বাগেরহাট

কুকুরকে কামড়ে নিলো কুমির: ঘটনা তদন্তে প্রশাসন, মরদেহের নমুনা পাঠানো হলো ঢাকায়

নিজস্ব সংবাদদাতা, বাগেরহাট

বাগেরহাটে ঐতিহাসিক খান জাহান আলি (রহ.) মাজারের দিঘিতে একটি কুমির কুকুরকে কামড়ে নিয়ে যাওয়ার ঘটনা তদন্তে ৩ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে জেলা প্রশাসন।

আজ শনিবার বিকেলে বাগেরহাট জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন দ্য ডেইলি স্টারকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

কমিটির প্রধান করা হয়েছে বাগেরহাট সদরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আতিয়া খাতুনকে। কমিটিতে আরও আছেন সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ও সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।

কুমিরের কামড়ে মারা যাওয়ার পর কুকুরটিকে গত বুধবার কবর দেওয়া হলেও, বিতর্কের মুখে আজ শনিবার বিকেলে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তত্ত্বাবধানে কুকুরটির ময়নাতদন্ত করা হয় বলে স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে।

পাশাপাশি কুকুরটি কোনো রোগে আক্রান্ত ছিল কি না, তা জানতে মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মাজারের দিঘির পাড়ের ওই ঘটনাটি গত বুধবার বিকেলের। এ ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।

ভিডিওতে দেখা গেছে, কুকুরটি দীঘির পাড়ে। মনে হচ্ছিল, কুকুরটি হাঁটতে পারছিল না। কিছুক্ষণ পর কুমিরটি এসে কুকুরটিকে কামড়ে পানির নিচে নিয়ে যায়।

প্রাণী অধিকার কর্মীসহ অনেকের অভিযোগ, কুকুরটিকে বেঁধে মাজারের দিঘির কুমিরের খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছে।

তবে প্রত্যক্ষদর্শী ও মাজার কর্তৃপক্ষের দাবি, কুকুরটিকে বেঁধে পানিতে কুমিরের সামনে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। কুকুরটি অসুস্থ ছিল এবং পানিতে নামার আগে বেশ কয়েকজনকে আক্রমণ করেছিল।

মাজার সূত্র জানায়, দিঘিতে বর্তমানে ‘ধলাপাহাড়’ নামে একটি কুমির রয়েছে।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা দ্য ডেইলি স্টারকে জানান, দিঘির ঘাট থেকে কুকুরটিকে ছোঁ মেরে নিয়ে যায় কুমিরটি।

মাজারের খাদেমদের নিয়োগ করা নিরাপত্তা প্রহরী ফোরকান হাওলাদার ডেইলি স্টারকে বলেন, 'বাইরে থেকে একটা কুকুর এসে অনেককে কামড়ায়। দিঘির ঘাটে এসে আমাকে কামড়ায়। এরপর অন্য এক দর্শনার্থীকে কামড়ানোর চেষ্টা করলে আমি কুকুরটিকে পা দিয়ে সরিয়ে দেই। তখন সে পানিতে পড়ে যায়। তখন কুমিরটি এসে কুকুরটিকে কামড়ে ধরে নিয়ে যায়।'

তিনি আরও বলেন, 'কুকুরটির পা বেঁধে কুমিরের সামনে ছেড়ে দেওয়ার তথ্যও মিথ্যা। ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরের পা বাধা ছিল না।'

দিঘির নারীদের ঘাটের পাশের দোকানদার বিনা আক্তারও একই কথা বলেন। তার ভাষ্য, 'সেদিন কুকুরটি একটি তিন বছরের এক শিশুকেও আক্রমণ করে। তিনটি মুরগি মেরে ফেলে।'

তার দাবি, মানুষ এখন কুকুরটিকে নিয়ে মিথ্যা গল্প বানাচ্ছে।

ঘটনার প্রায় ৩০ মিনিট পর কুকুরের দেহাবশেষ উদ্ধার করে মাটিচাপা দেয় মাজার কর্মীরা।

মাজারের প্রধান খাদেম ফকির তরিকুল ইসলাম ডেইলি স্টারকে বলেন, 'এ ঘটনা নিয়ে অপপ্রচার এবং এআই দিয়ে তৈরি ভিডিও ছড়ানোর অভিযোগে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।'

'কেউ কুকুরটিকে পানিতে ফেলে দেয়নি, সেটি নিজেই নেমেছিল,' বলেন তিনি।

জানতে চাইলে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মোহাম্মদ সাহেব আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, 'কুকুরটির মাথা পরীক্ষার জন্য ঢাকার কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারে নমুনা পাঠানো হয়েছে। কুকুরটি জলাতঙ্ক বা অন্য কোনো রোগে আক্রান্ত ছিল কি না, তা আমাদের নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।'

জেলা প্রশাসক গোলাম মো. বাতেন ডেইলি স্টারকে বলেন, 'আমার জানামতে, কুকুর নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে তা ভিত্তিহীন। তবে ভক্তরা মাঝে মাঝে কুমিরের জন্য দিঘিতে মুরগি ছুড়ে দিতে চান। এমনও হয় যে মুরগি ছুড়ে দেওয়ার পর প্রায়ই সাঁতরে পাড়ে ফিরে আসে।'

তিনি আরও বলেন, 'দিঘিতে জীবন্ত প্রাণী ছুড়ে দেওয়ার এই কুসংস্কার অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। আমি মাজারের খাদেম ও রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বরতদের নির্দেশ দিয়েছি যেন কুমিরের খাবার হিসেবে দিঘিতে কোনো জীবন্ত প্রাণী ছুড়ে দেওয়া না হয় এবং তারা যেন এ বিষয়ে সতর্ক থাকেন।'

'কুমিরের আক্রমণের কারণে সম্ভাব্য আঘাত ছাড়া কুকুরটির দেহে অন্য কোনো আঘাতের চিহ্ন আছে কি না, প্রশাসন তাও পরীক্ষা করে দেখছে। তদন্ত কমিটি সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলবে এবং প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে দ্রুত একটি প্রতিবেদন জমা দেবে,' বলেন জেলা প্রশাসক।

প্রতিবেদন অনুযায়ী যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে জানিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুল তথ্য ছড়ানোর বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মো. বাতেন।

উল্লেখ্য, মাজারের দিঘিতে হজরত খান জাহান আলি (রহ.) এর আমলের আদি কুমিরগুলো এখন আর নেই। বর্তমানে দিঘিতে থাকা কুমিরটি ২০০৫ সালে ভারতের মাদ্রাজ থেকে আনা হয়েছিল।