ভুল ডায়েট নয়, নারীদের সঠিক খাদ্যাভ্যাস যেমন হওয়া উচিত
সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করে শরীরের সুস্থতা বজায় রাখা বাংলাদেশি নারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া ছাত্রদের তুলনায় ছাত্রীদের মধ্যে ইটিং ডিজঅর্ডারের হার কয়েক গুণ বেশি। শুধু তাই নয়, নারীদের মধ্যে কেউ কেউ তাদের শারীরিক সৌন্দর্য নিয়ে তুলনামূলকভাবে বেশি চিন্তিত থাকেন এবং বাহ্যিক রূপকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে অনেক সময় অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন।
এক্ষেত্রে মিডিয়ার ভূমিকা আরও উদ্বেগজনক। রূপালি পর্দা ও বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে চিকন গড়নের শরীরকেই সৌন্দর্য ও ফিটনেসের মানদণ্ড হিসেবে তুলে ধরা হয়, যা এই চাপকে আরও বাড়িয়ে তোলে। উপরন্তু, পরিবার বা আশপাশের মানুষজন শরীরের গঠন নিয়ে খোঁচা দেওয়া মন্তব্য করে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এর ফলশ্রুতিতে অনেক তরুণী ও নারী একবেলা বা একাধিক বেলা খাবার এড়িয়ে যাওয়া কিংবা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম খাবার গ্রহণ করাকেই অভ্যাসে পরিণত করেন, যা শেষ পর্যন্ত তাদের অপুষ্টি ও শারীরিক দুর্বলতার দিকে ঠেলে দেয়।
নারীদের সঠিক পুষ্টি গ্রহণ ও ফিটনেস বজায় রাখার ক্ষেত্রে সামাজিক, মানসিক ও প্রথাগত যে বাধাগুলো কাজ করে, সেগুলো বিশ্লেষণ করেন নিউট্রিশন ও লাইফস্টাইল কোচ নাইমা হাসান। শারীরিক পরিশ্রমের ভিত্তিক বিজ্ঞানসম্মত পুষ্টি ব্যবস্থাপনায় সার্টিফায়েড নিউট্রিশন কোচ তিনি। এছাড়াও, তিনি ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব স্পোর্টস মেডিসিন স্বীকৃত একজন পার্সোনাল ট্রেইনার এবং পার্সোনাল ট্রেইনার ডেভেলপমেন্ট সেন্টার অনুমোদিত লেভেল-১ অনলাইন ট্রেইনার।
নাইমা হাসান জানান, এনার্জি–সমৃদ্ধ খাবার, যেমন: প্রসেসড কার্বোহাইড্রেট ও ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজড ফ্যাট শরীরে পেশি গঠনের বদলে চর্বি হিসেবে জমা হয়। তবে যদি প্রোটিন ও ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার পরিমিত পরিমাণে দিনে তিন বেলা গ্রহণ করা হয়, তাহলে অনাকাঙ্ক্ষিত ওজন বাড়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। কিন্তু নির্মম বাস্তবতা হলো—খাবারের বিষয়ে আমরা অধিকাংশ সময় যুক্তি বা পুষ্টিগুণ বিবেচনা করি না; বরং আবেগের ওপর ভিত্তি করেই ঠিক করি কী খাব এবং কী খাব না।
পরিমিত খাদ্যাভ্যাসের অভাব
নাইমা তার বেড়ে ওঠার দিনগুলোর কথা মনে করে বলেন, একেকজনের শারীরিক গঠন একেকরকম। তাই ছিপছিপে গড়নের হিসেবে নিজেকে বদলে ফেলার চেষ্টা করা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। প্রত্যেকের শারীরিক গঠন এবং সুস্বাস্থ্যের সঙ্গে তার জিনগত বৈশিষ্ট্য, বয়স ও পারিপার্শ্বিকতার ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে।
এই নিউট্রিশন কোচের মতে, আমাদের সামাজিক অবস্থা এবং প্রথাগত পারিপার্শ্বিকতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের খাদ্যাভ্যাসের নীতিনির্ধারক হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, ‘অভ্যাস এবং খেতে ভালো লাগা—এই দুই কারণে খাবারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা অনেকের পক্ষেই কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। এভাবে খাওয়ার ফলে পরবর্তীতে কী হতে পারে, সেটি তারা বেশিরভাগ সময়ই ভেবে দেখেন না। ছোটবেলায় যেসব বাচ্চাদের তুলনামূলক বেশি পরিমাণে ভাত খাওয়ানো হয়, বড় হলেও তাদের মধ্যে এই অভ্যাসটি থেকে যায়। যেহেতু এই অভ্যাসটি ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে, তাই এটি আসলে কতটা স্বাস্থ্যসম্মত—সে বিষয়ে তাদের মনে কখনো প্রশ্ন জাগে না।’
নাইমা আরও বলেন, ‘ছোটবেলায় বাচ্চাদের মনোযোগ দিয়ে ধীরেসুস্থে খাওয়ার চেয়ে তাড়াতাড়ি খাবার শেষ করার জন্য বড়রা চাপ দেন। আর এই তাড়াহুড়ো করে খাওয়ার অভ্যাস অদূর ভবিষ্যতে বাচ্চাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। কারণ দ্রুত খাওয়ার ফলে শরীরে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয় এবং হজম প্রক্রিয়াতেও কিছু পরিবর্তন আসে। তখন শরীর চর্বিকে মেটাবলিজম প্রক্রিয়ায় ব্যবহার না করে জমাতে শুরু করে।’
‘ছোটবেলা থেকেই ধীরেসুস্থে ও মনোযোগ সহকারে খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুললে হজম প্রক্রিয়া সঠিকভাবে কাজ করে, শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত চর্বি তুলনামূলক কম জমে এবং ঘন ঘন ক্ষুধার উদ্রেকও কমে আসে। ছোটবেলার এই স্বাস্থ্যসম্মত অভ্যাস প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় আমাদের জন্য সুফল বয়ে আনে।’
শর্করা খাবেন কি না?
নাইমা জানান, শরীরের গঠন ও সুস্থতার জন্য ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট—এই দুই ধরনের পুষ্টি উপাদানই প্রয়োজন। তবে এদের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। শর্করা, আমিষ ও ফ্যাট হলো ম্যাক্রোনিউট্রিয়েন্ট; আর বিভিন্ন ফল ও শাকসবজি থেকে প্রাপ্ত খনিজ ও ভিটামিনকে বলা হয় মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট।
শর্করা আমাদের দেহে শক্তি জোগায় এবং পেশীর বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। পেশীর সঠিক বৃদ্ধি ব্যাহত হলে তা সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না। পেশী গঠনে আমরা সাধারণত প্রোটিনযুক্ত খাবারের ওপর গুরুত্ব দিই। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে সচল রাখতে শর্করারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, যারা বিভিন্ন ধরনের বডি বিল্ডিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে থাকেন, তাদের ক্ষেত্রে সবসময় শরীরে ফ্যাটের পরিমাণ একদম কম মাত্রায় রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু এছাড়া বাকি সবার ক্ষেত্রেই মাত্র শতকরা ছয় ভাগ ফ্যাটের মাত্রা বজায় রেখে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। কারণ, ফ্যাটের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় কম হলে শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াগুলো ব্যাহত হয়। তাই যারা ওজন কমানোর চেষ্টা করেন, তাদের উচিত প্রতিদিনের খাদ্যতালিকা থেকে ফ্যাটকে একদম বাদ না দিয়ে বরং পরিমিত পরিমাণে তা গ্রহণ করা।
এটি ঠিক কতটা যুক্তিসঙ্গত?
নাইমা বলেন, প্রত্যেক ব্যক্তির স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী একটি সুনির্দিষ্ট রুটিন অনুসরণ করে সুশৃঙ্খলভাবে চলা উচিত।
তিনি আরও বলেন, আমি ফিটনেস ও নিউট্রিশন নিয়ে কাজ করি এবং নিজের ক্ষেত্রেও তা মেনে চলার চেষ্টা করি। তবে আমি যদি এই বিষয়গুলো নিয়ে কাজ না-ও করতাম, তবুও কখনোই অস্বাভাবিকভাবে অতিরিক্ত রোগা হতাম না। কারণ প্রত্যেক মানুষের শরীরের একটি স্বাভাবিক ও নির্দিষ্ট গঠন থাকে।
‘আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে যে সাধারণ মানুষ এবং ইনফ্লুয়েন্সারদের জীবনযাত্রার মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। তাই তারা যে ধরনের ডায়েট প্ল্যান অনুসরণ করেন, তা হুবহু অনুকরণ করা কখনোই উচিত নয়। উদাহরণস্বরূপ: যাদের পিসিওএস রয়েছে, তাদের জন্য ওজন কমানো সহজসাধ্য নয়। এর প্রধান কারণ হলো শরীরে হরমোনের ভারসাম্য ঠিক না থাকা। এর ফলে ঘনঘন মুড পরিবর্তন হয়, যা ওজন নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকে আরও চ্যালেঞ্জিং করে তোলে।’
এ ধরনের পরিস্থিতিতে তিনি ব্যক্তিভেদে শারীরিক জটিলতা ও দুর্বলতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত ডায়েট প্ল্যান অনুসরণের পরামর্শ দেন। এর মাধ্যমে নিজের শরীরের সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা তৈরি করা সম্ভব হয়।
নির্দ্বিধায় স্বাস্থ্যসম্মত সহজলভ্য খাবার গ্রহণ করুন
সঠিক পরিমাণে খেলে ভাত খেয়েও কম ক্যালোরির ডায়েট অনুসরণ করা সম্ভব।
নারীদের জন্য নাইমার পরামর্শ, জীবনযাত্রার ধরন অনুযায়ী দৈনন্দিন খাবার অল্প পরিমাণে ভাগ করে দিনে দুই থেকে তিনবার, কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী চার থেকে পাঁচবার খাওয়া যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, কর্মজীবী নারীরা যারা প্রতিদিন গড়ে আট থেকে দশ ঘণ্টা ঘরের বাইরে থাকেন, তাদের উচিত ওটস, কিনোয়া বা বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবারের ওপর নির্ভর না করে ঘরে রান্না করা স্বাস্থ্যসম্মত খাবার গ্রহণ করা।
তার ভাষ্য, আমরা যেখানেই যাই না কেন, খাবার গ্রহণের আগে সবসময় স্বাস্থ্যসম্মত খাবারকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। রেস্টুরেন্টে খেতে গেলে আমরা অনেক সময় স্বাস্থ্য সচেতনতার বিষয়টি উপেক্ষা করি। তবে চাইলে সেখানেও সহজেই প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া সম্ভব।
‘প্রোটিন আমাদের পেশী গঠনে সহায়তা করে এবং কোষের কাজ সঠিকভাবে পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় শাকসবজি ও বিভিন্ন সালাদ অন্তর্ভুক্ত করলে আমরা সহজেই গ্রিলড চিকেনের মতো খাবার নিশ্চিন্তে উপভোগ করতে পারি।’
তিনি আরও বলেন, ঘরের দৈনন্দিন খাবারে প্রোটিন ও শর্করার অনুপাত ৪:১ হওয়া উচিত। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণীদের ক্ষেত্রে, যেহেতু দুপুরের খাবারের সময় তারা অধিকাংশ সময়ই বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকে, তাই ক্যাফেটেরিয়ায় মুরগি বা ডিমের তরকারিকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত। তবে সবচেয়ে ভালো হয়, যদি দুপুরের খাবার বাসা থেকে নিয়ে যাওয়া যায়।
গৃহিণীদের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যাদের নিয়মিত ব্যায়াম করার সময় বা সুযোগ হয়ে ওঠে না, তাদের খাবারের পরিমাণ পরিমিত রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি বাজারের তালিকায় প্রক্রিয়াজাত খাবার যতটা সম্ভব বাদের তালিকায় রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, অনেক সময় রান্না করতে অলসতা কাজ করে। সেক্ষেত্রে আগে থেকেই কিছু রান্নার উপকরণ আংশিক প্রস্তুত করে সংরক্ষণ করে রাখলে প্রয়োজনের সময় খুব সহজে ও অল্প সময়ে রান্না করা যায়।
‘আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। পাশাপাশি তাড়াহুড়ো না করে খাবার উপভোগ করে খাওয়া জরুরি। অনেকের ক্ষেত্রে খাবারের পরপরই আবার কিছু খেতে ইচ্ছে করে—এই প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন।’
পরিশেষে, নাইমা হাসান পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পানি পানের গুরুত্বও তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, আপনি স্বাস্থ্যকর বা জাঙ্ক ফুড—যাই খান না কেন, অবশ্যই পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। এতে ক্ষুধা কম লাগে এবং বারবার ক্ষুধা লাগার প্রবণতাও হ্রাস পায়।
অনুবাদ করেছেন শবনম জাবীন চৌধুরী




