দীর্ঘমেয়াদি রোগ ‘এসএলই’ সম্পর্কে জানেন? কেন হয়?

স্মৃতি মন্ডল
স্মৃতি মন্ডল

সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস (এসএলই) রোগটি অজান্তেই কখন তীব্র ও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে, তা আগে থেকে বোঝা মুশকিল। সঠিক ও সময়মতো চিকিৎসায় রোগটি নিয়ন্ত্রণযোগ্য। অন্যথায় হতে পারে মৃত্যুর কারণ।

এই সম্পর্কে জানিয়েছেন ফেলোশিপ অন অ্যাডভান্স বায়োলজিক থেরাপি মাসকুলোস্কেলেটাল আল্ট্রাসনোগ্রাম, কেটিপিএইচ, সিংগাপুর এবং এনাম মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের রিউম্যাটোলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদ।

এসএলই কী

ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদ বলেন, সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস (এসএলই), সংক্ষেপে এটিকে লুপাস বলা হয়। এসএলই দীর্ঘমেয়াদি এবং খুবই জটিল বাতরোগ। এর লক্ষণ এবং প্রকাশভঙ্গি অন্য বাতরোগের থেকে ব্যতিক্রম।

এসএলই একটি অটোইমিউন রোগ। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা যদি ভুল করে নিজস্ব টিস্যু ও বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে আক্রমণ করে, তখন এই রোগটি হয়ে থাকে। এটি একটি মাল্টিসিস্টেম ডিজিজ, অর্থাৎ এর ফলে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হতে পারে, যেমন: ত্বক, চোখ, মস্তিষ্ক, ফুসফুস, লিভার, কিডনি ইত্যাদি।

কেন হয়

সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস কেন হয়—এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়—জিনগত, হরমোনাল কারণে হতে পারে। এক্স ক্রোমোজোম ও ইস্ট্রোজেন হরমোনের প্রভাবে এসএলই বেশি হয়। কিছু ভাইরাস সংক্রমণ, বিশেষ করে এপস্টেইন-বার ভাইরাসের ইনফেকশন, পরিবেশগত কিছু কারণ যেমন: সূর্যের আলোতে দীর্ঘসময় থাকা, বায়ুদূষণের কারণে হতে পারে। পুরুষদের তুলনায় নারীদের এসএলই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি প্রায় ৯ গুণ বেশি। সাধারণত ২০ বছর এবং ৪০ বছরের কাছাকাছি বয়সী নারীদের মধ্যে এই রোগ হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

লক্ষণ ও রোগের তীব্রতা

দীর্ঘমেয়াদি জ্বর হয়, ক্লান্তি, হালকা গিরা ব্যথা থেকে তীব্র গিরা ব্যথা ও ফুলে যাওয়া, ত্বকে র‌্যাশ হয় এবং সূর্যের আলোতে গেলে র‌্যাশ বেড়ে যাওয়া, চুল পড়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ প্রকাশ পায়। এর পাশাপাশি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার ভিত্তিতে বিভিন্ন লক্ষণ দেখা দেয়, যেমন: মাথাব্যথা, খিঁচুনি, স্ট্রোক, বিশেষ করে অল্প বয়সে স্ট্রোক হওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে লুপাস, প্লুরাল ইফিউশন বা ফুসফুসে পানি জমা, লিভারে সমস্যা, হাত-পায়ের নার্ভগুলো শুকিয়ে যাওয়া, দীর্ঘমেয়াদি কাশি হওয়া।

এসএলইর কারণে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয় কিডনি। এর ফলে প্রস্রাবের সঙ্গে প্রোটিন যাওয়া, কিডনি বৈকল্য বা কিডনি নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া নারীদের সন্তান না হওয়া, ঘন ঘন গর্ভপাত এবং গর্ভধারণে জটিলতা তৈরি হয়।

সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস রোগটি মৃদু, মাঝারি, তীব্র—এই তিন ভাবে প্রকাশ পায়।

মৃদু এসএলই—অঙ্গহানি হওয়ার কোনো ঝুঁকি নেই বা মারা যাওয়ার ঝুঁকি একেবারেই নেই। যেমন: গিরা ব্যথা, ত্বক আক্রান্ত হয়।

মাঝারি এসএলই—অঙ্গহানি হওয়ার কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে, যদি আক্রান্ত ব্যক্তি চিকিৎসা না নেন, মারা যাওয়ার ঝুঁকি অপেক্ষাকৃত কম। যেমন: রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া, হিমোগ্লোবিন কমে যাওয়া, কিডনি আক্রান্ত হতে পারে। তবে তা ব্যাপক বা তীব্র আকারে না।

তীব্র এসএলই—রোগীর অঙ্গহানি হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি থাকে। এ ছাড়া সঠিক চিকিৎসার অভাবে রোগীর মৃত্যু ঝুঁকিও বেশি। যেমন: তীব্র খিঁচুনি হওয়া, ফুসফুসে রক্তক্ষরণ হওয়া, কয়েক সপ্তাহ থেকে মাসের মধ্যে কিডনি বিকল হয়ে যাওয়া ইত্যাদি।

চিকিৎসা

ডা. হাবিব ইমতিয়াজ আহমাদ বলেন, এসএলই একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ, যা কখনই ভালো হয় না। চিকিৎসার প্রাথমিক ধাপ হিসেবে রোগীকে কাউন্সিলিং করতে হবে, রোগীকে বোঝাতে হবে এসএলই পুরোপুরি ভালো হবে না, তবে সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমে রোগটি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে।

দ্বিতীয়ত রোগীকে ফলো-আপের গুরুত্ব বোঝানো। এসএলই কখন তীব্র আকার ধারণা করবে তা অনুমান করা কঠিন। এজন্য রোগীকে ফলোআপে থাকতে হবে সবসময়, রোগের লক্ষণ ও এর তীব্রতার পরির্বতন হলো কি না, চিকিৎসক যে ওষুধ দিচ্ছেন তার কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হচ্ছে কি না, সেগুলো জানার জন্য ফলোআপ অত্যন্ত জরুরি।

এসএলই আক্রান্ত অধিকাংশ রোগীই হচ্ছে নারী। নারীদের প্রজনন স্বাস্থ্যে এসএলইর প্রভাব মারাত্মক। তাই সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। কখন গর্ভধারণ করবেন, এসএলইর কোনো ওষুধ চলা অবস্থায় সন্তান নিতে পারবেন কি না, যখন গর্ভধারণ করবেন তখন জীবনযাপন কেমন হবে—এই বিষয়গুলো আগে থেকে ঠিক করে নিতে হবে।

ধূমপান ত্যাগ করতে হবে এবং কিছু কিছু রোগের বিরুদ্ধে টিকা নিতে হবে, যা মেনে চলতে হবে এসএলই নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।

এর পাশাপাশি রোগের তীব্রতা এবং কোন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত তার ওপর ভিত্তি করে রোগীকে ওষুধ দেওয়া হয়। মৃদু এসএলইর চিকিৎসায় হাইড্রোক্সিক্লোরোকুইন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাঝারি ও তীব্র হলে স্টেরয়েড এবং যে অঙ্গ আক্রান্ত তার ওপর নির্ভর করে ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ ও আনুষাঙ্গিক উন্নত চিকিৎসার মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

সিস্টেমিক লুপাস ইরাইথিমেটোসাস চিকিৎসার জন্য রিউমাটোলজিস্ট বা বাতরোগ বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনে আক্রান্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ওপর ভিত্তি করে অন্যান্য রোগের বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ ও সমন্বিতভাবে চিকিৎসা নির্ধারণ করতে হবে।