যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি ভেস্তে যাওয়ার পথে?
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ থামানোর লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) এবং লেবাননে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।
বরং যুদ্ধবিরতি শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হওয়ার খবর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—আঞ্চলিক সংঘাত কি সত্যিই প্রশমনের পথে, নাকি এই যুদ্ধবিরতি কেবল আরও বড় সংকটের আগে একটি সাময়িক বিরতি?
রয়টার্স বলছে, এমন এক সময় এই হামলা হলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সুইজারল্যান্ডে নতুন দফা আলোচনার জন্য রওনা হয়েছেন।
ওয়াশিংটন ও তেহরান আশা করছে, সাম্প্রতিক ১৪ দফা সমঝোতার ভিত্তিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হবে। কিন্তু লেবাননে চলমান উত্তেজনা এবং ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ সেই প্রচেষ্টাকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হামলা
লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়েহ অঞ্চলে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ও ড্রোন একাধিক হামলা চালায়। এতে আবাসিক ভবন ও বাড়িঘর ধ্বংস হয়।
একইসঙ্গে ভোরের আগে ইসরায়েলি গোলন্দাজ বাহিনী নাবাতিয়েহ ও আশপাশের এলাকায় গোলাবর্ষণ করে। এসব হামলায় অন্তত পাঁচজন নিহত হন।
যদিও ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ উভয় পক্ষই শুক্রবার যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় বিকেল ৪টা থেকে তা কার্যকর হয়, তবু যুদ্ধবিরতির শর্ত বাস্তবায়ন নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আস্থার সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এক জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ‘হিজবুল্লাহ যদি আমাদের আক্রমণ না করে, তাহলে আমাদের জন্য এটি যুদ্ধের সময় নয়।’ তবে একইসঙ্গে তিনি জানান, দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের অবস্থান বজায় রাখবে।
এই অবস্থানই মূলত যুদ্ধবিরতির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে। কারণ, হিজবুল্লাহ দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে ‘দখল’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে।
লেবানন: যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তির সবচেয়ে দুর্বল কড়ি
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত ১৪ দফা সমঝোতা স্মারকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো—ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করবে। এর মধ্যে লেবাননও রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, ইসরায়েল এই চুক্তির পক্ষভুক্ত নয়। তেলআবিব শুরু থেকেই দাবি করে আসছে যে তারা যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনার অংশ নয় এবং নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা তাদের রয়েছে।
ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান যতই রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে এগোতে ইচ্ছুক, লেবাননে ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর সংঘর্ষ যেকোনো মুহূর্তে পুরো প্রক্রিয়াকে বিপর্যস্ত করতে পারে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাগচি ইতিমধ্যে সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধবিরতির প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে তার দায় যুক্তরাষ্ট্রকেই বহন করতে হবে।
এটি আসলে ওয়াশিংটনের জন্য একটি কূটনৈতিক পরীক্ষা। কারণ, চুক্তির সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করছে এমন একটি পক্ষের আচরণের ওপর, যাকে চুক্তির টেবিলে আনাই সম্ভব হয়নি।
সুইজারল্যান্ডে নতুন আলোচনা, কিন্তু সামনে কঠিন পথ
যুদ্ধ বন্ধে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী সমঝোতাকে স্থায়ী রূপ দিতে সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে প্রযুক্তিগত পর্যায়ের আলোচনা হওয়ার কথা ছিল। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন।
কিন্তু লেবাননে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় তিনি সফর বাতিল করেন। পরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর মার্কিন দূত স্টিভ উইটকফের সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার খবর প্রকাশ পায়।
এতে বোঝা যায়, ওয়াশিংটন এখনও আলোচনা চালিয়ে যেতে আগ্রহী। তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, মূল জটিলতা এখন আর শুধু ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নয়; বরং ইরানের আঞ্চলিক মিত্রদের ভূমিকা, বিশেষ করে হিজবুল্লাহকে ঘিরে।
লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন সাম্প্রতিক হামলার নিন্দা জানালেও বলেছেন, একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে। একই সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও তার সঙ্গে আলাপে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র করার প্রয়োজনীয়তার কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
এ থেকেই বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র লেবাননের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো পুনর্গঠনের বিষয়টিকে ভবিষ্যৎ চুক্তির অংশ হিসেবে দেখতে চাইছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সম্পর্কে ফাটল?
এই সংকটের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইসরায়েলকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষ।
সিএনএনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স সম্প্রতি ইসরায়েল সম্পর্কে এমন ভাষা ব্যবহার করেছেন, যা কার্যত একটি সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেছেন, বর্তমানে পুরো বিশ্বে ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল একমাত্র রাষ্ট্রপ্রধান হলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফলে ইসরায়েলের উচিত তাদের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রকে বিরক্ত না করা।
ভ্যান্স আরও বলেন, মাত্র ৯০ লাখ মানুষের একটি দেশ হিসেবে ইসরায়েল ‘সব জাতীয় নিরাপত্তা সমস্যা হত্যা করে সমাধান করতে পারে না।’ তিনি ইঙ্গিত দেন যে লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান সীমিত করা উচিত।
এ ধরনের মন্তব্য মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে বাড়তে থাকা হতাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ওয়াশিংটন এখন দ্রুত একটি রাজনৈতিক নিষ্পত্তি চায়, কিন্তু ইসরায়েল মনে করছে যে ইরান ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক চাপ বজায় রাখার এটাই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।
ট্রাম্পের ভাষাতেও অসন্তোষ
শুধু ভ্যান্স নন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে একাধিকবার ইসরায়েলের সমালোচনা করেছেন।
তিনি স্বীকার করেছেন যে লেবাননে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘পাগল’ বলেছিলেন।
এমনকি সতর্ক করে দিয়েছিলেন, ‘বিবি, সাবধান হও, না হলে খুব শিগগিরই তুমি একা হয়ে যাবে।’
আরেক মন্তব্যে ট্রাম্প বলেন, কোনো একজনকে খুঁজতে গিয়ে পুরো অ্যাপার্টমেন্ট ভবন ধ্বংস করে দেওয়া উচিত নয়। কারণ সেখানে থাকা সবাই হিজবুল্লাহ সদস্য নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কোনো রিপাবলিকান প্রশাসনের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছ থেকে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে এত প্রকাশ্য সমালোচনা খুবই বিরল।
কেন সম্পর্কের টানাপোড়েন?
বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান উত্তেজনার মূল কারণ লক্ষ্যগত পার্থক্য।
ইসরায়েলের কাছে এই যুদ্ধের উদ্দেশ্য হলো ইরান ও তার মিত্রদের দীর্ঘমেয়াদে দুর্বল করা। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য যুদ্ধ বন্ধ করা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা।
যুদ্ধের কারণে তেলের বাজারে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। যদিও লেবানন যুদ্ধবিরতির পর ব্রেন্ট ক্রুডের দাম কমতে শুরু করেছে এবং হরমুজ প্রণালির মাধ্যমে জ্বালানি পরিবহনও আংশিক স্বাভাবিক হয়েছে, তবু সংঘাত পুনরায় শুরু হলে বাজার আবারও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
এ ছাড়া, নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্প এমন একটি যুদ্ধের বোঝা টানতে চান না, যা অধিকাংশ মার্কিন ভোটারের কাছে জনপ্রিয় নয়।
চুক্তি কি ভেস্তে যেতে পারে?
এই মুহূর্তে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—লেবাননের পরিস্থিতি কি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতাকে ব্যর্থ করে দেবে?
এর উত্তর এখনও স্পষ্ট নয়। তবে কয়েকটি বিষয় উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
প্রথমত, ইসরায়েল চুক্তির অংশ নয় এবং নিজেদের সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার স্বাধীনতা ধরে রাখতে চাইছে।
দ্বিতীয়ত, হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও লেবাননের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
তৃতীয়ত, ইরান মনে করে লেবাননে যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করার দায় যুক্তরাষ্ট্রের। ফলে সেখানে সংঘাত অব্যাহত থাকলে তেহরান ওয়াশিংটনের ওপর চাপ বাড়াতে পারে।
তবে একইসঙ্গে উভয় পক্ষেরই আলোচনায় ফিরে যাওয়ার প্রবল প্রণোদনা রয়েছে। ইরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলকরণ ও সম্পদ মুক্ত করার সুবিধা চায়, আর যুক্তরাষ্ট্র চায় যুদ্ধের অবসান ও জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা।
ফলে আপাতত বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান চুক্তি এখনও ভেঙে পড়েনি। কিন্তু লেবাননের আকাশে যুদ্ধবিরতির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই যে বোমা পড়েছে, তা স্পষ্ট করে দিয়েছে—এই সমঝোতার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ হবে শুধু সুইজারল্যান্ডের আলোচনার টেবিলে নয়, বরং দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধক্ষেত্রেও।