কোরবানির আগে যেসব প্রস্তুতি জরুরি
‘দা, বটি ধার...দা, বটি ধার!’—কোরবানির ঈদের আগে পাড়া-মহল্লা, অলিগলিজুড়ে এই ডাক যেন বারবার শোনা যায়। কিছু মানুষ যেন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—‘আর কদিন পরেই কোরবানির ঈদ, তাই প্রস্তুতি শুরু করে দিন’। দা-বটিতে শান দিয়ে তারা যেন আপনার কাজও কিছুটা এগিয়ে দেয়।
কোরবানির ঈদে পশু কেনার পাশাপাশি প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ থাকে। একটু পরিকল্পনা করে সবকিছু গুছিয়ে নিলে ঈদের প্রস্তুতি অনেকটাই সহজ হয়ে যায়।
আপনার কোরবানির প্রস্তুতি হয়তো ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আর ধর্মীয় নিয়ম-কানুন সম্পর্কেও আপনার জানা আছে। এবার প্রয়োজন সঠিক যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্রের। তাই চলুন, ঈদ-পূর্ব প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।
জবাইয়ের ছুরি
কোরবানি দেওয়ার ক্ষেত্রে একটি উপযুক্ত ছুরি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ধারালো ছুরি ব্যবহার করলে জবাই দ্রুত, নিরাপদ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা যায়। কখনোই ভোঁতা ছুরি দিয়ে জবাই করা উচিত নয়।
এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন।
জবাইয়ের ছুরিটি সাধারণত ৬ থেকে ৮ ইঞ্চি লম্বা হওয়া ভালো।
ছুরিতে এমনভাবে ধার দিতে হবে, যাতে সহজে ও দ্রুত জবাই সম্পন্ন করা যায়।
ছুরির হাতল বা ধরার অংশটি আরামদায়ক হওয়া উচিত।
অন্যান্য ছুরি
জবাইয়ের পরের বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন করার জন্য আরও কয়েক ধরনের ছুরির প্রয়োজন হয়। যেমন:
বাঁকানো ছুরি: এই ধরনের ছুরি দিয়ে সহজে চামড়া ছাড়ানো যায়।
পাতলা ছুরি: পাতলা ছুরি ব্যবহার করলে হাড় থেকে মাংস আলাদা করা সহজ হয়।
ভারি ছুরি: এই ছুরি দিয়ে হাড়ের জয়েন্ট বা মাংসের বড় টুকরো কাটা হয়।
চাপাতি: এই ধরনের ছুরি দিয়ে হাড় টুকরো করা হয়। এক্ষেত্রে সাধারণত ভারী চাপাতি ব্যবহার করা হয়।
দড়ি
কোরবানির পশুকে সঠিকভাবে বেঁধে জবাইয়ের জন্য প্রস্তুত করলে পশু যেমন অনেকটা শান্ত থাকে, তেমনি অন্যদের আহত হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়। এজন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে নরম ও মোটা দড়ি প্রস্তুত রাখা উচিত।
কাটিং ব্লক ও হুক
কাঠের বড় ব্লক, যার ওপর মাংস রেখে কাটা হয় এবং চামড়া ছাড়ানোর জন্য কোরবানির পশুকে ঝুলিয়ে রাখার হুক, এসব আগেই প্রস্তুত করে রাখা উচিত।
বালতি, গামলা ও মোটা বড় পলিথিন
জবাই সম্পন্ন হওয়ার পর পশুর রক্ত সঠিকভাবে পরিষ্কার করা অত্যন্ত জরুরি। এক্ষেত্রে বালতিতে রক্ত সংগ্রহ করে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলে দিতে হবে এবং স্থানটি পর্যাপ্ত পানি দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে।
এরপর পশুর খাওয়ার উপযোগী অংশগুলো, যেমন: কলিজা, হার্ট, কিডনি ও ফুসফুস—একটি গামলায় রাখতে হবে এবং খাওয়ার অনুপযোগী অংশগুলো আলাদা গামলায় রাখতে হবে।
পশুর বর্জ্য এবং ভুঁড়ির যেসব অংশ খাওয়ার উপযোগী নয়, সেগুলো মোটা পলিথিনে করে ময়লার নির্ধারিত স্থানে ফেলে দিতে হবে।
পর্যাপ্ত পানি ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার সরঞ্জাম
পশু জবাইয়ের পর প্রচুর পানির প্রয়োজন হয়। পশুর রক্ত পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে হাত ধোয়া পর্যন্ত পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা রাখতে হোস পাইপ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ছুরি, দা, বটি ইত্যাদি পরিষ্কার করার জন্য ব্রাশ ও তারজালের মাজুনি আগে থেকেই কিনে রাখা উচিত।
মাপার যন্ত্রপাতি
মাংস বণ্টনের জন্য পরিমাপ করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল স্কেল ব্যবহার করা যেতে পারে। অনেকেই প্রচলিত দাঁড়িপাল্লাও ব্যবহার করে থাকেন। বাসায় এগুলো থাকলে আগে থেকেই ভালোভাবে পরীক্ষা করে নেওয়া উচিত; সঠিকভাবে কাজ করছে কি না। আর না থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী নতুনটি কিনে নেওয়া যেতে পারে।
একটি নোটবুক ও কলম সঙ্গে রাখলে হিসাব রাখা সহজ হয় এবং কোন ভাগের মাংস কাকে দেওয়া হবে তা লেবেলিং করাও সহজ হয়।
পলিথিন
মাংস বিতরণ ও ফ্রিজে সংরক্ষণের জন্য ছোট-বড় বিভিন্ন সাইজের পলিথিন আগে থেকেই কিনে রাখা উচিত।
ফ্রিজার পরিষ্কার করা
ঈদের মাংস সংরক্ষণের জন্য ঈদের আগেই ফ্রিজার পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রথমে ফ্রিজার আনপ্লাগ করে ভেতরের সবকিছু বের করে নিতে হবে এবং জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করতে হবে। এরপর বেকিং সোডা ও কুসুম গরম পানি দিয়ে ভেতরের অংশ ভালোভাবে পরিষ্কার করতে হবে।
পরিষ্কার করার পর শুকনো কাপড় দিয়ে ভালোভাবে মুছে নিতে হবে এবং সম্পূর্ণ শুকানো পর্যন্ত ফ্রিজারের দরজা খোলা রাখতে হবে। প্রায় ৫–৬ ঘণ্টা পর পুনরায় প্লাগ ইন করতে হবে।
ফ্রিজারে কোরবানির মাংস রাখার জন্য আগেই কিছুটা জায়গা খালি করে রাখা উচিত, যাতে ঈদের দিন সহজেই মাংস সংরক্ষণ করা যায়।
কোরবানি ঈদের দিন আনন্দের পাশাপাশি সারাদিনই প্রচণ্ড ব্যস্ততা এবং এক ধরনের চাপা টেনশনের মধ্য দিয়ে কেটে যায়। তাই কিছু কাজ আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে ঈদের দিনটা অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। দেরি না করে এই স্মার্ট চেকলিস্টে একবার চোখ বুলিয়ে আজ থেকেই আপনার ঈদ-পূর্ব প্রস্তুতি শুরু করে দিন।