কফির কাপের ঢাকনায় ছোট আরেকটি ছিদ্র থাকে কেন
বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা, কিংবা ব্যস্ত সকালে অনেকের সঙ্গী হয় এক কাপ কফি। এই কফির কাপের ঢাকনাতে একটি ছোট ছিদ্র প্রায়ই চোখে পড়ে। দেখতে সাধারণ হলেও এই ছোট জিনিসটার কাজ কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। অবশ্য অনেকে ভাবে, এটা কেবল ডিজাইন বা কফির গন্ধ বের হওয়ার জন্য। আবার কারো ধারণা, এই ছিদ্র কফি গরম রাখে। কিন্তু আসল কারণটা ভিন্ন।
এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন লন্ডনের ডিএসটি-প্যাক কোম্পানির সিইও ও প্যাকেজিং বিশেষজ্ঞ স্ট্যানিস্লাভ ক্রাইকুন। তার ভাষ্য, এই ছোট ছিদ্রটি কপির গন্ধ বের হওয়ার জন্য বা ঢাকনাকে সুন্দর দেখানোর জন্য নয়। এটি আসলে কাপের চাপ সমন্বয় করতে তৈরি।
ক্রাইকুন বলেন, এই ছিদ্রটি কাপের ভেতরে বাতাস ঢুকতে দেয়। যখন ঢাকনা পুরোপুরি বন্ধ থাকে, তখন কফি সহজে বের হতে পারে না। ফলে ফ্লো বা গতি থেমে থেমে যায়, এ কারণে অনেক সময় কফি ছিটকে পড়তে পারে।
এর পেছনের পদার্থবিজ্ঞানটা হলো—যখন সিপ হোল দিয়ে কফি পান করা হয়, তখন কাপ থেকে তরল ও গরম কফি বের হয়। কিন্তু সেই জায়গায় বাতাস ঢুকতে না পারলে ভেতরে চাপ তৈরি হবে এবং ফ্লো বাধাগ্রস্ত হবে। আর এভাবে হঠাৎ চাপ পরিবর্তনের ফলে একসঙ্গে বেশি কফি বের হয়ে যায়।
ক্রাইকুন ব্যাখ্যা করেন, যখন কফি বের হয়, তখন বাতাস ঢুকতে হয়। না ঢুকলে চাপ তৈরি হবে এবং কফি বের হবে না। পরে হঠাৎ চাপ বদলালে অনেক বেশি কফি একসঙ্গে বের হয়ে যাবে। কিন্তু এই ছোট ছিদ্রটি কফি বের হওয়াকে আটকায়। কারণ এটি সঙ্গে সঙ্গে বাতাস ঢুকতে দেয়, ফলে স্বাভাবিকভাবে কফি পান করা যায় এবং নিয়ন্ত্রণে থাকে।
ডিজাইনাররা এই ভেন্ট হোল এমনভাবে বসান যেন, বাতাস ও তরল একে অপরের পথে বাধা সৃষ্টি না করে। তিনি বলেন, ছিদ্রটি এমন জায়গায় রাখা হয় যেন পান করার সময় বাধা সৃষ্টি না করে। সাধারণত এটি সিপ ওপেনিং থেকে আলাদা থাকে, ফলে বাতাস ও তরল আলাদা পথে চলতে পারে। এই ছিদ্র বসানোর আগে ডিজাইনাররা বিভিন্ন অবস্থান পরীক্ষা করেছিলেন।
এই ছিদ্রটিকে ছোট এয়ার ভালভ বলা যেতে পারে। কারণ এটি চাপ সমান রাখে। এটি না থাকলে ঢাকনা দিয়ে কফি পান করা ঝামেলা ও বিরক্তিকর হয়ে যেত। বিশেষ করে যখন হাঁটতে হাঁটতে পান করা হতো।
এটাই কি একমাত্র কাজ?
না। মূল কাজ চাপ সমান রাখা হলেও এই ছোট ছিদ্রটির আরও কিছু উপকার আছে। যেমন—এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে। মানে বাতাস ও বাষ্প বের হতে দেয়, তাই প্রথম চুমুকে গরমের তাপ কিছুটা কম অনুভূত হয়। এর কারণে ঢাকনার নিচে তরল কম জমে।
ক্রাইকুন বলেন, অনেক ছোট বিষয় মানুষ খেয়ালই করে না। সিপ ওপেনিংয়ের আকার কফি কত দ্রুত বের হবে তা নিয়ন্ত্রণ করে।
কাপের ঢাকনায় আরও যেসব অংশ থাকে
সিপ হোল
এটাই প্রধান পান করার জায়গা, এবং এর আকার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিছু ঢাকনায় নির্দিষ্ট ছিদ্র থাকে, যেখানে সরাসরি চুমুক দেওয়া যায়। কিছুতে ফ্লিপ ব্যাক ফ্ল্যাপ থাকে, যা তাপ ধরে রাখে এবং কফি পড়া বন্ধ করে। কিছু পরিবেশবান্ধব ডিজাইনে উঁচু লিপ থাকে, এতে পুরো সিল না ভেঙেও পান করা যায়।
রিসেসড ড্রেনেজ চ্যানেল
অনেক ঢাকনায় সিপ হোলের পাশে ছোট খাঁজ থাকে। এটা কেবল ডিজাইন নয়, একটি ড্রেন। কফি ছিটকে গেলে আবার কাপের ভেতরে ফিরিয়ে দেয়, ফলে হাতে বা পোশাকে পড়ে না।
সেকেন্ডারি বাম্প ও চিহ্ন
আগে কিছু ঢাকনায় উঁচু চিহ্ন থাকত যা ড্রিঙ্কের ধরন (ডিক্যাফ, দুধ, ফ্লেভার) বোঝাত। এখন অনেক জায়গায় স্টিকার ব্যবহার করা হয়। তবে কিছু পুরনো ডিজাইনে এগুলো এখনো দেখা যায়।
সময়ের সঙ্গে কফির ঢাকনা বদলেছে
আগে কফির ঢাকনা আজকের মতো উন্নত ছিল না। ২০শ শতকের শুরুতে এগুলো ছিল খুব সাধারণ, যেগুলো অনেক সময় লিক করত এবং কফি ছিটকে পড়ত। পরে ১৯৭০ এর দিকে যখন ‘টু-গো’ বা বাইরে গিয়ে কফি খাওয়ার অভ্যাস জনপ্রিয় হতে থাকে, তখন মানুষ নিজেরাই ঢাকনায় ছিদ্র করা বা কেটে নেওয়া শুরু করে, যেন হাঁটতে হাঁটতে পান করতে সুবিধা হয়। এই অভ্যাস দেখেই ডিজাইনাররা আরও উন্নত ও নিরাপদ ঢাকনা বানানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
এরপর ১৯৮০ এর মাঝামাঝি সময়ে নতুন ধরনের ঢাকনা আসে, যেমন সলো ট্রাভেলার লিড, যেখানে কফি খাওয়ার জন্য আলাদা মুখ এবং শক্তভাবে আটকে থাকার মতো ডিজাইন ব্যবহার করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল কফি যেন কম ছিটকে পড়ে এবং গরম থাকে। তখন কিছু ডিজাইনে বাতাস চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা ও গম্বুজের মতো আকারও ব্যবহার করা হতো।
বর্তমানে কফির ঢাকনার ডিজাইন আরও উন্নত হয়েছে। এখন প্লাস্টিক কম ব্যবহার করার দিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ঢাকনার কাজ যেন ঠিক থাকে সেটাও দেখা হচ্ছে। তাই এখন অনেক ঢাকনা কম্পোস্টেবল বা পরিবেশবান্ধব উপাদান দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, কফির কাপের ঢাকনায় যে ছোট ছিদ্র দেখি সেটা সাধারণ কোনো অংশ নয়। বরং এটা অনেক বছরের পরিবর্তন ও উন্নতির মাধ্যমে এসেছে। এর মাধ্যমে কফি পান সহজ, নিরাপদ ও আরামদায়ক হয়েছে।