‘আগেই অন্তত ৩০ জন শ্বাসরোধে মারা যায়’
‘চার দিন চার রাত ধরে সাগরে...আমাদের ঢুকিয়ে রেখেছিল স্টোর রুমে। সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস ছিল না। ট্রলার ডোবার আগেই অন্তত ৩০ জন শ্বাসরোধে মারা যায়।’
এভাবেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বলছিলেন আন্দামান সাগরে সম্প্রতি ডুবে যাওয়া ট্রলারে থাকা রফিকুল ইসলাম।
টেকনাফ থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার পথে আন্দামান সাগরে প্রায় ৩০০ যাত্রী নিয়ে ডুবে যায় ট্রলারটি। ট্রলারের প্রায় ২৫০ যাত্রী এখনো নিখোঁজ বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসন সংস্থা।
যাত্রীদের মধ্যে হাতেগোনা মাত্র কয়েকজন প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হয়েছেন। তাদেরই একজন রোহিঙ্গা যুবক রফিকুল ইসলাম।
আজ বুধবার বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে উঠে আসে রফিকুলের ভয়ঙ্কর সমুদ্রযাত্রার কথা।
তিনি বলেন, ৪ এপ্রিল ছোট একটি মাছধরা নৌকায় তাদের যাত্রা শুরু হয়। নারী, শিশু, নাবিক ও পাচারকারীসহ প্রায় ৩০০ জনকে একটি ছোট মাছ ধরার নৌকায় গাদাগাদি করে তোলা হয়।
পরে মিয়ানমারের কাছাকাছি সাগরে গিয়ে তাদের বড় একটি ট্রলারে ওঠানো হয়।
মাঝপথে টহল দলের হাত থেকে বাঁচতে ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে বাধ্য করা হয়েছিল তাদের।
রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘চার দিন চার রাত ধরে সাগরে ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে থাকতে হয়েছে আমাদের। টহল এড়াতে পাচারকারীরা আমাদের মাছ ও জাল রাখার স্টোর রুমেও ঢুকিয়ে রাখে।’
‘সেখানে শ্বাস নেওয়ার মতো বাতাস ছিল না।’
এরপর উত্তাল সাগরে এক পর্যায়ে যখন ট্রলারটি উল্টে যায়, তখন বেশিরভাগই সাগরে পড়ে যায় বলে জানান রফিকুল।
তার দাবি, সেসময় ট্রলারে অন্তত ২৪০ জন ছিলেন, যাদের মধ্যে ২০ জন নারী ও কয়েকজন শিশুও ছিল।
একটি বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজ সাগরে ভাসমান অবস্থায় তাকেসহ চারজনকে দেখতে পেয়ে উদ্ধার করে।
পরে তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সমুদ্র থেকে আরও পাঁচজনকে জীবিত উদ্ধার করে জাহাজটি।
জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসন সংস্থার তথ্য মতে, অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই করার কারণে উত্তাল আন্দামান সাগরে ডুবে যায় ট্রলারটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এ মর্মান্তিক ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও রোহিঙ্গাদের চরম হতাশা ও অনিশ্চয়তার চিত্র স্পষ্ট হয়েছে।
মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া কিংবা থাইল্যান্ডে পৌঁছানোর আশায় তারা এমন বিপজ্জনক পথ বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে।
জাতিসংঘের শরণার্থী ও অভিবাসন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কক্সবাজারে বর্তমানে প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়ে আছে। যাদের বেশিরভাগই ২০১৭ সালে সহিংসতার মুখে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসে।
নিরাপত্তা ও জীবিকার খোঁজে অনেকেই এখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে অন্য দেশে যাওয়ার চেষ্টা করছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে।
কক্সবাজারে ৫০০ পরিবারের ওপর ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির (আইআরসি) এক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ২ শতাংশ রোহিঙ্গা অভিভাবক তাদের সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী, যেখানে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে এই হার ৮৪ শতাংশ।
খাদ্য সহায়তা কমে গিয়ে মাথাপিছু মাসে মাত্র ৭ ডলারে নেমে আসায় বহু পরিবার চরম সংকটে পড়েছে।
প্রায় ৬৯ শতাংশ পরিবারের শিশুরা স্কুল ছেড়ে দিয়েছে এবং অর্ধেকেরও বেশি শিশু শ্রমে জড়িয়ে পড়েছে।
এ অবস্থায় জরুরি সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছে আইআরসিসহ মানবাধিকার সংস্থাগুলো।