‘হত্যাকারীদের ফাঁসি হলেও তো সন্তানকে ফিরে পাব না’

খালিদ বিন নজরুল
খালিদ বিন নজরুল

‘আমার মাত্র ১৩ বছরের সন্তান, যাকে খাবার মুখে তুলে না দিলে খেতে পারত না, তাকে মেরে ফেলার কারণটা জানতে চাই। হত্যাকারীদের ফাঁসি হলেও তো আমি আমার সন্তানকে ফিরে পাব না।’

কথাগুলো বলছিলেন কুমিল্লায় নিহত শিশু ইশায়াত শাহারিয়ার অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ার।

প্রিয় সন্তানকে হারিয়ে অপ্রতিমের বাবা ও মা—কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগম—উভয়েই এখন শোকে স্তব্ধ। তাদের প্রশ্ন, ‘কী অপরাধ ছিল আমাদের সন্তানের, যে তাকে হত্যা করা হলো?’

অপ্রতিম ছিল তাদের একমাত্র সন্তান। গত কয়েক মাস ধরে সে সাধারণত শুধু শুক্রবারেই বাইরে বের হতো। দুজন শিক্ষক প্রতিদিন প্রায় চার ঘণ্টা করে তাকে বাসায় পড়াতেন।

তার বাবা বলেন, ‘হাসতে হাসতে ঘুরতে গিয়ে আমার ছেলেটি আর ফিরে এলো না।’

হত্যাকাণ্ডের পর অপ্রতিমের পরিবার পরে জানতে পারে, ঘটনার সঙ্গে সাইফুল ইসলাম তুহিন (১৯) নামে এক তরুণ জড়িত। ঘটনার আগে তার তারা তুহিনকে চিনতেন না।

অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পরের দিন তার পরিবার একটি সিসিটিভি ফুটেজ পায়। সেই ফুটেজ থেকে তুহিনকে শনাক্ত করে ১৫ বছর বয়সী এক ডেলিভারিম্যান, যে গত ২ সেপ্টেম্বর অপ্রতিমের বাবার ব্যবসায় যোগ দিয়েছিল।

তখন অপ্রতিমের বাবা প্রথমবারের মতো তুহিনকে দেখেন। ওই ডেলিভারিম্যান ও তুহিন এরপর অপ্রতিমকে খুঁজে দেওয়ার ভান করলেও তিনি বুঝতে পারেননি, তার সন্তানের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তারা জড়িত।

ডেলিভারিম্যানকে তার বাবার অনুরোধে অপ্রতিমের বাবার ব্যবসায় চাকরি দেওয়া হয়েছিল। গত শনিবার গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত সে সেখানেই কাজ করছিল।

সেই ডেলিভারিম্যান এরইমধ্যে গ্রেপ্তার তুহিনকে বারবার ফোন করে পালিয়ে যেতে বলেছিল বলে জানান অপ্রতিমের বাবা। পরে পুলিশ সেই ডেলিভারিম্যানকেও গ্রেপ্তার করে।

অপ্রতিম দুই বছর বয়স থেকেই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বড় হয়েছে। মা-বাবার সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মাঝে তার বেড়ে ওঠা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বড় ভাইও ছিল তার বন্ধুর মতো।

অপ্রতিমের মায়ের সহকর্মী বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক আবু তাহের বলেন, নাহিদা তার সন্তানকে মুক্তচিন্তার মানুষ হিসেবে বড় করতে চেয়েছিলেন। তিনি চাননি সন্তানের চিন্তায় সামাজিক বা অর্থনৈতিক ভেদাভেদ তৈরি হোক। মানুষকে কেবল মানুষ হিসেবেই দেখতে শিখিয়েছিলেন সন্তানকে।  

বাংলা বিভাগের শিক্ষক মোকাদ্দেসুল ইসলাম বিদ্যুৎ জানান, নাহিদা তার শিক্ষার্থীদের প্রতি সব সময় বেশ দায়িত্বশীল ছিলেন। তিনি অনেক শিক্ষার্থীকে তাদের কঠিন সময়ে মানসিকভাবে সাহস যুগিয়েছেন, এমনকি আত্মহত্যাপ্রবণ শিক্ষার্থীদের নতুন করে জীবন গড়তে সাহায্য করেছেন।

ছবি: স্টার

মায়ের সঙ্গেই অপ্রতিমকে দেখা গেছে ১০ টাকায় ইফতার বিক্রি করতে বা বন্যার্তদের সাহায্য পাঠাতে। তার কাছে মানবিকতা কেবল শেখার বিষয় ছিল না, বরং নিজের চারপাশে বেড়ে ওঠার সময় সে যা দেখেছে, তা-ই তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

স্বজন ও শিক্ষকেরা জানান, তার বাবা-মা তাকে ঠিক এভাবেই বড় করতে চেয়েছিলেন।

অপ্রতিমের মা নাহিদা বেগম বলেন, ‘আমি আমার সন্তানকে মানুষের মতো মানুষ করতে চেয়েছিলাম। আমি চাইনি সে ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার হোক। আমি চেয়েছিলাম— সে মানুষের সাথে মিশবে, গান গাইবে, দেশ-বিদেশে ঘুরবে, বিভেদের ঊর্ধ্বে বড়-ছোট সবার সঙ্গে চলবে।’

তিনি বলেন, ‘অপ্রতিম সেভাবেই বড় হচ্ছিল। কিন্তু যাদের সে নিজের বড় ভাই মনে করত, তারা এতটাই অমানুষ, যে তাকে রেহাই দিল না।’  

সম্পর্কে অপ্রতিমের মামা মাহাবুব বলেন, পশু-পাখির প্রতি তার ছিল অনেক ভালোবাসা।

পরিবারের সদস্যরা জানান, কোনো শিক্ষার্থীর আর্থিক সমস্যা থাকলে অপ্রতিম তাদের বাবা-মায়ের কাছে নিয়ে আসত, যেন তারা সাহায্য পায়। তার এই মানবিকতার অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান জানান, অপ্রতিম হত্যায় গ্রেপ্তার তুহিন এবং ডেলিভারিম্যানসহ ১৫ বছর বয়সী দুই কিশোর ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তুহিনের বাড়ি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে আইফোনটি।

এ ছাড়া তথ্য গোপন করার অভিযোগে মো. সিয়াম (১৯) নামের আরেকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ১৫ বছর বয়সী দুই কিশোরকে গতকাল গাজীপুরে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ জানায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে পাহাড়ি নির্জন এলাকায় লাঠি দিয়ে আঘাত করে অপ্রতিমকে হত্যা করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানান, ২০২৪ সালের আন্দোলনের সময় নাহিদা নিজে আহত শিক্ষার্থীদের পাশে হাসপাতালে ছুটে গেছেন। চারপাশে এতকিছুর মধ্যেও তিনি তার শিক্ষার্থী ও নিজের সন্তানকে মানবিকতার পাঠ দেওয়া বন্ধ করেননি।

বছরের পর বছর ধরে অপ্রতিমকে ঘিরে থাকা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার আজ সেই পরিচিত মুখ হারিয়ে শোকস্তব্ধ। গন্ধমতি গ্রামের যে এলাকায় সে বড় হয়েছে, সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়েছে।

গতকাল তার বাড়িতে শত শত মানুষ ভিড় করেন নাহিদাকে সান্ত্বনা দিতে। এক সময়ের পরিচিত ও হাসিখুশি অপ্রতিম আজ স্মৃতি হয়ে গেছে। তবে যারা তাকে চিনতেন, তারা মনে করেন—নাহিদা যে মানবিক মূল্যবোধ তার ছেলের মধ্যে বুনেছিলেন, তা তার শিক্ষার্থীদের মাঝে বেঁচে থাকবে।