পেইন্টিং বিক্রি দিয়ে শুরু, যেভাবে ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হয়ে উঠলেন সুরভী
‘ঘোরাঘুরি আমার কাছে কখনো বিলাসিতা ছিল না, স্বপ্ন ছিল’, বলছিলেন ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুরভী ইয়াসমিন।
২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ছিলেন সুরভী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুদের ঘুরে বেড়ানোর ছবি, ভিডিও দেখে তার মনে এক অদম্য ইচ্ছার জন্ম দেয়।
‘আমার তখন নিজের কোনো ইনকাম ছিল না। কিন্তু ঠিক করেছিলাম, যেভাবেই হোক আমাকে ঘুরতে হবে,’ বলেন তিনি।
এই ‘যেভাবেই হোক’ অনুপ্রেরণাটাই তাকে তার পথে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে।
ছোটবেলা থেকেই আঁকাআঁকিতে আগ্রহ ছিল সুরভীর। সেই দক্ষতাকেই কাজে লাগানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
‘আমি পেইন্টিং করতাম। তারপর সেগুলো বিক্রি করে যে টাকা পেতাম, সেটা জমাতাম। সেই টাকা দিয়েই ট্রাভেল শুরু করি।’

শুরুটা ছিল খুব ছোট পরিসরে। মাসে এক বা দুটি ট্রিপ। বাজেট মাত্র ২ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা।
‘অনেকেই ভাবে ট্রাভেল করতে হলে অনেক টাকা লাগে। কিন্তু আমি খুব লো বাজেটে শুরু করেছি।’
পেইন্টিংয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন ছোটখাটো কাজ ও ভলান্টিয়ারিং করতেন সুরভী। সেখান থেকেও কিছু আয় হতো, যা যোগ হতো তার ট্রাভেল ফান্ডে।

তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থ নয়, ছিল সামাজিক বাস্তবতা। একজন মেয়ের একা ঘোরাঘুরি—এই ধারণা এখনো যেন আমাদের সমাজে পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি। ফলে পরিবার, আত্মীয়স্বজন এমনকি আশপাশের মানুষের কাছ থেকেও এসেছে নানা প্রশ্ন, আপত্তি, সমালোচনা।
‘আমার পরিবার খুব রেস্ট্রিকটিভ ছিল। তারা চাইত না আমি একা বাইরে যাই। পরিবারের বাইরেও অনেকেই বলত—মেয়ে হয়ে তুমি একা কেন ঘুরো? এসব শুনতে হতো। কিন্তু আমি থেমে যাইনি। নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। আমি জানতাম, আমি কী করতে চাই।’

২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত সময়টায় তিনি শুধু ঘুরেছেন, শিখেছেন, অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছেন। তখনো কনটেন্ট ক্রিয়েশন নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। তবে মিডিয়া স্টাডিজ অ্যান্ড জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করতেন বলে ক্যামেরা, ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং—এসবের প্রতি আগ্রহ ছিল।
‘আমি ট্রাভেল করতাম আর ছবি তুলতাম। পরে ভাবলাম, এগুলো তো শেয়ার করা যায়। এই ভাবনা থেকেই শুরু হয় কনটেন্ট ক্রিয়েশন।’

ট্রাভেলিং ঘিরে শুরু হয় তার নানা পরিকল্পনা। ধীরে ধীরে সুরভী তৈরি করতে থাকেন নিজের আলাদা পরিচয়।
‘আমি চাইতাম মানুষকে ইনস্পায়ার করতে—যাতে তারা বুঝতে পারে, কম টাকাতেও ট্রাভেল করা সম্ভব।’

বিশ্ববিদ্যালয় শেষে চাকরিতে যোগ দেন সুরভী। প্রায় চার বছর কাজ করেন করপোরেট সেক্টরে। কিন্তু মনের ভেতর সব সময়ই একটা অন্য ভাবনা চলতে থাকে।
‘আমি সবসময় ভাবতাম—আমি কি এই চাকরিটা সারাজীবন করব? নাকি আমার প্যাশনটা ফলো করব?।’

অবশেষে একসময় তিনি সিদ্ধান্ত নেন চাকরি ছেড়ে দেবেন। ঝুঁকি ছিল, অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু নিজের ওপর বিশ্বাস ও প্যাশনের প্রতি দৃঢ়তাও ছিল।
‘আমি কিন্তু হুট করে চাকরি ছাড়িনি। হিসাব করে, পরিকল্পনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। চাকরি ছাড়ার পরের ৬ মাস সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল। কোনো আয় ছিল না। কিন্তু আমি থেমে থাকিনি। সংকটের মাঝেও ট্রাভেল বন্ধ করিনি।’
কনটেন্ট ক্রিয়েশনকে পেশা হিসেবে নিতে হলে প্রয়োজন ছিল সরঞ্জাম।

নিজের সঞ্চিত টাকা দিয়ে ধীরে ধীরে ক্যামেরা, ড্রোন, মাইক্রোফোনসহ বিভিন্ন ট্রাভেল গিয়ার কিনেছেন। সবমিলিয়ে খরচ হয়েছে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা।
‘অনেকে ভাবে এগুলো বিলাসিতা। কিন্তু আমার জন্য এগুলো ছিল বিনিয়োগ।’
বর্তমানে প্রায় ৭০টি ব্র্যান্ডের সঙ্গে কাজ করছেন সুরভী ইয়াসমিন। কিন্তু সেই যাত্রাটাও এতটা সহজ ছিল না। শুরুর দিকে ব্র্যান্ডগুলো তার কাছে আসেনি, বরং তাকেই যেতে হয়েছে।

‘আমি নিজে ব্র্যান্ডগুলোর কাছে যেতাম, প্রেজেন্টেশন বানাতাম, বোঝাতাম কেন তারা আমার সঙ্গে কাজ করবে। প্রক্রিয়াটা সহজ ছিল না। অনেক জায়গা থেকে প্রত্যাখ্যান করেছে। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। আমি জানতাম, একদিন হবে, এখন সেটা হয়েছে। এখন সাধারণত আমাকে ব্র্যান্ডে কাছে যেতে হয় না, ব্র্যান্ডগুলোই আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে।’
সোশ্যাল মিডিয়ায় জনপ্রিয়তার সঙ্গে এসেছে সমালোচনাও। বিশেষ করে একা ট্রাভেল করা, পোশাক কিংবা জীবনধারা নিয়ে এসেছে অসংখ্য নেতিবাচক মন্তব্য।

‘আগে কষ্ট পেতাম। পরে বুঝেছি—সবাই আসলে আমার অডিয়েন্স না। এখন আমার অবস্থান পরিষ্কার, আমি এগুলোতে পাত্তা দেই না। যারা এসব বলে, তারা আমার জন্য না। আমি আমার কাজ করে যাব।’
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে পরিবারের দৃষ্টিভঙ্গি। ব্যক্তিগত জীবনেও এমন একজনকে সঙ্গী হিসেবে পেয়েছেন, যিনি তার কাজকে পুরোপুরি সমর্থন করেন।
‘শুরুতে তারা বুঝত না। এখন তারা আমাকে সাপোর্ট করে। আর এখন তো আমি এমন একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি, যে আমার স্বাধীনতাকে শ্রদ্ধা করে, আমার কাজকে সমর্থন করে। সেই কারণে আমি যেভাবে থাকতে চাই, সেভাবেই থাকতে পারি।’

ট্রাভেল ও কনটেন্ট তৈরির কাজ পুরোটা একাই করেন সুরভী। ‘আমার কনটেন্টের স্ক্রিপ্টিং, শ্যুটিং, এডিটিং এগুলো সব আমিই করি। কখনো কখনো খুব প্রয়োজন হলে অন্য কারো সাহায্য নেই। কিন্তু সেটা খুবই কম। বেশিরভাগ সময়ই একাই কাজ করি।’
এখন পর্যন্ত দেশের প্রায় ৪৫টি জেলায় ঘোরার অভিজ্ঞতা হয়েছে তার। আর বাংলাদেশের বাইরে ঘুরেছেন ছয়টি দেশে।
‘বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত অতিথিপরায়ণ। আমি যেখানেই গেছি, মানুষ আমাকে সাহায্য করেছে। আর আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, আপনি যদি পজিটিভ এনার্জি নিয়ে কোথাও যান, আপনি পজিটিভ অভিজ্ঞতাই পাবেন।’

সুরভীর মতে, কেউ যদি ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েশনে আসতে চান, তাহলে তাকে অবশ্যই প্যাশনেট হতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই।
‘কেউ ট্রাভেল কনটেন্ট ক্রিয়েটর হতে চাইলে তাকে দীর্ঘ সময় ধৈর্য ধরে থাকতে হবে, কঠোর পরিশ্রম করতে হবে এবং আর্থিক পরিকল্পনাটা ঠিকঠাকভাবে করতে হবে। কমপক্ষে এক থেকে দেড় বছর পাগলের মতো কাজ করতে হবে। মাল্টিটাস্কিং স্কিল ডেভেলপ করতে হবে।’

তবে, নিজের প্রতি বিশ্বাস সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বলে মনে করেন সুরভী।
‘আসলে নিজের ওপর বিশ্বাস রাখার কোনো বিকল্প নেই। যদি প্যাশন থাকে, নিজের প্রতি বিশ্বাস থাকে, লক্ষ্য ঠিক থাকে, তাহলে যত বাধা, সীমাবদ্ধতা বা সমালোচনা আসুক না কেন, এক সময় ঠিকই লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে।’