নারায়ণগঞ্জে খুন হওয়া সেই তরুণের দাফন হবে ইসলামি রীতিতে: হাইকোর্ট
নারায়ণগঞ্জে খুন হওয়া সেই তরুণের মরদেহ ইসলামি রীতিতে দাফনের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।
তার স্ত্রী জ্যোতির দায়ের করা এক রিট আবেদনের শুনানি শেষে বিচারপতি মুহাম্মদ ইকবাল কবির ও বিচারপতি মো. সাইফুল ইসলামের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ গতকাল বৃহস্পতিবার এ আদেশ দেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্যোতির আইনজীবী জুয়েল আজাদ জানান, মরদেহ স্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে খুন হন শুভ চন্দ্র দাস ওরফে মো. বিল্লাল।
রিট আবেদন অনুযায়ী, শুভ, তার মা পার্বতী রানী দাস ও তার ভাই সজীব ২০০৩ সালে হলফনামার মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। পরে শুভর নাম রাখা হয় বিল্লাল। তিনি মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুল মান্নানের মেয়ে জ্যোতিকে ইসলামি রীতি অনুযায়ী বিয়ে করেন।
শুভর ভাই সজীব আদালতে উপস্থিত থেকে নিশ্চিত করেন, তিনি ও শুভ মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন।
বিরোধের শুরু যেখানে
নিহত তরুণের মা দাবি করেন, শুভ ওরফে বিল্লাল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাই তাকে ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী দাফন করা উচিত। অন্যদিকে তার বাবা দাবি করেন, শুভর জন্ম হিন্দু পরিবারে, তাই তার সৎকার হিন্দু রীতিতেই হওয়া উচিত। দুই পক্ষই পরে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়।
জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মফিজুল ইসলাম জানান, মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছিল। পরে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের নির্দেশে তা ঢাকা মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।
এসআই মফিজুল জানান, তদন্ত ও পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বেশ কিছু তথ্য বেরিয়ে এসেছে।
শুভর বাবা চাঁদপুর মতলবের বাসিন্দা হরি চন্দ্র দাস পেশায় একজন কামার। নারায়ণগঞ্জ শহরে তার ছোট একটি দোকান রয়েছে। ২০০৩ সালে হরি চন্দ্র দাসের সঙ্গে শুভর মা পার্বতী দাসের বিয়ে বিচ্ছেদ হয়।
পার্বতী পরে চার সন্তানসহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং হলফনামার মাধ্যমে নিজের নাম রাখেন আয়েশা বেগম। তিনি সাত বছর বয়সী শুভর নাম পরিবর্তন করে বিল্লাল রাখেন। পার্বতী পরে এক মুসলিম ব্যক্তিকে বিয়ে করেন এবং হরি চন্দ্র দাস এক হিন্দু নারীকে বিয়ে করেন।
এসআই জানান, শুভ ওরফে বিল্লাল এক মুসলিম নারীকে বিয়ে করেন এবং নারায়ণগঞ্জের জালকুড়ি এলাকায় স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী সন্তান নিয়ে থাকতেন। বিয়েটি ইসলামি রীতি অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছিল এবং বিয়ের নিবন্ধনে তাকে মুসলিম হিসেবেই উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুভ তার জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) কখনো নাম পরিবর্তন করেননি বলে তিনি জানান।
এসআই আরও বলেন, পার্বতী বিয়েবিচ্ছেদের পর চার সন্তানকে নিয়ে গেলেও হরি চন্দ্র দাস পরে শুভ ও তার বোনকে নিজের কাছে নিয়ে আসেন। তবে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর শুভ মা-বাবা উভয়ের কাছ থেকেই আলাদা থাকতে শুরু করেন। পরে একসময় তিনি মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েন।
দাফন নাকি সৎকার— এই বিবাদের কারণ হলো, তার জাতীয় পরিচয়পত্রে পিতা হিসেবে হরি চন্দ্র দাসের নাম এবং মায়ের নাম হিসেবে হরি চন্দ্রের দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম উল্লেখ রয়েছে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, শুভ হলফনামার মাধ্যমে তার ধর্মান্তর প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পন্ন করেননি এবং বিয়ের নথিতেও বিল্লালের পরিবর্তে শুভ নাম ব্যবহার করেছেন।
শুভর খুন ও মরদেহ উদ্ধার
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আল মেহেদী জানান, ৫ সেপ্টেম্বর রাত ১টার দিকে শহরের সিটি হকার্স মার্কেটের পেছনের গলিতে খুন হন শুভ ওরফে বিল্লাল। পুলিশ রাত সোয়া ১টার দিকে তার মরদেহ উদ্ধার করে।
তার বুক ও মাথায় গুলির ক্ষত এবং শরীরে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন ছিল। পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গুলির খোসা এবং ১০০ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করে।
পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত পিস্তলটি উদ্ধার করেছে।
এসআই মফিজুল জানান, গ্রেপ্তারদের মধ্যে দুজন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুভর বিরুদ্ধে অন্তত পাঁচটি মাদক মামলা রয়েছে।
(প্রতিবেদনটিতে আমাদের নারায়ণগঞ্জ সংবাদদাতা তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন)