তেল সংকট, থেমে গেছে চাকা—চরের মানুষের জীবনে দুর্ভোগ
প্রযুক্তির ছোঁয়ায় দ্রুত বদলে যাওয়া চরের জীবনে আবারও ধীরে ধীরে ফিরে আসছে হাজার বছরের স্থবিরতা। জ্বালানি তেলের তীব্র সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে প্রান্তিক এই জনপদের বেশিরভাগ যান্ত্রচালিত যানবাহন। সেচের খরচ বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা তাকিয়ে আছেন বৃষ্টির দিকে। চলতি মৌসুমে নিজেদের উৎপাদিত ভুট্টা, গম, ধানসহ নানা চৈতালি ফসল শহরে পৌঁছাতে আবারও প্যাডেলচালিত যানবাহনই হয়ে উঠছে একমাত্র ভরসা।
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী দুটি ইউনিয়ন—রামকৃষ্ণপুর ও চিলমারির প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবনে নেমে এসেছে এমন দুর্ভোগ। অথচ হেরিংবন সড়ক, শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি ও মোটরসাইকেলের চাকার ওপর ভর করেই কয়েক বছরের প্রচেষ্টায় চরের অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন এনেছিলেন এখানকার পরিশ্রমী মানুষজন।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভারতীয় সীমান্তবর্তী এই দুই ইউনিয়নে পৌঁছাতে কুষ্টিয়া শহর থেকে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ৪০ কিলোমিটার পথ। প্রথমে দৌলতপুর উপজেলা সদর, সেখান থেকে তারাগুনিয়া-হোসেনাবাদ হয়ে আবেদের ঘাট। এরপর শুরু হয় পানি আর বালির পথ। পদ্মার বুক চিরে গড়ে ওঠা দুর্গম পথ ধরে আরও পাঁচ-ছয় কিলোমিটার অতিক্রম করে পৌঁছাতে হয় চিলমারির বাজারে।
আবেদের ঘাট থেকে চিলমারি যাওয়ার পথে চোখে পড়ে তেলের বোতল হাতে ছুটে চলছেন অসংখ্য মানুষ। জানতে চাইলে প্রায় সবাই বলেন, তেল আনতে শহরে যাচ্ছেন। স্থানীয় বাজারে ডিজেলের দাম উঠেছে লিটারপ্রতি ১৬০ টাকা। ধান বাঁচাতে অন্তত ৫ কিলোমিটার হেঁটে গঞ্জের বাজারে গিয়েও চাহিদামতো তেল পাওয়া যাচ্ছে না। কিছুদিন আগেও মোটরসাইকেলে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া দিয়ে সহজেই পৌঁছানো যেত আবেদের ঘাট বা ভাগজোত ঘাটে। কিন্তু পেট্রোলের দাম বেড়ে প্রতি লিটার ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায় পৌঁছানোয় সেই মোটরসাইকেল চলাচলও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।
পথে দেখা হয় দুই তরুণ—আরিফুল ইসলাম ও তারিফ হোসেনের সঙ্গে। দুটি বোতল হাতে তারা তারাগুনিয়ায় যাচ্ছিলেন। গন্তব্য জানতে চাইলে কিছুটা লজ্জিত ভঙ্গিতে আরিফ বলেন, ‘তেল আনতে যাচ্ছি। আমাদের বাড়ি বাহিরমাদি। সেখান থেকে হেঁটেই পাঁচ-ছয় কিলোমিটার এসেছি। এখন আবেদের ঘাট থেকে গাড়িতে করে পাম্পে যাব।’
আরিফ দ্য ডেলি স্টারকে বলেন, ‘আগে প্রতি লিটার তেল ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় পেতাম। এখন তা ১৬০ টাকা। দেড় বিঘা জমিতে প্রতি সপ্তাহে তেলের খরচ প্রায় ৩০০ টাকার মতো বেশি হচ্ছে। আবার ধান পাকতে শুরু করেছে। এই সময় পানি দেওয়া বন্ধ করলে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই কষ্ট হলেও যেতে হবে।’
চরের ভেতর যতটা পথ পাড়ি দেওয়া যায়, সর্বত্রই তেলের জন্য হাহাকার চোখে পড়ে। জমি চাষের ট্রাক্টর কিংবা ভুট্টা ও অন্যান্য চৈতালি ফসল ঘরে তুলতে ব্যবহৃত ট্রলির জন্যও পর্যাপ্ত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। অনেক সময় মাঠেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এসব যান।
বাহিরমাদি বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার আগে নদীর একটি সরু শাখা পেরিয়ে চোখে পড়ে বাঁশ-কাঠের তৈরি একটি টং দোকানে ঘাটের ভাড়া আদায় করা হয়। সেখানে এক নারী যাত্রী মোটরসাইকেল থেকে নেমে আসেন। তিনি এসেছেন চিলমারি থেকে। নিয়মিত ভাড়া ১০০ টাকা হলেও বাড়তি ২০০ টাকা ভাড়া দিয়ে তিনি বিরক্ত মুখে চলে যান। এ সময় মোটরসাইকেল চালক বলেন, ‘তেল কিনছি ৪০০ টাকা লিটার। ভাড়া তো বাড়বেই।’ পাশে থাকা একজন বলেন, ‘আমাদের ওখানে তেল ৩৫০।’
বাহিরমাদি থেকে চিলমারি যাওয়ার পথে বাজুমারায় দেখা হয় কৃষক গনি মোল্লার সঙ্গে। রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বসতি ছেড়ে ৫৩ বছর পর তিনি ফিরে এসেছেন বাপ-দাদার ভিটায়। তখন তিনি ধানক্ষেতে পানি দেওয়ার জন্য শ্যালো ইঞ্জিন চালু করছিলেন। গনি মোল্লা বলেন, খাওয়ার জন্য এক বিঘা ধান চাষ করছি। কিন্তু তেলের যে দাম, তাতে খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি হয়ে যাবে। তারপরও ফসল বাঁচাতে হবে। তেলের দাম যাই হোক, ফসল তো নষ্ট করা যায় না।
মঙ্গলবার দুপুরে চিলমারি বাজারে গিয়ে চায়ের দোকানে মানুষের ভিড় দেখা যায়। যারা মোটরসাইকেল বা ট্রলি চালকেরা এখন অলস সময় কাটাচ্ছেন। চা বিক্রেতা রাজিব বলেন, ‘পেট্রোল কিনতে হয় ৪০০ টাকা লিটার। তাই মোটরসাইকেল চালানো ছেড়ে চায়ের দোকানে বসেছি। এতো দামে তেল নিয়ে গাড়ি চালালে মানুষ ঠকাতে হয়, নিজেরও পোষায় না।’
আলাপচারিতার মাঝেই নুরু মণ্ডল বলেন, ‘এখন বড় বড় নেতারাও তেল বিক্রি করছে। বরাদ্দ জুলুম করে এনে নিজেরাই কালোবাজারি করছে।’ তবে তার এই বক্তব্যে অন্যরা তাকে বিপদের আশঙ্কায় থামিয়ে দেন। তবুও সবাই একমত—এখানে একটি বড় ধরনের কালোবাজার গড়ে উঠেছে। তারা জানান, কেউ হঠাৎ অসুস্থ হলে সামান্য তেল জোগাড় করতেও একাধিক জায়গায় দৌড়াতে হচ্ছে। এই অবস্থা দীর্ঘস্থায়ী হলে চরের জীবনে নতুন করে আরও অস্বস্তি নেমে আসবে।
চিলমারি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নানের সঙ্গে কথা হয় বাজারের একটি চায়ের দোকানে। তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমাদের কথা কেউ শুনছে না। ডিসি, ইউএনও, এসিল্যান্ড—সবাইকে জানিয়েছি। প্রত্যয়নপত্রও দিয়েছি। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। এখন ভুট্টার মৌসুম, চরে প্রচুর ভুট্টা হয়েছে। এগুলো পরিবহনের জন্য একটি ট্রলির দিনে অন্তত ৫০ লিটার তেল দরকার হলেও দেওয়া হচ্ছে মাত্র ১০ লিটার। ফলে মাঠে গিয়ে ট্রলি আর ফিরতে পারছে না। এভাবে কি হয়?’
তিনি আরও বলেন, ‘এই মৌসুমে মানুষ ভিটা বাঁধে, রাস্তাঘাটে মাটি তুলি। কিন্তু ভেকু চালানোর মতো তেল নেই। এসব বন্ধ হয়ে গেলে আমরা আবার আগের যুগে ফিরে যাব।’
পুরোনো দিনের স্মৃতি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘একসময় এখানে কোনো সড়কই ছিল না। মহিষের গাড়ি, ঘোড়ার গাড়িই ছিল ভরসা। পরে সরকারি সহায়তা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ার বন্ধুদের সহযোগিতায় ১০ কিলোমিটার হেরিংবন সড়ক করেছি। এখন তেল না থাকলে সেই সড়কও অব্যবহৃত হয়ে পড়ছে।’
চিলমারি থেকে রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়নের পথে ভাগজোত ঘাটে পৌঁছালে দেখা যায় টোল আদায়কারী মনিরুল ইসলাম অলস সময় কাটাচ্ছেন। মাঝে মাঝে দুয়েকটি ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বা মোটরসাইকেল আসছে। তিনি বলেন, ‘যানবাহনের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। বিদ্যুতের সমস্যা হলে অটোরিকশাও বন্ধ হয়ে যাবে।’
এই ঘাটে একটি সেতুর দাবি তুলেছেন স্থানীয়রা। মনোয়ার নামে এক ব্যক্তি বলেন, ‘আমাদের ভাগজোতে একটা ব্রিজ করে দেন, আমরা শহরের মানুষের চেয়েও ভালো থাকব।’
তিন মাস জল আর নয় মাস স্থলপথ নির্ভর এই জনপদের জন্য একটি সেতু হতে পারে নতুন সম্ভাবনার সূচনা।
উপজেলা প্রশাসনের হিসাবে এই দুটি ইউনিয়নে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাস। তবে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, সংখ্যা অন্তত ৫০ হাজার। সঠিক জনসংখ্যা যাই হোক, কৃষি পরিসংখ্যান বলছে, এই এলাকা কুষ্টিয়ার অন্যতম শস্যভাণ্ডার। এখানে ধান, গম, ভুট্টা, কলা, পাট, চীনা বাদামসহ নানা চৈতালি ফসল ও সবজি উৎপাদিত হয়। এখান থেকে কাঁচা মরিচের বড় একটি সরবরাহও আসে।
দৌলতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রেহেনা পারভীন ডেইলি স্টারকে জানান, এই দুই ইউনিয়নে কৃষিজমির পরিমাণ ৬ হাজার ৪৯১ হেক্টর।
তিনি বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ না থাকায় এ বছর ভুট্টা, পেঁয়াজ ও গমের ভালো ফলন হয়েছে। ধানের ফলনও ভালো হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, ‘এই দুটি ইউনিয়ন জেলার মোট উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আমরা কৃষকদের পাশে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি।’
এ বিষয়ে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনিন্দ্য গুহ বলেন, ‘আমরা ফিলিং স্টেশন ও ডিলারদের নজরদারিতে রেখেছি। প্রথম দিকে তারা বেশি দামে বিক্রি করলে জরিমানাও করেছি। এখন এক শ্রেণির মানুষ ৩-৪ লিটার করে তেল কিনে চরে এনে বেশি দামে বিক্রি করছে। পরে দোকানদাররা তা ৩০০-৪০০ টাকায় বিক্রি করছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘দুর্গম এলাকা হওয়ায় ছোট ছোট দোকানে বিক্রি হওয়া এসব তেল সবসময় নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। এটাও আমাদের ব্যর্থতা। চরের মানুষ সাধারণত মধুরাপুর থেকে তেল নেয়। সেখানে আমরা মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছি। বিষয়টি আরও গুরুত্ব দিয়ে দেখার চেষ্টা করব।’