জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৪টি অধ্যাদেশ বাতিল করতে (রহিত) সংসদে বিল আনার সুপারিশ করেছে জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি।
এ ছাড়া, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশসহ ১৬টি অধ্যাদেশ এখনই বিল আকারে উত্থাপন না করার সুপারিশ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রে পরবর্তী সময়ে যাচাই–বাছাই করে অধিকতর শক্তিশালী করে নতুন বিল উত্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। এটি হলে এ অধ্যাদেশগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে। আগামী ১০ এপ্রিলের পর এগুলো কার্যকারিতা হারাবে। সব মিলিয়ে মোট ২০টি অধ্যাদেশ কার্যকারিতা হারাচ্ছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ যাচাই–বাছাই করে গত বৃহস্পতিবার এসব সুপারিশসহ সংসদে প্রতিবেদন দেয় জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। গতকাল সন্ধ্যায় কমিটির সভাপতি জয়নুল আবদিন ফারুক সংসদে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন।
মানবাধিকার কমিশনের ইতিহাস
বাংলাদেশে নব্বইয়ের দশকের মধ্যভাগ থেকেই জাতীয় মানবাধিকার কমিশন প্রতিষ্ঠার জন্য জোর আলোচনা শুরু হয়। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর এ প্রক্রিয়া গতি পায়। সেই সরকারের অধীন ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০০৭’ জারি করা হয়। এর মাধ্যমে কমিশনের আইনি ভিত্তি তৈরি হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কমিশন আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় এবং চেয়ারম্যান ও সদস্যদের নিয়োগ দেওয়া হয়।
পরে ২০০৯ সালের ৪ জুলাই নবম জাতীয় সংসদে ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন, ২০০৯’ পাস হয়, যা পূর্ববর্তী অধ্যাদেশকে আইনি রূপ দেয়। এই আইনের অধীনেই ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত কমিশন কাজ করে। যদিও এর সীমাবদ্ধতা ও অকার্যকারিতা নিয়ে প্রচুর কথা রয়েছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি নতুন মোড় নেয়। ওই বছরের ৭ নভেম্বর অন্তর্বর্তী সরকার কমিশন অবলুপ্ত করে। এরপর ২০২৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর নতুন ‘খসড়া জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রকাশ করা হয়। ৯ নভেম্বর তা গেজেট আকারে জারি হয় এবং ৮ ডিসেম্বর সংশোধিত অধ্যাদেশ প্রকাশিত হয়। এ পুরো সময়জুড়ে কোনো কমিশন ছিল না।
স্বাধীনতা খর্ব হওয়ার আশঙ্কা
এ বিষয়ে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সদস্য মো. নূর খান বলেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা মানবাধিকার কমিশনসংক্রান্ত অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে পাস না হলে সেটি বাতিল বলে গণ্য হবে। সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রীরা যেসব কথা বলছেন, তাতে স্পষ্ট যে এটি উত্থাপন করা হবে না। আর অধ্যাদেশটি সংসদে উত্থাপন ও পাস না হলে এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত কমিশনও কার্যত বহাল থাকবে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অধ্যাদেশে পাঁচজন সদস্য এবং তাদের নির্বাচন, মনোনয়ন ও নিয়োগ দেওয়ার যে কাঠামো ছিল—তার সবই অনুপস্থিত হয়ে যাবে। এ ছাড়া, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং বিভিন্ন বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থার বিষয়ে অনুসন্ধানের যে ক্ষমতা ছিল, সেটিও রহিত হবে। ফলে কমিশন স্বাভাবিকভাবেই আগের অবস্থায় অর্থাৎ ২০০৯ সালের আইনে ফিরে যাবে।’
নূর খানের মতে, সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে যে পরে আরও আলাপ-আলোচনা ও পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে নতুন করে আইনটির প্রস্তাব করা হবে। তখন সরকারের দৃষ্টিতে মানবাধিকার কমিশনের কার্যক্রম কীভাবে পরিচালিত হওয়া উচিত, তার ওপর ভিত্তি করে পরিমার্জিত রূপে এটি সংসদে পেশ করা হবে।
মানবাধিকারকর্মীদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে এই মানবাধিকারকর্মী বলেন, ‘ভবিষ্যতে এই কমিশনের স্বাধীনতা থাকবে, নাকি খর্ব করা হবে—সেটি এখনই বলা কঠিন। মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেটি আর বহাল থাকছে না। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কীভাবে আইনটি করা হবে, তার ওপরই সব নির্ভর করছে। ফলে ভবিষ্যতে এর স্বাধীনতা খর্ব হতে পারে বলে মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারপারসন, সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ে কমিশন থেকে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে শিগগিরই সংবাদ সম্মেলন করে বিস্তারিত জানানো হবে।’