ইরান বলছে হরমুজ ‘বন্ধ’, যুক্তরাষ্ট্রের দাবি ‘খোলা’: পাল্টাপাল্টি হামলায় অস্থিতিশীল মধ্যপ্রাচ্য

স্টার অনলাইন ডেস্ক

গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি কেন্দ্র করে সংঘাতের জেরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান আবারও পাল্টাপাল্টি হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালি বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইরান। তবে যুক্তরাষ্ট্র জোর দিয়ে বলেছে, প্রণালিটি এখনো খোলা রয়েছে।

বার্তাসংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালি দুই বৈরী দেশের মধ্যে বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে গত মাসে একটি চুক্তি হলেও এই জলপথকে কেন্দ্র করে বারবার পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনা ঘটছে।

জলপথটিতে একটি বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের আরেকটি হামলার পর সর্বশেষ পাল্টাপাল্টি হামলার সূত্রপাত হয়। হামলার পর জাহাজটিতে আগুন ধরে গেলে এর নাবিকেরা সেটি ছেড়ে যেতে বাধ্য হন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। তবে তেহরান এখন জোর দিয়ে বলছে, তারা প্রণালিটির নিয়ন্ত্রণ নেবে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন অনড় অবস্থান নিয়ে বলছে, ইরান তা করতে পারবে না।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএর বরাতে দেশটির বিপ্লবী গার্ড বাহিনী রোববার বলেছে, ‘এই ঘটনার পর পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এবং এই অঞ্চলে মার্কিন হস্তক্ষেপের অবসান না হওয়া পর্যন্ত হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকবে।’

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) এক্সে বলেছে, ‘আন্তর্জাতিক এই জলপথ দিয়ে আইনসম্মতভাবে চলাচল করতে চাওয়া সব জাহাজের জন্য প্রণালিটি খোলা রয়েছে।’

সেন্টকম বলেছে, নৌ চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে মার্কিন বাহিনী ‘অবস্থান নিয়েছে এবং প্রস্তুত রয়েছে’।

তারা আরও বলেছে, ‘ইরান প্রণালিটি নিয়ন্ত্রণ করে না। জাহাজ চলাচল অব্যাহত রয়েছে।’

এই জলপথের নিয়ন্ত্রণ ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চাপ প্রয়োগের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। দেশটির সর্বোচ্চ নেতার একজন উপদেষ্টা রোববার বলেছেন, এটি ‘কয়েক ডজন পারমাণবিক বোমার’ চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

ইরান জুড়ে কঠোর আঘাত হানার কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: এএফপি

‘তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি’

আইআরএনএ জানিয়েছে, অনুমোদিত চলাচলপথ ব্যবহারের ‘নিয়ম লঙ্ঘন’ করেছে বলে ইরান হরমুজ প্রণালিতে দুটি জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।

এসব হামলার জবাবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানজুড়ে ব্যাপক হামলা চালায়। মার্কিন সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহে তাদের তৃতীয় দফার হামলায় প্রায় ১৪০টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।

ইরানের গণমাধ্যম জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস, সিরিক, জাস্ক ও কেশম দ্বীপের পাশাপাশি খুজেস্তান প্রদেশেও বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। দক্ষিণাঞ্চলীয় জাস্ক শহরে এক সেনাসদস্য নিহত হয়েছেন বলে জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনএনকে বলেছেন, ‘গত রাতে আমরা তাদের ওপর কঠোর আঘাত হেনেছি।’

তিনি আরও বলেন, শনিবার দুই পক্ষ একটি চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছানো সত্ত্বেও ইরান ওই হামলা চালিয়েছে।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা সবকিছু ছেড়ে দিতে রাজি হচ্ছিল। এরপর হঠাৎ, এর দুই ঘণ্টা পর তারা একটি ড্রোন দিয়ে একটি জাহাজে হামলা চালায়।’

মার্কিন হামলার জবাবও দিয়েছে ইরান।

এএফপি জানিয়েছে, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনে সতর্কসংকেত এবং বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

এক ব্যক্তি একটি বড় পর্দার সামনে দাঁড়িয়ে জাহাজ-ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটে হরমুজ প্রণালিতে নৌযানের গতিবিধি দেখছেন। ছবি: এএফপি

কাতার জানিয়েছে, ইরানের হামলায় তিনজন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত আগত ক্ষেপণাস্ত্রের বিষয়ে সতর্কতা জারি করলেও পরে জানায়, সেগুলো তাদের ভূখণ্ডে প্রবেশ করেনি।

কুয়েতও জানিয়েছে, তারা একটি হামলা প্রতিহত করার চেষ্টা করছে। আর জর্ডান জানিয়েছে, ইরানের তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র তাদের ভূখণ্ডে পড়েছে।

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, তারা ওমানেও হামলা চালিয়েছে। দেশটি খুব কমই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

বাহিনীটি দাবি করেছে, তারা ‘দুকম বন্দরে নৌযানগুলোর রসদসহায়তা কেন্দ্র এবং মার্কিন বিমানবাহী রণতরীগুলোর জ্বালানি সরবরাহ স্থাপনা’ ধ্বংস করেছে।

এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাস্কটে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতকে তলব করে আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানিয়েছে ওমান। সালতানাতটির জন্য এটি একটি বিরল পদক্ষেপ। দেশটি ওয়াশিংটন ও তেহরানের পরস্পরবিরোধী দাবির মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনার জন্য ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে আতিথ্য দেওয়ার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরই ওমানে এই হামলা হয়।

কাতারের আকাশে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের বিরুদ্ধে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ইন্টারসেপশন দেখা যাচ্ছে। দোহা, ১২ জুলাই, ২০২৬ । ছবি: এএফপি

‘প্রকাশ্য’ হামলা

রোববার জলপথটিতে সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি কনটেইনার জাহাজে হামলার পর একজন ভারতীয় নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।

অন্যদিকে মাস্কাট জানিয়েছে, একটি বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে ২৩ জন নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে।

ইরান জানিয়েছে, তারা ‘সতর্কতামূলক গুলি’ ছুড়েছিল। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী তেহরানের বিরুদ্ধে জাহাজটিতে ‘প্রকাশ্যে’ হামলা চালানোর অভিযোগ করেছে।

ব্রিটিশ সামুদ্রিক সংস্থা ইউকেএমটিও জানিয়েছে, ওমানের প্রায় ১৭ কিলোমিটার (১০ মাইল) পূর্বে নাবিকেরা জাহাজটি ছেড়ে একটি লাইফবোটে অবস্থান করছিলেন।

এএফপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, চলতি সপ্তাহের শুরুতে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজগুলোর ওপর ইরানের পৃথক হামলার জেরে সংঘর্ষ শুরু হয়েছিল। এর পাশাপাশি দুই পক্ষের মধ্যে উত্তপ্ত বাগ্‌যুদ্ধও চলেছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি যুদ্ধের প্রথম দিন তার বাবা ও পূর্বসূরিকে হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

পোস্টারে প্রয়াত ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এবং তার ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি। ছবি: রয়টার্স

তিনি বলেছেন, হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হবে, এমন ব্যক্তিদের একটি তালিকা তৈরি করেছে ইরান।

ট্রাম্প শনিবার বলেছেন, তাকে হত্যার যেকোনো চেষ্টা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ করে দেবে।

তিনি যুদ্ধবিরতির সমাপ্তি ঘোষণা করেছেন, তবে আলোচনার পথ খোলা রেখেছেন। মধ্যস্থতাকারীরা একটি কূটনৈতিক সমাধান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।

মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করা পাকিস্তানের শীর্ষ কূটনীতিক রোববার ইরানি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে ফোনালাপে ‘উত্তেজনা প্রশমনের’ আহ্বান জানিয়েছেন বলে ইসলামাবাদ জানিয়েছে।

পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বলেছেন, ‘বিরোধ নিষ্পত্তি এবং স্থায়ী শান্তি অর্জনের একমাত্র কার্যকর পথ হলো সংলাপ ও কূটনীতি।’