ছোট সন্তানকে সময় দিতে গিয়ে বড়জনকে অবহেলা করছেন না তো?
কিছুদিন আগেই দ্বিতীয়বারের মতো মা-বাবা হয়েছেন সায়রা-ফারুক দম্পতি। ছোট্ট পুতুলের মতো বোন পেয়ে খুশি বড় মেয়ে সানিয়া। নিজের নামের সঙ্গে মিলিয়ে বোনের নাম রানিয়াও রেখেছে সে।
কিন্তু রানিয়ার জন্মের তিন মাস না পেরোতেই সায়রা টের পান কিছু একটা ঠিক নেই। তার শান্তশিষ্ট ৯ বছরের মেয়ে সানিয়া রীতিমতো বদলে গেছে। কথায় কথায় রেগে উঠছে, চিৎকার করে কাঁদছে, বোনকে ছুঁয়েও দেখছে না আর অসম্ভব জেদ করছে। যার সবগুলোই তার চরিত্রের সঙ্গে বেমানান।
নিজেদের মধ্যে আলোচনার পর সায়রা-ফারুক বুঝতে পারেন, নতুন শিশুটির প্রতি পরিবারের অন্যদের অতিরিক্ত মনোযোগই সানিয়াকে বদলে দিয়েছে। সমস্যার সূত্রপাতটি ধরতে পেরে সানিয়ার প্রতিও মনোযোগ বাড়িয়ে দেন তারা। আগের মতো না হলেও সানিয়ার সঙ্গে সময় কাটাতে শুরু করেন, তার কথা শোনার সময় বের করেন। এরপর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে শুরু করে সানিয়া, বোনকেও ভালোবাসতে শুরু করে।
মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, রানিয়ার সঙ্গে সানিয়ার এই সম্পর্কের দ্বন্দ্বের নাম সিবলিং রাইভালরি।
এটি মূলত ভাই-বোনদের মধ্যে চলমান এক ধরনের প্রতিযোগিতা, ঈর্ষা বা দ্বন্দ্ব; যার সূত্রপাত হয় মা-বাবার মনোযোগ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থেকে। এটিকে শিশুর সামাজিক দক্ষতা বিকাশের স্বাভাবিক উপায় হিসেবে দেখা হলেও এটি যদি নির্যাতনের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তাহলে সেটি সমস্যাজনক হতে পারে।
সানিয়ার ক্ষেত্রে তাই হয়েছিল। তবে বাংলাদেশের সব শিশু সানিয়ার মতো সংবেদনশীল পরিবার পায় না। ফলে এরকম সময়ে উল্টো তাদের মারধর করেন বাবা-মায়েরা। কিংবা জোর করে চাপিয়ে দেওয়া হয় পারিবারিক নানা সিদ্ধান্ত। এতে শিশুটির মানসিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তার ভেতরে ক্রোধ জমতে থাকে, সে নিজের ক্ষতি করার মতো পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও ভাবতে থাকে।
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মেখলা সরকার বলেন, যখন একটি পরিবারে নতুন শিশু আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই সবার মনোযোগ সে কেড়ে নেয়। আত্মীয়স্বজনরাও তাকেই দেখতে আসে, তার জন্য উপহার আনে। মায়ের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় নতুন শিশুটি।
অথচ এতদিন পর্যন্ত ওই পরিবার আবর্তিত হতো প্রথম সন্তানটিকে ঘিরে। তার চাওয়া-পাওয়ার দিকে নজর দিতের বাবা-মায়েরা, মেহমান বেড়াতে এলে তাকেই আদর করত।
হঠাৎ করে সেই সন্তানটি আবিষ্কার করে যে, কিছুই আর আগের মতো নেই। এমনকি মাকেও সে কাছে পাচ্ছে না। মা ব্যস্ত নতুন শিশুর পরিচর্যায়।
ওদিকে মা ভাবছেন, বড়টি তো নিজের কাজ নিজেই সব করতে পারে। ফলে তার দিকে আর নজর না দিলেও চলে।
এই ভাবনাটিই সবচেয়ে বড় ভুল বলে মনে করেন মেখলা সরকার। তিনি বলেন, সন্তান যখন প্রয়োজনের সময় বাবা-মাকে পায় না সে তখন ভেঙে পড়ে। সে যখন দেখতে পায় যে নতুন শিশুটি আসায় তার গুরুত্ব কমেছে, তখন সে ওই শিশুটিকেই শত্রু মনে করে। যেটিকে আমরা বলি সিবলিংস রাইভালরি। অনেক সময় বড় ভাই-বোনরা ছোট ভাই-বোনদের আঘাতও করে বসে।
অনেক সময় দেখা যায়, বড় সন্তানটি অতিরিক্ত জেদ করতে শুরু করে। লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে পড়ে, কথায় কথায় রেগে যেতে শুরু করে।
এই মনোচিকিৎসকের মতে, এসবই সে করে বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে। এক্ষেত্রে মূল ভূমিকা রাখতে হবে বাবা-মাকে। তারা যখন নতুন শিশুর আগমনের খবর জানবেন তখন সেটি সুন্দরভাবে বড় সন্তানের সামনে উপস্থাপন করবেন। পুরো সময়জুড়ে বড় সন্তানকে বোঝাতে হবে যে, তোমার জন্য একটা খেলনা আসবে। সে তোমার বন্ধু হবে, তোমরা একসঙ্গে বড় হবে, দুজনে মিলে খেলবে।
নতুন শিশু জন্মের পরও বড় সন্তানকে ভুলে গেলে চলবে না। হয়তো আগের মতো সময় দেওয়া সম্ভব হবে না, কিন্তু এরপরেও বাবা-মা মিলেমিশে সময় দিতে হবে। হয়তো আগে মা বেশি সময় দিতেন, এখন বাবা দেবেন। ছোট শিশুটি ঘুমালে মা অন্তত আধঘণ্টা হলেও বড় শিশুটির সঙ্গে গল্প করবেন, তার কথা শুনবেন। কোনোভাবেই যেন বড় শিশুটি নিজেকে অবাঞ্ছিত বা অপ্রয়োজনীয় মনে না করে।
মোটকথা এমন কোনো কথা বলা যাবে না বা আচরণ করা যাবে না যা সন্তানদের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি করে। এমনকি বাড়িতে বেড়াতে আসা আত্মীয়-স্বজন বা প্রতিবেশীদের আচরণও যেন দুই সন্তানের মধ্যে বিভেদ তৈরি করে না দেয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
তা না হলে, এই অবহেলা শিশুর মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করতে পারে বলে মনে করেন ডা. মেখলা সরকার। তিনি বলেন, ‘ছোটবেলার এই মনোকষ্ট তার জীবনে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলতে পারে। সে আত্মবিশ্বাসহীন হয়ে বড় হতে পারে। যা তার ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।’
আর এই সংকট মোকাবিলায় পরিবারকেই অগ্রণী ভূমিকা রাখার পরামর্শ দিলেন তিনি। যেন ভাই-বোনরা একে অন্যের প্রতিদ্বন্দ্বী না হয়ে সহযোগী বা বন্ধু হয়ে বেড়ে উঠতে পারে, যেন তাদের শৈশব হয় আনন্দময়।



