নজরুলবর্ষ

আনুষ্ঠানিকতায় সরব, গবেষণায় নীরব নজরুলচর্চা

ইমরান মাহফুজ
ইমরান মাহফুজ

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে দেশে রাষ্ট্রীয় আয়োজনের কমতি নেই। জন্মজয়ন্তী, মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা বিশেষ কোনো উপলক্ষ এলেই আলোচনা, সেমিনার, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও প্রকাশনায় মুখর হয়ে ওঠে বাংলাদেশ। এবার প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় শুরু হচ্ছে ‘নজরুলবর্ষ’। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জাতীয় পর্যায়ে কর্মসূচি নিয়েছে। জানানো হয়েছে, বছরব্যাপী আয়োজনের জন্য ২ কোটি ৭১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার কথা।

আগামী ১৮ থেকে ২০ জুন সারাদেশে তিন দিনব্যাপী উদ্বোধনী অনুষ্ঠানেরও আয়োজন করা হবে।

নিশ্চয়ই এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। জাতীয় কবিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তার সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনকে পরিচিত করতে এমন উদ্যোগ প্রয়োজন।

কিন্তু একইসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আসে, যেসব প্রতিষ্ঠান সারা বছর নজরুলচর্চার দায়িত্ব পালন করে, সেগুলোর অবস্থা কী?

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, রাষ্ট্রীয় উদযাপনের প্রস্তুতি যত জোরালো, প্রাতিষ্ঠানিক নজরুলচর্চার ভিত ততটা শক্তিশালী নয়। কোথাও প্রতিষ্ঠানের পরিচালক নেই, কোথাও নেই পর্যাপ্ত জনবল। আবার, কোথাও মৌলিক গ্রন্থের সরবরাহের অভাব। ফলে ‘নজরুলবর্ষ’র প্রাক্কালে সার্বিক বাস্তবতার দিকে তাকানো জরুরি হয়ে উঠেছে।

রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও নজরুলচর্চার ধারাবাহিকতা

দেশে নজরুলচর্চার ইতিহাস নতুন নয়। নজরুলের কৈশোর, যৌবন, প্রেম, সংগ্রাম ও সৃষ্টিশীল জীবনের নানা অধ্যায় এ দেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। তাই পূর্ববঙ্গের তথা আজকের বাংলাদেশের মানুষ তাকে খুব দ্রুত নিজেদের কবি হিসেবে গ্রহণ করে।

স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২৪ মে ভারত সরকারের সহযোগিতায় সঠিক চিকিৎসার জন্য নজরুলকে সপরিবারে বাংলাদেশে আনা হয়। ধানমন্ডির কবিভবনে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় আবাসন দেওয়া হয়। ১৯৭৬ সালে দেওয়া হয় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব। এরপর রাষ্ট্রীয়ভাবে নজরুলচর্চার একটি ধারাবাহিক কাঠামো গড়ে ওঠে।

নজরুল একাডেমি, বাংলা একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক গবেষণা কেন্দ্র ও নজরুল চেয়ার—সব মিলিয়ে দেশে একটি বিস্তৃত প্রাতিষ্ঠানিক পরিমণ্ডল তৈরি হয়েছে। কিন্তু, কাঠামো তৈরি হওয়া আর তা কার্যকরভাবে পরিচালিত হওয়া এক বিষয় নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

বাংলা একাডেমিতে নজরুল

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের সর্ববৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমির সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক বহুমাত্রিক। একদিকে তার রচনার সংরক্ষণ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার দায়িত্ব পালন করছে প্রতিষ্ঠানটি, অন্যদিকে একাডেমির ঐতিহাসিক বর্ধমান হাউসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কবির জীবনের বহু স্মরণীয় অধ্যায়।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড বাংলা একাডেমির সঙ্গে একীভূত হলে নজরুল-রচনাবলী প্রকাশের দায়িত্বও বাংলা একাডেমির অধীনে আসে। পরবর্তী সময়ে ১২ খণ্ডে প্রকাশিত ‘নজরুল-রচনাবলী’ জন্মশতবর্ষ সংস্করণ বাংলা একাডেমির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনা হিসেবে বিবেচিত হয়। জাতীয় কবির বিচিত্র সাহিত্যকর্মকে গ্রন্থবদ্ধ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অর্জন। তবে গবেষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রচনাবলির বিভিন্ন খণ্ডে মুদ্রণ ও সম্পাদনাগত ত্রুটি রয়ে গেছে। নতুন সংস্করণে এসব ভুল সংশোধনের দাবি বহুদিনের।

বাংলা একাডেমির বর্তমান সদর দপ্তর বর্ধমান হাউসও নজরুল-স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক স্থান। ১৯২৬ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে একাধিকবার ঢাকায় এসেছেন কবি। মুসলিম সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিতে ১৯২৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ঢাকায় এসে প্রায় আড়াই সপ্তাহ অবস্থান করেন। প্রথমে সাহিত্যিক আবুল হোসেনের বাসায় উঠলেও পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিজ্ঞানী ও তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাজী মোতাহার হোসেনের বাসভবন বর্ধমান হাউসে অবস্থান করেন। কয়েক মাস পর আবার বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকায় এসে কিছুদিন এখানে ছিলেন।

সে সময়ের বর্ধমান হাউস ছিল কবির প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা এক আড্ডাকেন্দ্র। বাড়ির সীমানার ভেতরে থাকা বড় পুকুরটিতে তিনি নিয়মিত সাঁতার কাটতেন। অবসরে পুকুরঘাটে বসে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দিতেন, গান গাইতেন এবং সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করতেন। গবেষকদের মতে, বর্ধমান হাউসে অবস্থানকালে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যকর্মও রচনা করেন।

এই বর্ধমান হাউসেই নজরুলের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হয় কবি ও সাহিত্যিক বুদ্ধদেব বসুর। কাজী মোতাহার হোসেন দুজনের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। এখানেই তার পরিচয় ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ফজিলাতুন্নেসার সঙ্গে। গণিতে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হওয়া এই কৃতী নারী ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেনের দূরসম্পর্কের আত্মীয়। তার বাসায় যাতায়াতের সূত্রেই নজরুলের সঙ্গে পরিচয় গড়ে ওঠে।

কবির স্মৃতি সংরক্ষণের লক্ষ্যে বাংলা একাডেমি ১৯৭৮ সালে বর্ধমান হাউসে ‘নজরুল স্মৃতিকক্ষ’ প্রতিষ্ঠা করে। ওই বছরের ২৯ আগস্ট নজরুলের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্মৃতিকক্ষটির উদ্বোধন করেন জাতীয় অধ্যাপক কাজী মোতাহার হোসেন। উদ্বোধনের দিন দর্শনার্থীদের মন্তব্য খাতায় তিনি লিখেছিলেন, ‘আজ ২৯/৮/৭৮ তারিখে নজরুল স্মৃতিকক্ষ উদ্বোধন করা হলো। এটা আমার পক্ষে অতিশয় সুখের দিন; অবশ্য সে আমার নিজের গুণে নয়, নজরুল যে আমার সমসাময়িক কালের বন্ধু ছিলেন।’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুনের নজরুলবিষয়ক একক আলোকচিত্র প্রদর্শনীরও আয়োজন করা হয়েছিল।

তবে দুঃখজনকভাবে এই স্মৃতিকক্ষের সংরক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরেজমিনে দেখা যায়, কক্ষটি দীর্ঘদিন যথাযথভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়নি। একাডেমির বিভিন্ন সূত্র জানায়, একসময় স্মৃতিকক্ষটি দাপ্তরিক কাজের জন্য ব্যবহার করা হতো এবং সেখানে কর্মকর্তারা বসতেন। গবেষকদের অভিযোগ, নজরুল যে কক্ষে অবস্থান করেছিলেন, সেটি সংরক্ষণ না করে পাশের একটি কক্ষকে স্মৃতিকক্ষ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ফলে কবির প্রকৃত স্মৃতিচিহ্ন সংরক্ষণের বিষয়ে এক ধরনের অবহেলার অভিযোগ রয়েছে।

নজরুল-স্মৃতি সংরক্ষণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছু নতুন উদ্যোগও নিয়েছে বাংলা একাডেমি। ২০২১ সালে একাডেমি প্রাঙ্গণের নজরুল মঞ্চে স্থাপন করা হয় ‘বিদ্রোহী’ কবিতার শতবর্ষ স্মারক ভাস্কর্য। জাতীয় কবির সৃষ্টিশীলতা ও বিদ্রোহী চেতনার প্রতীক হিসেবে নির্মিত এই ভাস্কর্য দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

এ ছাড়া, ২০২২ সাল থেকে নজরুলচর্চায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলা একাডেমি প্রতি বছর একজন গবেষক ও একজন শিল্পীকে ‘বাংলা একাডেমি নজরুল পুরস্কার’ প্রদান করছে। কবির জন্মবার্ষিকী ও মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, নজরুলসংগীত পরিবেশনা ও স্মারক বক্তৃতার আয়োজন করা হয়। একইসঙ্গে নজরুল সাহিত্য নিয়ে মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ, প্রবন্ধ সংকলন, নজরুলসংগীতের স্বরলিপি ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশনাও নিয়মিতভাবে প্রকাশ করে আসছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে প্রশ্ন থেকেই যায়, জাতীয় কবির স্মৃতি ও সাহিত্য-ঐতিহ্য সংরক্ষণে এসব উদ্যোগ কি যথেষ্ট? একদিকে রচনাবলির সম্পাদনাগত ত্রুটি, অন্যদিকে স্মৃতিকক্ষের অবহেলিত অবস্থা—সবমিলিয়ে নজরুলচর্চার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলা একাডেমির সামনে এখনো অনেক দায়িত্ব অপূর্ণ রয়ে গেছে।

নজরুল ইনস্টিটিউট: প্রকাশনা ও গবেষণায় স্থবিরতা

১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠিত নজরুল ইনস্টিটিউট জাতীয় কবির স্মৃতি রক্ষার্থে একমাত্র সরকারি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। ধানমন্ডির কবিভবনে প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে নজরুলসংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি প্রণয়ন, শিল্পী প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও প্রকাশনার কাজ করে আসছে।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম বড় অর্জন নজরুলসংগীতের শুদ্ধ স্বরলিপি সংরক্ষণ ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এ ছাড়া, বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৫০০ গ্রন্থ ও ৫০টিরও বেশি অডিও সিডি প্রকাশ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

বাস্তবতা হলো, গত এক বছর ধরে নজরুলের প্রধান গ্রন্থগুলো প্রতিষ্ঠানটিতে পাওয়া যাচ্ছে না। ‘নজরুল-রচনাবলী’, ‘সঞ্চিতা’, ‘অগ্নিবীণা’, ‘সাম্যবাদী’, ‘ছোটগল্প সমগ্র’র মতো মৌলিক বইয়ের সংকট গবেষক ও পাঠকদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করেছে।

তাদের ভাষ্য, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে যদি জাতীয় কবির মৌলিক বই-ই অনুপস্থিত থাকে, তাহলে তা উদ্বেগের বিষয়।

নজরুল ইনস্টিটিউটের পরিচালক কে এম আল-আমীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নজরুলকে যথাযথভাবে তুলে ধরতে। তবে আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।’

গবেষণা ও প্রকাশনার তুলনায় ইনস্টিটিউটের কার্যক্রমে অনুষ্ঠান-নির্ভরতার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সেভাবে আমার কিছু করার থাকে না। নির্বাহী পরিচালক যেভাবে পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, আমরা মূলত সেগুলো বাস্তবায়ন করি।’

তার এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ইনস্টিটিউটের কার্যক্রম ও অগ্রাধিকার নির্ধারণে পরিচালকের চেয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সিদ্ধান্তই বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে গবেষণা, প্রকাশনা ও দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক কর্মসূচির চেয়ে অনুষ্ঠানভিত্তিক কার্যক্রম গুরুত্ব পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।

এই বিষয়ে মন্তব্য জানতে নির্বাহী পরিচালককে একাধিকবার কল ও মেসেজ দিলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অনেক গবেষকের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটি এখন গবেষণার চেয়ে অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে। অথচ নজরুল ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮ অনুযায়ী কবির সাহিত্য, সংগীত ও জীবনদর্শনের ওপর গবেষণা, প্রকাশনা, সংরক্ষণ ও প্রচারই প্রতিষ্ঠানটির প্রধান দায়িত্ব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল গবেষণা কেন্দ্র: ঐতিহ্য আছে, গতি নেই

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে নজরুলের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছেন। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সময় কাটিয়েছেন। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, রমেশচন্দ্র মজুমদার, কাজী মোতাহার হোসেন, বুদ্ধদেব বসুসহ অনেকের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ১৯৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল গবেষণা কেন্দ্র।

কেন্দ্রটির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় কবির জীবন, সাহিত্য, সংগীত ও দর্শনের ওপর গবেষণা পরিচালনা করা। কিন্তু, বর্তমানে কেন্দ্রটিতে প্রত্যাশিত কার্যক্রম নেই। প্রায় দুই বছর ধরে সেখানে পরিচালক নেই। নিয়মিত গবেষণা প্রকল্প, প্রকাশনা ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনার অভাব স্পষ্ট।

কেন্দ্রটির সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সিরাজ সালেকীন দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘নজরুলকে নিয়ে এখনো অনেক মৌলিক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সে ধরনের গভীর মনোযোগী গবেষণা কার্যক্রম খুব একটা দৃশ্যমান নয়।’

জাতীয় কবির সঙ্গে এত নিবিড় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও দেশের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলচর্চার এই শ্লথগতি হতাশাজনক, বলে মনে করেন অনেকে।

ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ: সম্ভাবনা আছে, আছে সংকটও

ময়মনসিংহের ত্রিশাল নজরুল-জীবনের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত স্থান। সেই স্মৃতিকে ধারণ করেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব বিভাগে ‘নজরুল স্টাডিজ’ বাধ্যতামূলক কোর্স হিসেবে চালু রয়েছে।

২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠিত ইনস্টিটিউট অব নজরুল স্টাডিজ বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে দেশের প্রথম ও একমাত্র পূর্ণাঙ্গ নজরুল গবেষণা প্রতিষ্ঠান।

গবেষণা অনুদান প্রদান, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গ্রন্থ প্রকাশ ও আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ করেছে। বিশেষ করে ভারতের কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যৌথভাবে প্রকাশিত ‘নজরুল জার্নাল’ ও আয়োজিত আন্তর্জাতিক সম্মেলন প্রশংসিত হয়েছে।

এত সম্ভাবনার মধ্যেও রয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা। ২৩ জনের অনুমোদিত জনবলের বিপরীতে প্রতিষ্ঠানটি চলছে মাত্র তিনজনকে নিয়ে। প্রতিষ্ঠার ১২ বছর পরও সেখানে স্থায়ী পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়নি। পদাধিকারবলে উপাচার্য দায়িত্ব পালন করলেও বাস্তবে তার পক্ষে গবেষণা ইনস্টিটিউটকে পূর্ণ সময় দেওয়া সম্ভব হয় না।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, যে ঐতিহাসিক বটগাছকে কেন্দ্র করে নজরুল-স্মৃতি সংরক্ষণের আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই বটগাছ আজও বিশ্ববিদ্যালয়ের বাহিরে অবহেলা ও অযত্নে পড়ে আছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল গবেষণা কেন্দ্র: বাজেটহীন এক গবেষণা প্রতিষ্ঠান

১৯৮৯ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক ও অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আল আজাদের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল গবেষণা কেন্দ্র। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিষদ রয়েছে, কিন্তু গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট বাজেট নেই। কোনো কর্মসূচি নিতে হলে প্রশাসনের কাছে আলাদা বরাদ্দ চাইতে হয়।

সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, প্রথম ‘নজরুল গবেষণাপত্র’ প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর দীর্ঘ ৩৪ বছর পর ২০২৫ সালে দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে।

একটি গবেষণা কেন্দ্রের জন্য এটি নিঃসন্দেহে হতাশাজনক পরিসংখ্যান। গবেষণার ধারাবাহিকতা ছাড়া কোনো গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে না।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় নজরুল চর্চা কেন্দ্র: যাত্রা শুরু, কাজের অপেক্ষা

চলতি বছর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘নজরুল চর্চা কেন্দ্র’। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সংগীত, দর্শন ও চিন্তাধারাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হয়েছে। উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে নজরুলচর্চার জন্য এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ।

তবে উদ্বোধনের কয়েক মাস পরও কেন্দ্রটির উল্লেখযোগ্য কোনো গবেষণা কার্যক্রম, প্রকাশনা, সেমিনার বা জাতীয় পর্যায়ের কর্মসূচি দৃশ্যমান হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠার পর এর কার্যকর অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক শামীমা হামিদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আসলে কেন্দ্রটির উদ্বোধন কিছুটা তাড়াহুড়ো করেই হয়েছে। এরপর উপাচার্য পরিবর্তন হয়েছে। ফলে নতুন করে বিষয়টি নিয়ে আর এগোনো সম্ভব হয়নি। কেন্দ্রটির যাত্রা শুরু হলেও এখনো কার্যত কোনো কাজ শুরু করা যায়নি।’

‘নজরুলবর্ষ হোক আত্মসমালোচনারও বছর’

গবেষকরা বলেন, নজরুল কেবল জাতীয় কবি নন; তিনি বাংলাদেশের অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য, মানবমুক্তি ও সাংস্কৃতিক চেতনার অন্যতম ভিত্তি। তাকে নিয়ে আয়োজন অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু আয়োজনের চেয়েও বেশি প্রয়োজন গবেষণা, প্রকাশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি।

আজ যখন নজরুলবর্ষ উদযাপনের জন্য কোটি টাকার কর্মসূচি নেওয়া হচ্ছে, তখন একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে—নজরুল ইনস্টিটিউটে বই থাকবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কেন্দ্রে পরিচালক থাকবে, গবেষণা তহবিল থাকবে, নতুন গবেষক তৈরি হবে ও আন্তর্জাতিক পরিসরে নজরুল অধ্যয়নকে বিস্তৃত করা হবে।

তারা আরও বলেন, তা না হলে দেশবাসী হয়তো নজরুলকে স্মরণ করবে, তার গান গাইবে, তার ছবি নিয়ে ব্যানার সাজাবে; কিন্তু তাকে ধারণ করার জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলো ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়বে।

‘নজরুলবর্ষ’র সবচেয়ে বড় সাফল্য হবে তখনই, যখন এই উদযাপন প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্জাগরণের সূচনা ঘটাবে। জাতীয় কবির প্রতি সেটিই হবে প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি।

গবেষক ও অধ্যাপক ওয়াকিল আহমেদ বলেন, ‘নজরুল আমাদের জাতীয় সম্পদ। তাকে যথাযথভাবে চর্চা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে তাকে স্মরণের আন্তরিকতায় প্রায়ই ঘাটতি থেকে যায়।’

তিনি মনে করেন, জাতীয় কবিকে কেন্দ্র করে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির চেয়ে নজরুলচর্চার বিদ্যমান সংকটগুলো চিহ্নিত করা এখন বেশি জরুরি।

তার ভাষায়, ‘নজরুলবর্ষ পালনের আগে আমাদের দেখতে হবে কোথায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, গবেষণা, প্রকাশনা, সংরক্ষণ ও প্রচারের ক্ষেত্রে কী কী সমস্যা আছে। সেই সংকটগুলো নিরসনের উদ্যোগ নিয়েই মূল আয়োজন বাস্তবায়ন করতে হবে। তাহলেই নজরুলবর্ষ উদযাপন অর্থবহ হবে।’

একসময় দেশের চারটি স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে নজরুলচর্চাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে বাংলা বিভাগে ‘নজরুল চেয়ার’ নামে বিশেষ পদ চালু ছিল। ধারণা করা হয়, ১৯৮০-এর দশকে এরশাদ সরকারের আমলে এই পদগুলো সৃষ্টি করা হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এ দায়িত্ব পালন করেন অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলাম, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক কবি আলাউদ্দিন আল আজাদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. আবদুল কাইউম এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ড. কাজী আবদুল মান্নান।

নজরুল চেয়ারধারী গবেষক ও শিক্ষকের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নজরুলবিষয়ক আলোচনা, সেমিনার, গবেষণা ও একাডেমিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে জাতীয় কবিকে নিয়ে একটি ধারাবাহিক বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই উদ্যোগ বিলুপ্ত হয়ে যায়। বর্তমানে চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগে খোঁজ নিয়ে এ পদগুলোর অস্তিত্ব বা কার্যক্রম সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। অনেক শিক্ষক ও কর্মকর্তাও এ বিষয়ে অবগত নন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে “নজরুল চেয়ার” নামে কোনো পদ ছিল, সেটি আমার জানা ছিল না। আমি বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখতে পারি।’

জাতীয় কবির রচনাবলির বর্তমান সংস্করণ এখনো নানা মুদ্রণ ও সম্পাদনাগত ত্রুটির অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। অন্যদিকে, বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ১২ খণ্ডের ‘নজরুল রচনাবলি’র মূল্য ৪ হাজার ২৮০ টাকা এবং নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘নজরুলসমগ্র’র ১৭ খণ্ডের সেটের মূল্য ৫ হাজার ৩০০ টাকা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী জামাল রোহানীর মতে, জাতীয় কবিকে নতুন প্রজন্মের কাছে আরও সহজলভ্য করে তুলতে তার রচনাবলির নির্ভুল ও সুলভ সংস্করণ প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘নজরুলকে জানতে হলে তার মৌলিক রচনার কাছে যেতে হবে। কিন্তু উচ্চমূল্যের কারণে অনেক পাঠকের পক্ষে এসব সংকলন সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ে।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচনার কপিরাইট এখনো তার পরিবারের অধীন রয়েছে। তবে পরিবারের অভিযোগ, অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান নামে-বেনামে কবির বই প্রকাশ করছে, যার অনেকগুলোর বিষয়ে তারা অবগত নন।

একইসঙ্গে নজরুলের রচনাবলি প্রকাশ, গ্রন্থের মূল্য ও বিভিন্ন সংস্করণে বিদ্যমান সম্পাদনাগত ত্রুটি নিয়েও আলোচনা রয়েছে। এ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলামের নাতনি খিলখিল কাজী দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বাংলা একাডেমি শুরু থেকেই নজরুল-রচনাবলি প্রকাশ করে আসছে। সে কারণে বিষয়টি নিয়ে আমরা কোনো আপত্তি করিনি।’

রচনাবলির বিভিন্ন খণ্ডে ভুল থাকার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমাদের জানা আছে। এ জন্য আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। কমিটির সদস্যরা বিষয়গুলো পর্যালোচনা করবেন। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।’