৪২০ কী, কোন কোন ক্ষেত্রে ৪২০ ধারায় মামলা হয়?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

আমরা প্রায়ই কথায় কথায় বলি ‘তুই একটা ফোর টুয়েন্টি (৪২০)’। অনেকেই ছলচাতুরি বা অসাধুতার দরুন এটিকে গালি হিসেবেও ব্যবহার করে থাকে। এটার অর্থ আমরা জানি বা না জানি, আমরা মনে করি এটা একটা গালমন্দ বা খারাপ বিষয় সম্পর্কে ইঙ্গিত বহন করে।

কেউ প্রতারণা করলে কিংবা কেউ কোনো দুই নম্বরি করলেও বলা হয় ‘৪২০’। মোট কথা আমাদের দেশে সবাই কাউকে একটু খারাপ লাগলে, প্রতারিত বোধ করলে, ঠকে গেছে মনে করলে, রাগ বা বিরক্তি প্রকাশের জন্য বা দুষ্টুমির ছলে একে অপরকে ফোর টুয়েন্টি বা ৪২০ বলে থাকে।

জীবনে কোনোদিন কাউকে ফোর টুয়েন্টি বলেনি বা কারো কাছে থেকে এই শব্দটি, শোনেনি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া বেশ কষ্টকর। কিন্তু ছোটবেলা থেকে প্রায়শই শোনা ‘ফোর টুয়েন্টি’ বা ‘৪২০’ কথার আসল অর্থ কী বা উৎপত্তি কোথা থেকে বা কেন ও কখন থেকে এটি গালি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে—সে বিষয়ে হয়তো আমরা অনেকেই জানি না। ফোর টুয়েন্টি সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ।

ফোর টুয়েন্টি বা ৪২০ আসলে কী

আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ বলেন, ৪২০ বলতে সাধারণত প্রতারক বা ঠকবাজ বোঝালেও এটি মূলত একটি আইনের ধারা। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ব্রিটিশ আমলে প্রণীত আইন দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৪২০ ধারায় প্রতারণা ও অসাধু উপায়ে সম্পত্তি আত্মসাতের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সেখান থেকেই শব্দটি কথ্য ভাষায় ঠকবাজ বা চিটারদের সমার্থক শব্দ হিসেবে সমাজে পরিচিতি লাভ করেছে।

যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণার শিকার হন, তবে তিনি প্রতারক ব্যক্তির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির এই ধারায় মামলা করতে পারবেন। কোন কোন কাজ প্রতারণা ও অসাধু উপায়ে সম্পত্তি আত্মসাতের আওতায় পড়বে—সেটা দণ্ডবিধির ৪১৫ ধারায় উল্লেখ করা আছে।

দণ্ডবিধির ৪২০ ধারা

দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণা ও অসাধুভাবে সম্পত্তি অর্পণ করতে প্রবৃত্ত করার শাস্তি সম্পর্কে বলা আছে। আলোচ্য ধারায় বলা হয়েছে—যদি কোনো ব্যক্তি প্রতারণা করে এবং প্রতারিত ব্যক্তিকে অসাধুভাবে অন্য কোনো ব্যক্তিকে কোনো সম্পত্তি প্রদানে প্রবৃত্ত করে কিংবা প্রতারিত ব্যক্তিকে কোনো মূল্যবান জামানতের সমুদয় অংশ বা অংশবিশেষ কিংবা মূল্যবান জামানতে রূপান্তরযোগ্য কোনো স্বাক্ষরিত বা সিলমোহরযুক্ত বস্তুর সমুদয় অংশ বা অংশবিশেষ প্রণয়ন, পরিবর্তন বা বিনাশ সাধনে প্রবৃত্ত করে, তবে উক্ত ব্যক্তি সাত বৎসর পর্যন্ত যেকোনো মেয়াদের সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবে এবং তাকে অর্থদণ্ডেও দণ্ডিত করা যাবে।

এই ধারায় মামলা করা যায় যেসব ক্ষেত্রে

আইনজীবী মমতাজ পারভীন মৌ বলেন, বাংলাদশে দণ্ডবিধির (পেনাল কোড) ৪২০ ধারা অনুযায়ী প্রতারণা এবং অসাধু উপায়ে কারও কাছ থেকে সম্পত্তি বা মূল্যবান জামানত আদায় করার অপরাধে মামলা করা যায়। সাধারণভাবে কারও সঙ্গে কোনো বিষয়ে যেকোনো ধরনের মিথ্যার আশ্রয় নেওয়া, ঠকানো বা কোনো প্রতিশ্রুতি ভেঙে ফেলাকে প্রতারণা বলা হলেও আইন অনুযায়ী প্রতারণার সংজ্ঞা কিছুটা ভিন্ন।

আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি কাউকে ফাঁকি দিয়ে প্রতারণামূলকভাবে বা অসাধুভাবে কোনো ব্যক্তির কাছে কোনো সম্পত্তি প্রদানে বা রাখতে প্ররোচিত করে বা ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারিত ব্যক্তিকে এমন কোনো কাজ করতে বা তা করা থেকে বিরত থাকলে প্ররোচিত করে যার ফলে ব্যক্তির শরীর, মন বা সম্পত্তির ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, তবে তা প্রতারণা হবে।

বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৪২০ ধারার অধীনে সাধারণত নিম্নলিখিত অপরাধগুলোর জন্য মামলা করা হয়ে থাকে:

১. অর্থ আত্মসাৎ হলে। অর্থাৎ কাউকে মিথ্যা কথা বলে বা প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হলে। যেমন: চাকরি দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া।

২. প্রতারণামূলকভাবে বা অসাধু উপায়ে কাউকে সম্পত্তি বা মূল্যবান দলিল হস্তান্তরে বাধ্য করা।

৩. ভুয়া দলিল বা জাল কাগজপত্র বা ভুয়া সই ব্যবহার করে মূল্যবান জামানত তৈরি, পরিবর্তন বা ধ্বংস করা।

৪. ব্যবসার কথা বলে বিনিয়োগ নিয়ে সেই টাকা অন্য খাতে খরচ করা বা ফেরত না দেওয়া। তবে চলমান ব্যবসায়িক লেনদেনের ক্ষেত্রে দণ্ডবিধির ৪২০ ধারায় প্রতারণার ফৌজদারি মামলা চলতে পারে না, যদি না লেনদেনের শুরুতে বা সূচনালগ্ন থেকেই কোনো অসৎ উদ্দেশ্য বা প্রতারণার প্রমাণ থাকে। এটি মূলত দেওয়ানি প্রকৃতির বিরোধ বা চুক্তিভঙ্গ হিসেবে গণ্য হয়। সেক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে মামলা করতে হবে।

৫. ভুয়া চেক বা পর্যাপ্ত ফান্ড নেই জেনেও জালিয়াতির উদ্দেশ্যে কাউকে চেক প্রদান করা বা জেনে বুঝে ইচ্ছে করে বন্ধ অ্যাকাউন্টের চেক দিলে।

অর্থাৎ যে প্রতারণার ফলে কোনো ব্যক্তি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন, সেই অপরাধগুলোই এই ধারার আওতায় পড়ে। ৪২০ ধারা প্রযোজ্য হতে হলে প্রথম দিন বা লেনদেন শুরুর সময়ই অভিযুক্তের মনে প্রতারণার উদ্দেশ্য থাকতে হবে।

৪২০ ধারার অভিযোগে কোথায় মামলা করতে হয়

৪২০ ধারার অপরাধের ক্ষেত্রে থানায় এজাহার দায়ের করার মাধ্যমে মামলা করা যায় অথবা আদালতে সরাসরি মামলা দায়ের করা যায়। এ মামলা দায়ের করতে হয় মুখ্য বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে।

তবে প্রতারণার ঘটনা মহানগর এলাকায় হলে এই মামলা দায়ের করতে হবে মুখ্য মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে। ক্ষেত্র বিশেষে অর্থাৎ দেওয়ানি প্রকৃতির বিরোধ বা চুক্তিভঙ্গের ক্ষেত্রে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ চেয়ে মোকদ্দমা দায়ের করতে পারেন।

তবে আইনের আশ্রয় নিতে চাইলে যথেষ্ট প্রমাণাদি থাকা লাগবে। যেমন: কোনো লিখিত চুক্তি বা রসিদ ইত্যাদি। তাই এ দলিলগুলো সংরক্ষণ রাখা জরুরি।

বিয়ের নাম করে যদি কেউ প্রতারণামূলকভাবে সংসার করে, সেক্ষেত্রেও আইনের আশ্রয় নেওয়া যাবে।