১৯৬৭ সালে মার্কিন জাহাজে ইসরায়েলি হামলার পুনঃতদন্তের দাবি কেন?
১৯৬৭ সালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস লিবার্টিতে ইসরায়েলি হামলার ঘটনা নতুন করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান থমাস ম্যাসি।
গত সোমবার ওই হামলার ৫৯তম বার্ষিকীতে প্রতিনিধি পরিষদে দেওয়া এক বক্তব্যে এই দাবি জানিয়েছেন তিনি।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৬৭ সালে ওই হামলায় ৩৪ জন মার্কিন সেনাসদস্য নিহত এবং আরও ১৭১ জন আহত হয়েছিলেন।
ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, হামলাটি ছিল একটি ‘দুর্ভাগ্যজনক ভুল’ বা ‘ফ্রেন্ডলি ফায়ার’ ঘটনা। তবে ইউএসএস লিবার্টির বেশ কয়েকজন জীবিত নাবিক এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছেন। তাদের মতে, হামলাটি ছিল সম্পূর্ণ পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
59 years ago today, Israel attacked the USS Liberty in international waters. 34 crew members were killed and 174 were wounded by the IDF.
Today, I spoke on the House floor to honor the fallen and to recognize the survivors who were present in the gallery. pic.twitter.com/DK7WUFnKve— Thomas Massie (@RepThomasMassie) June 8, 2026
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই হামলায় বেঁচে যাওয়া কয়েকজন নাবিকের উপস্থিতিতে প্রতিনিধি পরিষদে বক্তব্য দেন রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি। এ সময় তিনি বেঁচে যাওয়া নাবিকদের সাক্ষ্য তুলে ধরে বলেন, ‘ঘটনার সরকারি ব্যাখ্যা নিয়ে এখনো গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যতদিন তারা বেঁচে আছেন, ততদিন তাদের সত্য জানার অধিকার রয়েছে। আসুন আমরা পুনরায় তদন্ত করে সত্য তুলে ধরি।’
বেঁচে যাওয়া নাবিকদের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি একটি প্রস্তাব পাসেরও অনুরোধ জানিয়েছেন।
ম্যাসি বলেন, ‘এই তদন্ত আরও আগেই করা উচিত ছিল। তারপরও আমি মনে করি বেঁচে যাওয়া নাবিকদের ন্যায়বিচার পাওয়ার সময় এসেছে।’
মার্কিন কংগ্রেসে এ ধরনের বক্তব্য খুবই বিরল। কারণ, ইউএসএস লিবার্টিতে ইসরায়েলি হামলা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক থাকলেও বিষয়টি প্রকাশ্যে খুব কম আলোচনাই হয়েছে।
কী ঘটেছিল ইউএসএস লিবার্টিতে
১৯৬৭ সালে ইসরায়েল ও কয়েকটি আরব দেশের মধ্যে ছয় দিনের যুদ্ধ চলছিল। সে সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহের জন্য কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় অবস্থান করছিল মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস লিবার্টি।
The USS Liberty attack remains one of the most debated incidents of the Six-Day War. Israeli aircraft and torpedo boats struck the U.S. intelligence ship on June 8, 1967, causing heavy casualties and severe damage. Decades later, the USS Liberty incident continues to generate… pic.twitter.com/qY0qhNvuxn
— Global Military Forum (@Danyal_GMF) June 10, 2026
৮ জুন হঠাৎ জাহাজটি লক্ষ্য করে গুলি চালায় ও ন্যাপাম বোমা ফেলে ইসরায়েল। পরে টর্পেডো হামলাও চালানো হয় জাহাজটির ওপর।
ম্যাসির দাবি, হামলার আগের দিনও ইসরায়েলি বিমান জাহাজটির ওপর নজরদারি চালিয়েছিল।
তিনি বলেন, ‘সেদিন আকাশ পরিষ্কার ছিল। ইউএসএস লিবার্টিতে যুক্তরাষ্ট্রের পতাকাও স্পষ্টভাবে উড়ছিল। তারপরও জাহাজটির ওপর হামলা চালানো হয়।’
তার মতে, ইসরায়েলের উদ্দেশ্যই ছিল যাতে কোনো প্রত্যক্ষদর্শী বেঁচে না থাকে।
নিজের যুক্তির সপক্ষে কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন কূটনৈতিক, গোয়েন্দা ও সামরিক কর্মকর্তার বক্তব্য তুলে ধরেন ম্যাসি।
এর মধ্যে রয়েছেন সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্র সচিব ডিন রাস্ক এবং সাবেক শীর্ষ জেনারেল থমাস হিনম্যান মুরার। তারা দুজনেই বিশ্বাস করতেন যে, এই হামলাটি ইচ্ছাকৃত ছিল।
বক্তব্যে ম্যাসি আরও বলেন, ‘এই শীর্ষ কর্মকর্তাদের কেউই মনে করেন না যে এটি একটি দুর্ঘটনা ছিল। তারা মনে করেন এটি ইসরায়েলের পরিচালিত একটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ছিল।’
ম্যাসির দাবি, এটি হয়তো একটি ‘ফলস ফ্ল্যাগ’ অভিযান ছিল অথবা ইসরায়েল চায়নি যে ওই দিন তারা যা করছিল, তা কেউ পর্যবেক্ষণ করুক।
ফলস ফ্ল্যাগ হলো এমন একটি গোপন অভিযান যেখানে হামলার দায় উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অন্যের ওপর চাপানো হয়। সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করতে এবং নিজেদের অপরাধ আড়াল করতে এই প্রতারণামূলক কৌশলটি ব্যবহার করা হয়।
তবে ইসরায়েলপন্থী মহলের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে ভুল শনাক্তকরণের কারণে হামলাটি হয়েছিল, যা যুদ্ধে অস্বাভাবিক নয়।
১৯৬৭ সালে ওই যুদ্ধের পরই অবৈধভাবে পশ্চিম তীর, পূর্ব জেরুজালেম, গাজা ও সিরিয়ার গোলান হাইটস দখল করে নেয় ইসরায়েল।
কেন নতুন করে বিতর্ক
প্রতিবেদনে বলা হয়, রিপাবলিকান থমাস ম্যাসি এমন এক সময়ে দাবিটি তুলেছেন যখন ইসরায়েলকে নিঃশর্ত সহায়তা দেওয়ার মার্কিন নীতির বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ দিন দিন বাড়ছে।
গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানের প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রে ধীরে ধীরে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা কমছে।
সমালোচকরা কয়েক দশক ধরে যুক্তি দিয়ে আসছেন, ইউএসএস লিবার্টিতে হামলার ঘটনা এবং পরবর্তীতে এটি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা প্রমাণ করে যে, ইসরায়েলের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কটি একতরফা। ওয়াশিংটন তার নিজের স্বার্থ রক্ষা করতে পারছে না।
ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং গাজা ও লেবাননে সামরিক অভিযানের প্রেক্ষিতে ইসরায়েলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অংশীদারত্ব নিয়ে সম্প্রতি প্রশ্ন বাড়ছে। একইসঙ্গে ১৯৬৭ সালের ওই হামলাটিও নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
তবে থমাস ম্যাসি মার্কিন-ইসরায়েল সম্পর্কের একজন অন্যতম সমালোচক। তিনি ইরান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর একত্রিত করার প্রচেষ্টারও বিরুদ্ধে।
এছাড়া বিদায়ী এই কংগ্রেস সদস্য গত মাসে কেন্টাকি অঙ্গরাজ্যে প্রাইমারি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী এড গ্যালরিনের কাছে হেরে যান, যাকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েলপন্থী গোষ্ঠীগুলো সমর্থন দিয়েছিল।
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান ড্যান ক্রেনশো থমাস ম্যাসির বক্তব্যের সমালোচনা করলেও ইউএসএস লিবার্টির বেঁচে যাওয়া নাবিকরা একে স্বাগত জানিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা লিখেছেন, ‘অল্প সময়ের মধ্যে আমাদের গল্প এত দুর্দান্তভাবে আর কেউ তুলে ধরেনি। এই গল্প কংগ্রেসের অধিকাংশ সদস্যই শুনতে চান না।’
১৯৬৭ সালের ওই হামলাটি আজও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কের ইতিহাসে অন্যতম বিতর্কিত ও অমীমাংসিত ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।