মানুষের তৈরি কৃত্রিম কোষ ‘স্পাড সেল’, রয়েছে প্রাণের প্রায় সব বৈশিষ্ট্য
বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল এমন এক রসায়ন আবিষ্কার করা, যার মাধ্যমে প্রাণহীন কিছু রাসায়নিক উপাদানকে জীবন্ত প্রাণে রূপান্তর করা যাবে। অবশেষে সেই স্বপ্নের পথে বড় ধাপ এগিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার একদল গবেষক।
বহু উপাদান একসঙ্গে মিশিয়ে তারা এমন এক ধরনের কৃত্রিম কোষ তৈরি করেছেন, যা খেতে পারে, বড় হতে পারে, নিজেদের মতো বিভাজিত বা বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং খাবারের জন্য একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতাও করতে পারে।
এই কোষগুলোকে এখনো পুরোপুরি ‘জীবন্ত’ বলা না গেলেও জীবনের প্রায় সব প্রধান বৈশিষ্ট্যই এর মধ্যে রয়েছে।
বুধবার মার্কিন সংবাদ মাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের প্রকাশিত এই গবেষণার তথ্যে বলা হয়েছে, গবেষকরা এই কৃত্রিম কোষের নাম দিয়েছেন ‘স্পাড সেল’, যা দেখতে অনেকটা আলুর মতো।
গবেষণা দলের প্রধান ও সিনথেটিক বায়োলজিস্ট কেট অ্যাডামালা বলেন, ‘জীবন কোনো বাইনারি বিষয় নয় (যেটা হয় থাকবে, না হয় থাকবে না)। তাই এটাকে সরাসরি “জীবন্ত” বলতে আমি কিছুটা দ্বিধায় আছি।’
স্ট্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটির আরেক গবেষক ড্রিউ এনডি বলেন, ‘এই কোষটির জন্ম হয়নি, তৈরি করা হয়েছে। কিন্তু এটি কাজ করে একদম আসল কোষের মতোই।’
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই আবিষ্কারের কোনো পেটেন্ট বা স্বত্ব নিজের নামে না রেখে ড. অ্যাডামালা অন্য বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিয়ে একটি উন্মুক্ত কমিউনিটি তৈরি করছেন। সবাই মিলে এই কোষগুলোকে আরও নিখুঁতভাবে জীবন্ত করে তোলা এবং নতুন নতুন গবেষণায় ব্যবহার করারই তাদের উদ্দেশ্য।
এই উদ্যোগের জন্য তারা একটি অলাভজনক গবেষণা প্রতিষ্ঠানও গড়েছেন। আগামী ১০ বছর সেখানে কয়েকশ কোটি ডলার বিনিয়োগ হতে পারে এবং শত শত বিজ্ঞানী এতে যুক্ত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
কেন এই আবিষ্কার গুরুত্বপূর্ণ
মানুষের নিজস্ব ডিএনএতে হাজারো জিন থাকে এবং এই জটিলতার কারণে বিজ্ঞানীরা এখনো অনেক জিনের কাজ পুরোপুরি বুঝতে পারেননি।
বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, এই কৃত্রিম কোষ প্রাকৃতিক কোষের চেয়ে জীবন সম্পর্কে আরও মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে সাহায্য করবে। যেমন: একটি ন্যূনতম জীবনের জন্য কয়টি জিন দরকার? কিংবা জীবনের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজগুলো কী?
ভবিষ্যতে এসব কৃত্রিম কোষ দিয়ে এমন কাজও করানো যেতে পারে, যা প্রাকৃতিক কোষ পারে না। যেমন: নতুন ধরনের ওষুধ তৈরি কিংবা বাতাস থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেওয়ার মতো কাজ।
স্পাড সেল কী
স্পাড সেল হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব মিনেসোটার বিজ্ঞানীদের তৈরি কৃত্রিম বা সিনথেটিক কোষ। ল্যাবরেটরিতে প্রাণহীন কিছু রাসায়নিক উপাদান দিয়ে এটি তৈরি করা হলেও সাধারণ জীবন্ত কোষের মতোই কাজ করতে পারে।
এটি পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম কোষ নয়। তবে পরীক্ষাগারে রাসায়নিক উপাদান দিয়ে একদম শূন্য থেকে তৈরি প্রথম কৃত্রিম কোষ এটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এটি মূলত একটি জীবন্ত কোষের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা প্রাণের মৌলিক জিনগত ও গাঠনিক উপাদানগুলোকে আমাদের সামনে তুলে ধরে।
কীভাবে তৈরি করা হয়েছে স্পাড সেল
বিজ্ঞানীরা প্রথমে প্রায় ১০০ রকমের প্রোটিন এবং ছোট ছোট রাসায়নিক উপাদানের একটি মিশ্রণ তৈরি করেন। এরপর এর সঙ্গে একটি ভাইরাস ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া থেকে নেওয়া ৩৬টি প্রয়োজনীয় জিন যুক্ত করেন।
সবশেষে কোষের আবরণের উপাদান মেশালে সেগুলো নিজে থেকেই বুদবুদের মতো আকার ধারণ করে ভেতরের উপাদানগুলোকে ঢেকে ফেলে। এভাবেই তৈরি হয় স্পাড সেল।
স্পাড সেল কি জীবন্ত
স্পাড সেল জীবন্ত কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে প্রধান গবেষক ড. কেট অ্যাডামালা বলেন, ‘হ্যাঁ-ও বলা যায়, আবার না-ও বলা যায়।’
তার মতে, জীবন বা প্রাণের কোনো একক ও সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। তবে এই কোষটি অবিকল জীবন্ত কোষের মতোই আচরণ করছে।
এ নিয়ে এক বিবৃতিতে গবেষকরা লিখেছেন, ‘একটি জড় বস্তু ও জীবন্ত বস্তুর মধ্যে পার্থক্য করার জন্য যে বৈশিষ্ট্যগুলো দেখা হয়—যেমন: খাবার খাওয়া, বড় হওয়া, নিজের ডিএনএ’র হুবহু প্রতিলিপি তৈরি করা, বিভাজিত হওয়া ও পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া—তার সবই স্পাড সেল করতে পারে। অথচ এটি ল্যাবে হাত দিয়ে, এক একটি অংশ জোড়া দিয়ে বানানো হয়েছে।’
জীবনের যেসব বৈশিষ্ট্য রয়েছে স্পাড সেলে
খাবার গ্রহণ ও বৃদ্ধি: গবেষকরা জানান, এই কোষগুলোর চারপাশে খাবার (ছোট ছোট কণা ও প্রোটিন) দেওয়া হলে শুষে নেয়। খাবার খেয়ে কোষগুলো আকারে বড় হতে থাকে।
বংশবৃদ্ধি বা বিভাজন: বড় হওয়ার পর একটি বিশেষ প্রোটিনের সাহায্যে কোষগুলো মাঝখান থেকে সংকুচিত হয়ে দুটি আলাদা কোষে বিভক্ত হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, এই কোষগুলোর বিবর্তন হওয়ার প্রাথমিক ক্ষমতাও আছে। দুটি ভিন্ন স্পাড সেলের মধ্যে খাবারের প্রতিযোগিতা করিয়ে দেখা গেছে, যারা দ্রুত খাবার সংগ্রহ করতে পারে তারাই টিকে থাকছে।
সীমাবদ্ধতা
তবে স্পাড সেলের বেশকিছু ঘাটতি রয়েছে। প্রাকৃতিক কোষের মতো এটি সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী নয়। এটি নিজের প্রোটিন তৈরির কারখানা বা ‘রাইবোজোম’ নিজে বানাতে পারে না। তাই বিজ্ঞানীদের বাইরে থেকে একে প্রয়োজনীয় প্রোটিন ও এনজাইম খাওয়াতে হয়। আর এই কারণেই এর বংশধররা মাত্র ৫ থেকে ১০ প্রজন্ম পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। এরপর কোষগুলো আর কাজ করে না বা অকেজো হয়ে যায়।
এ ছাড়া, সাধারণ কোষের তুলনায় স্পাড সেলের জিনের আকারও অনেক ছোট। মানুষের যেখানে ৩০০ কোটি বেস পেয়ার ডিএনএ থাকে, সেখানে স্পাড সেলের আছে মাত্র ৯০ হাজার।
আবার এই জিনগত তথ্যগুলো একটা সুতোয় বাঁধা না থেকে সাতটি আলাদা ডিএনএ অণুতে বিভক্ত। এই খণ্ড-বিখণ্ডের কারণে সব গুরুত্বপূর্ণ জিনগত তথ্য সবসময় পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছায় না।
সম্ভাবনা
বিজ্ঞানীরা আশাবাদী, ভবিষ্যতে এই কোষগুলো নিজেদের রাইবোজোম নিজেরাই তৈরি করতে পারবে এবং অনির্দিষ্টকাল বেঁচে থাকবে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কৃত্রিম কোষ দিয়ে এমন সব ওষুধ তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যা সাধারণ কোনো জীবন্ত কোষ দিয়ে তৈরি করা যায় না।
এমনকি পরিবেশ থেকে ক্ষতিকারক কার্বন-ডাই-অক্সাইড শুষে নেওয়া বা রকেটের জ্বালানির মতো রাসায়নিক উপাদান তৈরিতেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে।
ঝুঁকি
গবেষকরা এই কোষের অপব্যবহার নিয়ে সতর্ক করেছেন। ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হলে এ প্রযুক্তি দিয়ে বিপজ্জনক উপাদান তৈরির আশঙ্কা উড়িয়ে দিচ্ছেন না গবেষকরা। তাই আগে থেকেই এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য কাজ শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা।
রাইট ভাইদের প্রথম উড়োজাহাজ তৈরির সঙ্গে এই আবিষ্কারের তুলনা করে বিজ্ঞানী ড্রিউ এনডি বলেন, ‘রাইট ভাইদের প্রথম উড়োজাহাজটি মাত্র ১২ সেকেন্ড উড়েছিল। তার মানে এই নয় যে সেটি একটি আধুনিক বোয়িং ৭৩৭ উড়োজাহাজ ছিল। তবে ওটাই ছিল শুরু। আমাদের এই আবিষ্কারও মাত্র শুরু।’