শান্তি আলোচনার মধ্যেই যেভাবে ইরানি নেতাদের হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েল
চলতি বছরের এপ্রিলে যখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন শান্তি চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল, ঠিক তখনই ইরানের শীর্ষ কূটনীতিক ও আলোচকদের হত্যার ছক কষেছিল ইসরায়েল—এমনটাই বলছেন মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের অনেকেই।
তাদের আশঙ্কা ছিল, ইসরায়েল যদি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কিংবা পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফকে হত্যার চেষ্টা করে, তবে এই শান্তি আলোচনা ভেস্তে যাবে এবং নতুন করে যুদ্ধ শুরু হবে।
চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্র এতটাই মরিয়া ছিল যে, তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোর মাধ্যমে ইরানকে এই সম্ভাব্য হামলা সম্পর্কে সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছিল।
আজ শুক্রবার সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে উঠে আসে কীভাবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যা বা হত্যাচেষ্টায় গোপনে ষড়যন্ত্র করে ইসরায়েল।
যাদের হত্যার পরিকল্পনা করেছিল ইসরায়েল
প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের শুরু থেকেই ইরানের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করা ইসরায়েলি কৌশলের অংশ ছিল।
এ বছর মার্চে ইসরায়েলের সম্ভাব্য ‘কিলিং লিস্টে’ আরাঘচি ও গালিবাফের নাম ছিল। পরে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান আলোচনা শুরু হলে সাময়িকভাবে ওই দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে হত্যা তালিকা থেকে বাদ দেয় ইসরায়েল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তা দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, ‘অন্তত গালিবাফকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল বলে জানতে পারে ওয়াশিংটন এবং ইসরায়েলকে এ ধরনের পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকতে বলে।’
পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন আরাঘচি ও গালিবাফ।
এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের পর মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যান এই দুই শীর্ষ ইরানি নেতা।
জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি কাঠামোগত সমঝোতায় পৌঁছায়, যার লক্ষ্য ছিল হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে পরবর্তী আলোচনার ভিত্তি তৈরি করা।
কিন্তু ইসরায়েল এই চুক্তিকে ‘বিপর্যয়’ হিসেবে দেখছে। তাদের মতে, ইরানের সরকার পরিবর্তন, আঞ্চলিক প্রক্সি বাহিনী ধ্বংস কিংবা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিকে দুর্বল করার মতো লক্ষ্য অর্জিত হয়নি।
চুক্তির ফলে ইরান অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হবে এবং নিজেদের আবার শক্তিশালী করার সুযোগ পাবে বলে মনে করেন ইসরায়েলি অনেক কর্মকর্তা ও বিশ্লেষক।
ইসরায়েলি হামলার আশঙ্কায় মাঝপথে নামেন গালিবাফ
নিউইয়র্ক টাইমস জানায়, এপ্রিলে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে একটি বৈঠকে যোগ দেওয়ার কথা ছিল ইরানের স্পিকার গালিবাফের।
তেহরান আশঙ্কা করেছিল, আলোচনা ব্যাহত করার জন্য ইসরায়েল এই সুযোগটি নিয়ে গালিবাফ বা আরাঘচিকে গুপ্তহত্যা করতে পারে।
এ কারণে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চায় ইরান।
সে সময় পাকিস্তানের যুদ্ধবিমানগুলো ইরানি প্রতিনিধিদলের বিমানটিকে নিজেদের আকাশসীমায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়।
কিন্তু সংকট তৈরি হয় ফেরার পথে।
ইরানি গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, দুটি ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান ইরাক সীমান্ত ঘেঁষে ইরানের আকাশসীমায় প্রবেশ করেছে এবং গালিবাফের বিমানে হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে জানতে পারেন গোয়েন্দারা।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে তেহরানে না গিয়ে পাকিস্তান সীমান্তের সবচেয়ে কাছের বিমানবন্দর মাশহাদে জরুরি অবতরণ করে ওই বিমানটি। ৭০ সদস্যের ইরানি প্রতিনিধিদল বিমান থেকে নেমে প্রায় ৮ ঘণ্টা সড়ক পথে তেহরানে পৌঁছায়।
নিরাপত্তা ঝুঁকির পরও ইরানি কূটনীতিকরা তাদের শান্তি আলোচনা থামাননি। মে মাসের শেষের দিকে তারা কাতারে এবং জুনে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে মার্কিন প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সরাসরি বৈঠক করেছেন।
গালিবাফের ওপর আরও যত হামলা
প্রতিবেদনে বলা হয়, স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের ওপর এর আগেও একাধিকবার হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
এরমধ্যে ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময় এবং এ বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা শুরুর পর গালিবাফকে টার্গেট করা হয়। এই দুইবারই পাহাড়ের নিচে একটি গোপন বাঙ্কারে আটকা পড়েন গালিবাফ এবং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে তাকে জীবিত উদ্ধার করা হয়।
ইসরায়েলি ষড়যন্ত্রের শিকার আরও যারা
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরানের কট্টরপন্থী সরকারকে উৎখাত করতে বদ্ধপরিকর ছিল ইসরায়েল।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ও অন্যান্য শীর্ষ নেতাদের ওপর ইসরায়েলি বিমান হামলার মাধ্যমে এই যুদ্ধের সূচনা হয়।
শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য একই থাকলেও, পরবর্তী সময়ে তা আলাদা হয়ে যায়। যুক্তরাষ্ট্র যেখানে দ্রুত একটি শান্তি চুক্তি বা যুদ্ধবিরতি চেয়েছিল, ইসরায়েলের অবস্থান শুরু থেকেই ছিল এর বিরুদ্ধে।
এরই ধারাবাহিকতায় ট্রাম্প প্রশাসন যাদের সঙ্গে আলোচনা চালাতে আগ্রহী ছিল, এমন মধ্যপন্থী ও তুলনামূলক উদার ইরানি নেতাদেরও লক্ষ্যবস্তু করে ইসরায়েল।
এরমধ্যে রয়েছেন ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা আলি লারিজানি এবং সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কামাল খারাজি। তারা দুজনেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় যুক্ত ছিলেন এবং পরে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন।