শিশু ধর্ষণ: অভিযোগ থেকে আদালত পর্যন্ত আইনি ব্যবস্থার ফাঁকে যত বাধা

নীলিমা জাহান
নীলিমা জাহান

ঘটনাটি রাজধানীর এক আইনজীবীর চেম্বারে কয়েকদিন আগের। এক মা আকুল হয়ে আকুতি জানাচ্ছিলেন সেখানে। কিন্তু ওই মায়ের সেই অনুরোধ আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল না বলে জানান আইনজীবী।

৬ বছর বয়সী মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছে, অভিযুক্ত বাবা। সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক বাবার বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন মেয়েটির নানি। এরপর বাবাকে গ্রেপ্তার করা হলে পরিবারটি চরম আর্থিক সংকটে পড়ে।

অভিযুক্ত স্বামীকে মামলা থেকে রেহাই দেওয়ার অনুরোধ নিয়ে আইনজীবীর কাছে যান সেই মা। 

আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার কাজ করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি)।

‘মেয়েটির মা মামলা প্রত্যাহারের জন্য আমার সাহায্য চাচ্ছিলেন। বলছিলেন যেকোনো ভাবে আমি যেন মামলাটি তুলে ফেলার ব্যবস্থা করি,’ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন তিনি।

‘তিনি বলছিলেন, তার সন্তান দুটি ছোট। তাদের নিয়ে তিনি কোথায় যাবেন? তার কথা হলো, স্বামী একটা ভুল করেছেন, কিন্তু জামিনে বের হয়ে পরিবারকে ঠিকঠাক চালানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।’

আইনজীবী ফাহমিদা তাকে জানান, আপস-মীমাংসা করে এই মামলা প্রত্যাহার হবে না।

তখন ওই মা আর কিছু না বলেই চলে যান।

আরেকটি ধর্ষণের ঘটনার কথাও জানান এই আইনজীবী। ১২ বছর বয়সী এক মেয়েকে ধর্ষণ করা হয়েছিল। মেয়েটি আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার পর তার বাবা আপস করে ফেলতে চান বিবাদী পক্ষের সঙ্গে।

ওই ঘটনায় অভিযুক্তের লোকজন প্রভাবশালী এবং তারা ভুক্তভোগী পরিবারটিকে বারবার মীমাংসা করতে চাপ দিচ্ছিল বলে জানান ফাহমিদা।

তিনি বলেন, ‘সেই বাবা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন, “আপা, ধরেন দুই বছর পর লোকটার সাজা হলো। ততদিন কি আমি জ্যান্ত থাকতে পারব”।’

এই ঘটনাগুলোর মধ্যে দিয়ে বোঝা যায় দেশে ধর্ষণের ঘটনায় শিশুদের ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা দিতে পুরো ব্যবস্থাটি এখন পর্যন্ত কার্যকর নয়। বিশেষ আইন, ট্রাইব্যুনাল ও আইন সংস্কার সত্ত্বেও অভিযোগ উপস্থাপন ও জরুরি সেবা থেকে শুরু করে তদন্ত, প্রসিকিউশন, বিচার পর্যন্ত যেকোনো সময় প্রক্রিয়াটি থেমে যেতে পারে। বিশেষ করে অভিযুক্ত যদি পরিবারের সদস্য বা নিজেদের আপন কেউ হয়, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে যায়।

হুমকি বা ভয়ভীতির কারণে এবং সাক্ষীর নিরাপত্তা, আর্থিক পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অভাবে বিচার চালিয়ে যাওয়ার চেয়ে মামলা প্রত্যাহার করাই অনেক সময় নিরাপদ মনে করে ভুক্তভোগী পরিবার।

এর কারণ হিসেবে আইনের দুর্বলতাকে দায়ী করতে রাজি নন আইন বিশ্লেষক ও গবেষক ফৌজুল আজিম। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের সাবেক এই বিচারকের মতে, এর জন্য দায়ী আইন প্রয়োগসহ পুরো প্রক্রিয়ার ভেতরকার গলদ।

ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘মামলা আদালতে পৌঁছানোর আগেই প্রমাণ নষ্ট হয়ে যেতে পারে, সাক্ষীরা উধাও হয়ে যেতে পারেন, পরিবারগুলো চাপের মুখে পড়তে পারে। এভাবেই শিশু নির্যাতনের বিচার কোনো না কোনো ধাপে আটকে যায়।’

‘যেহেতু তথ্য-প্রমাণের ওপর ভিত্তি করেই বিচারকদের রায় দিতে হয়, তাই অভিযুক্তের সাজা নিশ্চিতে শুধু কঠোর শাস্তির বিধান করলেই হবে না, বরং শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা, ফরেনসিক পরীক্ষা, প্রসিকিউশন, সাক্ষীর সুরক্ষা এবং শিশু-বান্ধব বিচারব্যবস্থা প্রয়োজন,’ বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, নির্যাতনকারী যদি আত্মীয় হন, তখন পরিবারটি আর শিশুর একমাত্র নিরাপত্তাদাতা হতে পারে না। এজন্য রাষ্ট্রকে বিকল্প অভিভাবকত্ব, আইনি প্রতিনিধিত্ব, আশ্রয় ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তার ব্যবস্থা করতে হয়।

‘শুধু দ্রুত বিচারই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত নয়। প্রয়োজন দ্রুত এবং যথাযথ বিচার প্রক্রিয়া, যেন শিশু আর কখনোই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে না পড়ে,’ বলেন ফৌজুল আজিম।

তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘবছর ধরে চলে আসা দুর্বল বিচার ব্যবস্থায় কোনোভাবেই বিচারিক সাফল্য আসবে না। বিচার চাইতে গিয়ে যেন আবার কোনো শিশু নিপীড়নের শিকার না হয়।’

বিশ্বাসই যখন হুমকি

শিশু-অধিকার সংস্থা ‘শিশুরাই সব’-এর ২০২৫ সালের একটি প্রতিবেদনে শিশু ধর্ষণের ঘটনায় প্রকাশিত ৩০৮টি সংবাদ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

এতে দেখা যায়, অভিযুক্তদের মধ্যে ৪০ দশমিক ৫৮ শতাংশ ছিল নিকট প্রতিবেশী, ২১ দশমিক ৪৩ শতাংশ পরিচিত, ১৪ দশমিক ৬১ শতাংশ শিক্ষক বা ধর্মীয় শিক্ষক, ১৩ দশমিক ৬৪ শতাংশ নিকটাত্মীয় এবং মাত্র ৯ দশমিক ৭৪ শতাংশ অপরিচিত।

এতে আরও দেখা যায়, যৌন নির্যাতনের সংবাদের ৫৯ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং ১২৪ শিশু হত্যার ঘটনার ৬৬ দশমিক ১২ শতাংশ ক্ষেত্রে ঘটনাস্থল নিজ বাড়ি।

বেসরকারি সংস্থা ‘ব্রেকিং দ্য সাইলেন্স’-এর নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘অভিযুক্ত আত্মীয় বা অভিভাবক হলে  পর্যাপ্ত তদারকির অভাব, “সমাজে মান-সম্মান” নিয়ে উদ্বেগ কিংবা আর্থিক পরিস্থিতির কারণে নির্যাতনের ঘটনা অনেকক্ষেত্রেই গোপন থেকে যায়।’

‘প্রায়ই যেটা দেখা যায় সেটা হলো, অভিযুক্ত হয়ত আপন কেউ। তখন পরিবারগুলো নীরব হয়ে যায়। এর ফলে নিপীড়ন চলতে থাকে এবং আমাদের কানে আসে সব থেকে গুরুতর অবস্থায়, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ধর্ষণের মতো ঘটনায়,’ বলেন তিনি।

ব্রেকিং দ্য সাইলেন্সের অ্যাডভোকেসি ম্যানেজার নাহিন জামান মৌরি প্রায় এক দশক ধরে শিশু সুরক্ষা নিয়ে কাজ করছেন কক্সবাজারে। তিনি জানান, নিম্ন-আয়ের পরিবারগুলোর ক্ষেত্রে একই ধরনের বাধা রয়েছে।

উদাহরণ হিসেব তিনি একটি পরিবারের কথা উল্লেখ করেন। কক্সবাজারের এক দিনমজুর তার বড় মেয়ের জামাইয়ের কাছে ২ লাখ টাকা দেনা ছিলেন। ওই জামাই শ্যালিকাকে ধর্ষণ করেন। যখন মেয়েটি অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে, তখন তারা যেন পুলিশের কাছে না যান, সেজন্য জামাই দেনা পরিশোধের চাপ ও স্ত্রীকে তালাকের হুমকি দেন। এতে পরিবারটি চুপ হয়ে যায়।

আরেকটি ঘটনায় দেখা যায়, মানসিক প্রতিবন্ধী এক মেয়েকে ধর্ষণ করে তার চাচা। এতে মেয়েটি অন্তঃস্বত্ত্বা হয়ে পড়ে ও সন্তানের জন্ম হয়। কিন্তু, চাচার সামাজিক অবস্থান এবং প্রতিশোধের ভয়ে পরিবারটি কোনো অভিযোগ করেনি বলে জানান নাহীন জামান।

জরুরি কলে সাড়াদানের পর মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা

এদিকে, নির্যাতন-নিপীড়নের অভিযোগ জানাতে সহায়তা পেতে বিভিন্ন দপ্তরের হেল্পলাইন বা জরুরি সেবা নম্বরে কল করে সাড়া মিললেও মাঠপর্যায়ে রয়েছে সমন্বয়হীনতা ও জবাবদিহির অভাব।

জাতীয় জরুরি নম্বর ৯৯৯-এ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ১৭৬টি শিশু ধর্ষণ, ১০৭টি ধর্ষণচেষ্টা, ১২৭টি পারিবারিক সহিংসতা এবং ৮২টি বিকৃত যৌন সহিংসতার ঘটনার কল এসেছে।

গত পাঁচ বছরে সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে ১০৯৮ চাইল্ড হেল্পলাইন নম্বরে ২৫ লাখ কল রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে ৬৪ হাজার ২৮৯টি কন্যাশিশুর প্রতি সহিংসতা এবং ৩৪ হাজার ৯৪৬টি বাল্যবিয়ে প্রতিরোধ সংক্রান্ত।

চাইল্ড হেল্পলাইনের ম্যানেজার চৌধুরী মো. মোহাইমেন ডেইলি স্টারকে বলেন, কন্যাশিশুদের মোবাইল ফোন ব্যবহার সীমিত হওয়ায় এবং সামাজিক চাপের কারণে সঠিকভাবে না জানানোর প্রবণতার ফলে শিশু নিপীড়নের তথ্য পাওয়া যায় না।

হেল্পলাইনের রেকর্ডেও এই বৈষম্য দেখা যায়। এতে নারী বা মেয়েদের চেয়ে পুরুষদের কাছ থেকে বেশি কল এসেছে বলে জানান তিনি। এই হেল্পলাইনে আসা কলের ৬০ শতাংশই পুরুষদের। এর মূল কারণ হলো কিশোরী মেয়েদের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ব্যবহারের সুযোগ খুব কম।

এদিকে, নির্যাতনের খবর পাওয়া গেলেও মাঠপর্যায়ে সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় ও রেফারেল ব্যবস্থা অত্যন্ত দুর্বল হওয়ায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয় না বলেও জানান মোহাইমেন।

শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষায় ইউএনওর সভাপতিত্বে উপজেলা পর্যায়ে শিশু কল্যাণ বোর্ড আছে। কিন্তু, মাঠপর্যায়ে স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ ও সমাজকল্যাণ কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে এ বোর্ডগুলো কীভাবে শিশুদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তার কোনো কেন্দ্রীয় তথ্য-ভাণ্ডার নেই বলে জানান তিনি।

এছাড়া, মাঠপর্যায়ে সমাজসেবা অধিদপ্তরের লোকবলের সংকটের কথাও জানান তিনি।

দেশে প্রতি ১ লাখ ৩ হাজার শিশুর জন্য প্রায় মাত্র একজন সমাজকর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। এতে উপজেলাগুলোতে নিরবচ্ছিন্নভাবে মামলা ব্যবস্থাপনা ও নজরদারি অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে বলে মনে করেন হেল্পলাইন ম্যানেজার মোহাইমেন।

সীমিত সহায়তা ব্যবস্থা

দেশের সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোর মোট ১৪টি ওসিসিতে এ বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে ০-১৮ বছর বয়সী ১ হাজার ৫৮০ শিশু-কিশোরী ধর্ষণের ঘটনার রিপোর্ট করেছে। আর জেলা পর্যায়ের ৬৭ ওসিসিতে গেছে ৫০৭ জন।

ওসিসিতে যাওয়া শিশু-কিশোরীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলেও, তাদের বড় অংশ কখনোই আনুষ্ঠানিক বিচার প্রক্রিয়ায় যায় না।

২০২৪ সালের জুলাই পর্যন্ত এসব কেন্দ্রে সহায়তা পাওয়া ৬৬ হাজার ৭১১ নারী ও শিশুর মধ্যে সরকারি তথ্যমতে মাত্র ২০ হাজার ৯১৪ জনের ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক মামলা করা হয়েছে।

সংখ্যার এই বিশাল ব্যবধানের পেছনে হুমকি, পারিবারিক চাপ, সাক্ষীর অভাব ও আদালতের বাইরে জোরপূর্বক মীমাংসার কথা জানিয়েছেন ওসিসি কর্মীরা।

অন্যদিকে, ওসিসি, ক্রাইসিস সেল, জাতীয় ডিএনএ প্রোফাইলিং ল্যাবরেটরির আইন কর্মকর্তা, মানসিক পরামর্শক, ফরেনসিক টেকনিশিয়ানসহ ৩৭৩ কর্মী ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে বেতনই পাননি। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগের পর তাদের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণে প্রশাসনিক বিলম্বের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

ঢামেক ওসিসির আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার তার অভিজ্ঞতা থেকে জানান, প্রায়ই দেখা যায় বাবা, চাচা বা সৎ-বাবার মতো নিকটাত্মীয়রা ধর্ষণ করলে পরিবারের তা গোপন করার প্রবণতা থাকে এবং তারা শুধু চিকিৎসা নিয়ে চলে যেতে চান, মামলা করতে আগ্রহী হন না।

আবার, ধর্ষণের ঘটনার বিষয়ে দেরিতে জানানো এবং শুরুতেই পরিবারের হস্তক্ষেপের কারণে ফরেনসিক প্রমাণ অনেকক্ষেত্রেই নষ্ট হয়ে যায়।

ফাহমিদা বলেন, ‘হাসপাতালে আনার আগে পরিবারের লোকজন শিশুকে গোসল করালে বা জামাকাপড় ধুয়ে ফেললে গুরুত্বপূর্ণ জৈবিক ও ডিএনএ প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়।’

‘চিকিৎসকরা শারীরিক পরীক্ষার সময় আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করতে পারলেও, মেলানোর মতো ডিএনএ না থাকায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আদালতে সন্দেহাতীতভাবে অপরাধ প্রমাণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে,’ বলেন তিনি।

সুরক্ষা শুধু কাগজ-কলমেই

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্টের মধ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ৪ হাজার ৪৬৫টি মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে শিশু ধর্ষণ মামলা ১ হাজার ৭১৫টি।

এসব মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রশাসনিক বাধাগুলো সম্পর্কে জানান পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশনস) কামারুম মুনিরা। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘দেরিতে ঘটনা জানানো, গোসল কিংবা জামাকাপড় ধুয়ে ফেলার কারণে অনেক সময়ই প্রমাণ নষ্ট হয়। অন্যদিকে আদালতের বাইরের আপস এবং নিরপেক্ষ সাক্ষীর অভাবে বিচার প্রক্রিয়া অনেকাংশে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে দুর্বল ফরেনসিক রিপোর্টের ওপর।’

এগুলো সমাধানের জন্য শিশু আইন ২০১৩ অনুযায়ী ৬৬১ থানায় ‘চাইল্ড হেল্প ডেস্ক’ বসানো হয়েছে বলে জানান তিনি। এই ডেস্কের কর্মকর্তাদের যাচাইকৃত ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহ, জবানবন্দি নিখুঁতভাবে নথিভুক্ত এবং হুমকির মুখে থাকা সাক্ষীদের সুরক্ষা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

এরপরও একটি বড় সমস্যা রয়ে গেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও ব্র্যাকের ২০২৬ সালের এক যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিটি ধর্ষণের ঘটনা তদন্তে গড়ে ১৫২ দিন সময় লেগেছে, যা আইনে নির্ধারিত ১৫ দিন সীমার চেয়ে অনেক বেশি। আর, আদালতে তালিকা দেওয়া প্রতি ৭ জন সাক্ষীর মধ্যে মাত্র ২ জন গিয়ে সাক্ষ্য দিয়েছেন।

বিচারে দীর্ঘসূত্রতা

ওই যৌথ গবেষণায় দেশের ৩২ জেলায় নিষ্পত্তি হওয়া ৪ হাজার ৪০টি মামলা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এর মধ্যে ১ হাজার ১৯৩টি বা ২৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ মামলায় দেখা গেছে ১৮ বছরের কম বয়সীদের ধর্ষণ করা হয়েছে, যার মধ্যে মাত্র ২ বছরের শিশুকন্যাও আছে।

সংশোধিত আইনে ধর্ষণের বিচারের জন্য ৯০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া থাকলেও মামলাগুলো নিষ্পত্তিতে গড়ে সময় লেগেছে ১ হাজার ৩৭০ দিন বা প্রায় সাড়ে ৩ বছরের বেশি। গড়ে প্রতি মামলায় শুনানি হয়েছে ২২টি।

এর মধ্যে মাত্র ৩ শতাংশ মামলায় সাজা বা দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। আর ৭০ দশমিক ২ শতাংশ মামলায় অভিযুক্ত খালাস পেয়েছে এবং ১৩ দশমিক ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে আপস হয়েছে। পর্যালোচনা করা মামলাগুলোর মধ্যে ১৫ জেলায় কোনো অভিযুক্তের সাজা হয়নি।

অভিযোগপত্র জমা দেওয়ার পর অভিযোগ গঠনে গড়ে আরও ৩৪৬ দিন সময় লেগেছে, আর অভিযোগ গঠন থেকে রায় পর্যন্ত লেগেছে ৯৬৩ দিন।

ফৌজুল আজিম বলেন, ‘বিচারক তো প্রসিকিউটর নন। যখন তদন্তকারীরা প্রমাণ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হন বা প্রসিকিউটররা প্রধান সাক্ষীদের হাজির করতে ব্যর্থ হন, তখন প্রসিকিউশনের মামলা দাঁড় করিয়ে দিতে পারেন না আদালত।’

‘তাই সাজা নিশ্চিতের ক্ষেত্রে তদন্তকাজ কেমন চলছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, বিচারিক নিরপেক্ষতা মানে নিষ্ক্রিয়তা হওয়া উচিত নয়,’ যোগ করেন তিনি।

মামলার কাজে যেন দেরি না হয় সেজন্য তিনি মামলা ব্যবস্থাপনা, অপ্রয়োজনীয় স্থগিতাদেশের সীমা, গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের নির্ধারিত দিনে উপস্থিতি এবং তদন্তের সময়সীমা, চার্জশিট জমা, সাক্ষীর উপস্থিতি, ফরেনসিক রিপোর্ট ও স্থগিতের কারণ ডিজিটালভাবে ট্র্যাক করার পাশাপাশি প্রসিকিউটরদের বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের তাগিদ দিয়েছেন।

আরও যা প্রয়োজন

শিশুর সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার শুধু পুলিশিং এবং ফৌজদারি বিচারের বাইরেও প্রসারিত করতে হবে বলে মনে করেন ‘শিশুরাই সব’ সংস্থাটির কনভেনর লায়লা খন্দকার।

আন্তর্জাতিক কাঠামোর উল্লেখ করে তিনি জানান, অস্ট্রেলিয়ায় সম্ভাব্য নির্যাতনের তথ্য নির্দিষ্ট পেশাজীবীরা আইনিভাবে জানাতে বাধ্য। যুক্তরাজ্যে শিশু কোনোভাবে আক্রান্ত হলে অনুসন্ধান করা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের আইনি দায়িত্ব।

লায়লা বলেন, ‘এ ধরনের ব্যবস্থা থাকলে ঝুঁকি যাচাই, মামলা পরিচালনা, সামাজিক কার্যক্রমের হস্তক্ষেপ এবং সমন্বিত সামাজিক-মানসিক সেবা ও সুরক্ষার আওতা আরও বেড়ে যায়।’

২০১৩ সালের শিশু আইনে বিধান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে শিশুদের জন্য সমন্বিত সুরক্ষা ব্যবস্থার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন লায়লা খন্দকার। এ সমস্যা উত্তরণে তিনি নির্যাতনের তথ্য জানানো ও রেফারেল ব্যবস্থার প্রক্রিয়া সহজ করা, বিশেষায়িত সামাজিক কর্মী এবং পুলিশ, সমাজকল্যাণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও বিচার বিভাগের মধ্যে আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের জোর দাবি জানান।

‘কোনো পরিবার আপস করার সিদ্ধান্ত নিলেও, শিশুর সুরক্ষা ও ন্যায়বিচারের দায় থেকে রাষ্ট্রকে অব্যহতি দেওয়া যায় না,’ বলেন তিনি।