট

অর্থাৎ, কার্যত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার জন্য নৌবাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন ট্রাম্প। 
ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, ‘অন্যান্য দেশগুলোও’ এই অভিযানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তবে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেননি। 

ট্রাম্প জানান, তিনি মার্কিন প্রতিনিধিদলের কাছ থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্রিফিং পেয়েছেন। ওই দলে ভ্যান্সের পাশাপাশি তার জামাতা জ্যারেড কুশনার ও বিশেষ প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফও ছিলেন। 

পোস্টে ইরানের কড়া সমালোচনা করেন ট্রাম্প। বলেন, ‘হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েও তা জেনেবুঝে পালন করেনি তেহরান।’ 

‘তারা পানিতে মাইন পেতে রাখার দাবি করছে। যদিও (আমরা জানি) তাদের নৌবাহিনী ও মাইন পেতে রাখতে সক্ষম সেনাদের সবাই পুরোপুরি নির্মূল হয়েছে। হয়তো তারা তা করেছে বা করতে পারেনি। কিন্তু কোন জাহাজ মালিক এখন ঝুঁকি নিয়ে তার জাহাজকে সেখানে পাঠাবে?’, বলেন ট্রাম্প। 

ট্রাম্প হুমকির সুরে বলেন, ‘তারা যেমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা মেনে এখন এই আন্তর্জাতিক নৌপথ উন্মুক্ত করার প্রক্রিয়া দ্রুত শুরু করতে হবে’।  

বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে কার্যত বিশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পথটি বন্ধ রেখেছে ইরান। হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস রপ্তানি হয়। 

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বিত হামলা শুরুর পর থেকেই এই প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ। 

শনিবার মার্কিন সেনাবাহিনী জানায়, তাদের দুইটি যুদ্ধজাহাজ হরমুজ প্রণালির দিকে রওনা হয়েছে। উদ্দেশ্য, মাইন খুঁজে নিষ্ক্রিয় করা। 

ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, প্রয়োজনে ‘ইরানের যতটুকু শক্তি বাকি আছে, তা ধ্বংসের জন্য লড়াই শুরু করবে মার্কিন বাহিনী’। 

তিনি বলেন, ‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত।’

এর আগে, বৈঠকের পর নিউইয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীরবতা বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। আলোচনার আগে তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন এবং প্রয়োজনে সামরিক পদক্ষেপের হুমকিও দিয়েছিলেন। এমনকি তিনি বলেছিলেন, আলোচনায় ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক প্রস্তুতি রয়েছে।

আলোচনা ভেস্তে যাওয়ার পর দেশে ফিরে আসেন মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতা ও দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের প্রতিনিধি দলে ছিলেন পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মাদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। 

বৈঠক শেষে সংবাদসম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ছবি: রয়টার্স

১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পর এটাই ছিল ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক। 

এই আলোচনার উদ্দেশ্য ছিল দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী যুদ্ধবিরতিতে রূপান্তরিত করা। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সেই উদ্দেশ্য সফল হয়নি। 

ইসলামাবাদে ব্যর্থ শান্তি আলোচনা চলাকালীন সময়ে নিজেদের ‘পরমাণু প্রকল্প’ অব্যাহত রাখার বিষয়টিতে ইরান ছিল অনড় ও অবিচল। 

ইসলামাবাদ ছেড়ে যাওয়ার আগে ভ্যান্স গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা একটি অত্যন্ত সরল প্রস্তাব উপস্থাপন করে এখান থেকে বিদায় নিচ্ছি। এটাই আমাদের চূড়ান্ত ও সবচেয়ে সেরা প্রস্তাব। ইরান সেটা মেনে নেয় কী না, এটাই এখন দেখার বিষয়।’ 

বিশ্ববাসী আশায় বুক বেধেছিল, হয়তো দুই সপ্তাহের এই যুদ্ধবিরতির মাঝেই দুই পক্ষ সমঝোতায় পৌঁছাতে পারবে। কিন্তু এখন ট্রাম্পের নতুন এই নির্দেশনায় আবারও মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশংকা দেখা দিয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মত দেন।