কোকা-কোলার আগেই কি একই ধরনের পানীয় বানিয়েছিলেন ফ্লোরেন্সের সন্ন্যাসীরা?
ইতালির ফ্লোরেন্সের প্রাচীন এক আশ্রমের ওষুধালয়ের নথিপত্র ঘাঁটতে গিয়ে উনিশ শতকের বলে ধারণা করা একটি নথি পাওয়া গেছে। সেখানে বলিভিয়ার কোকা পাতা, কোলা বাদাম ও ওয়াইন দিয়ে তৈরি এক ধরনের ঔষধি পানীয়ের রেসিপি রয়েছে।
এই আবিষ্কারের পর প্রশ্ন উঠেছে, ফ্লোরেন্সের সন্ন্যাসীদের তৈরি এই পানীয় কি বিখ্যাত মার্কিন কোমল পানীয় কোকা-কোলার পূর্বসূরি ছিল? দ্য গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
ফ্লোরেন্সের সান মার্কো আশ্রমের রেক্টর ফাদার ম্যানুয়েল রুশো জানান, আশ্রমের পুরোনো নথিপত্র গোছানোর সময় হলদেটে হয়ে যাওয়া কাগজটি তার নজরে পড়ে। এটি ছিল অনেকটা প্রচারপত্রের মতো।
সেখানে ‘এলিক্সির ভিনোসো রিকোস্তিতুয়েন্তে’ বা শরীর চাঙা করার ওয়াইনভিত্তিক এক পানীয়ের রেসিপি দেওয়া আছে। ১০ গ্রাম বলিভিয়ান কোকা পাতা ও ৩০ গ্রাম কোলা বাদামের সঙ্গে ওয়াইন মিশিয়ে এটি তৈরি করা হতো।
সন্ন্যাসীরা এই পানীয়কে এমন এক ধরনের টনিক হিসেবে প্রচার করতেন, যা অসুস্থতা ও বার্ধক্যজনিত ক্লান্তি কাটিয়ে শরীর ও মনকে চাঙা করতে সহায়তা করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নথিটিতে কোনো তারিখ নেই। তবে ধারণা করা হচ্ছে, এটি উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ের। তখন ধর্মপ্রচারকদের মাধ্যমে বলিভিয়া থেকে ইতালিতে আনা কোকা পাতার ভালো ব্যবসা করতেন সন্ন্যাসীরা।
কোকা পাতায় কোকেন তৈরিতে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক অ্যালকালয়েড থাকে। এ কারণে ১৯৬১ সালে বিশ্বজুড়ে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হওয়ার বহু আগের ঘটনা এটি।
সন্ন্যাসীদের পানীয়টির রেসিপির সঙ্গে মার্কিন ফার্মাসিস্ট জন পেম্বারটনের তৈরি পানীয়ের কিছু মিল রয়েছে। ১৮৮৬ সালে কোকা পাতার নির্যাস ও কোলা বাদাম মিশিয়ে একটি মিষ্টি সিরাপ তৈরি করেন পেম্বারটন। স্থানীয় মদসংক্রান্ত আইনের কারণে এতে ওয়াইন ব্যবহার করতে পারেননি তিনি। এর পরিবর্তে উপাদানগুলো কার্বনেটেড পানির সঙ্গে মেশান। পেম্বারটনের সেই টনিকই পরে কোকা-কোলায় পরিণত হয়।
ফাদার রুশোর আবিষ্কারের খবর প্রকাশের পর ইতালির কয়েকটি স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রশ্ন তোলা হয়—কোকা-কোলার শিকড় কি তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের বদলে ফ্লোরেন্সে?
দ্য গার্ডিয়ান আরও বলছে, তবে সন্ন্যাসীদের তৈরি পানীয়ের সঙ্গে কোকা-কোলার রেসিপির কোনো যোগসূত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এ নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন রুশো। নথির পাশাপাশি ওই পানীয় রাখা হতো—এমন দুটি খালি বোতলও পেয়েছেন তিনি।
রসিকতা করে রুশো বলেন, ‘আমি কোকা-কোলার পক্ষ থেকে কোনো মামলা হোক বা এ রকম কিছু ডেকে আনতে চাই না।’
তিনি বলেন, ‘মিস্টার পেম্বারটন তার নিজস্ব রেসিপি উদ্ভাবন করেছিলেন, আর সেটি ছিল অ্যালকোহল ছাড়া। তাছাড়া, সেই সময়ে আরও অনেকেই কোকা পাতা দিয়ে এ ধরনের ওষুধ তৈরি করতেন। ইতালি ও ফ্রান্সে এটি বেশ প্রচলিত ছিল। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি, সান মার্কোর ওষুধালয়ের নিজস্ব একটি রেসিপি ছিল।’
কোকা-কোলার সম্ভাব্য অনুপ্রেরণা হিসেবে এর আগেও অন্য একটি পানীয়ের কথা উঠে এসেছে। ১৮৮৫ সালে স্পেনের ভ্যালেন্সিয়ার মদ প্রস্তুতকারকেরা ‘কোলা কোকা’ নামে অ্যালকোহলযুক্ত একটি সিরাপ তৈরি করেছিলেন।
রুশোর খুঁজে পাওয়া অন্যান্য নথি থেকে জানা যায়, ফ্লোরেন্সের সন্ন্যাসীদের তৈরি পানীয়টি ক্রেতাদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। এর দাম ছিল ২ থেকে ৬ ইতালীয় লিরা, যা বর্তমান ইউরোর হিসাবে এক সেন্টেরও কম।
ফাদার রুশো বলেন, ‘এটি খুব জনপ্রিয় ছিল, কারণ ক্লান্তি, বিশেষ করে বয়স বাড়ার সঙ্গে আসা ক্লান্তি মোকাবিলায় এর অসাধারণ গুণ আছে বলে মনে করা হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘বলিভিয়ান কোকা পাতা নিষিদ্ধ হওয়ার আগপর্যন্ত—যখন বোঝা গেল কোকেন নিরাময়ের চেয়ে বেশি সমস্যা তৈরি করে—আমি বলব, এটি আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া পণ্যগুলোর একটি ছিল।’
ফ্লোরেন্সের ভিয়া কাভুরে ১৪৩৬ সালে সান মার্কো আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হয়। আশপাশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সেবা দিতে ১৪৬০ সালে সেখানে ওষুধালয় চালু করা হয়।
রুশোর ভাষায়, এই ওষুধালয় ‘আমাদের আশ্রমে থাকা সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলোর একটি’। এটি এখনো চালু রয়েছে, যদিও ১৯৯৫ সালে একে ফ্লোরেন্সের অন্য একটি স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তবে পুরোনো ওষুধালয়ের মূল জায়গাটি এখনো অক্ষত রয়েছে। সেখানে নীল নদ থেকে আনা একটি কুমিরের দেহাবশেষও রয়েছে, যা ১৬০০-এর দশক থেকে ছাদে ঝুলছে।
উনিশ শতকের ইউরোপে ওষুধের দোকানে কুমির ও অন্যান্য সরীসৃপ ছাদ থেকে ঝুলিয়ে রাখা অস্বাভাবিক ছিল না। বিরল ও দূরদেশীয় উপাদান সংগ্রহের সুযোগ রয়েছে—ক্রেতাদের কাছে এমন ধারণা তুলে ধরতেই ওষুধ প্রস্তুতকারকেরা এগুলো প্রদর্শন করতেন।
ওষুধালয়ের পুরোনো সংগ্রহ ঘাঁটতে গিয়ে বিশুদ্ধ অক্সিজেন, কনিয়াক ও পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম স্পিরিটের লেবেলও পেয়েছেন রুশো।
তিনি বলেন, ‘ওষুধালয়ের আর্কাইভে থাকা সংগ্রহ-সামগ্রী অবিশ্বাস্য।’