গাজীপুরে লোডশেডিংয়ে শিল্প উৎপাদন ব্যাহত, তীব্র গরমে দুর্বিষহ জনজীবন

নিজস্ব সংবাদদাতা, গাজীপুর

তীব্র গরমের সঙ্গে গাজীপুর মহানগর ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে লোডশেডিং। দিনে-রাতে দফায় দফায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে জনজীবন।

একইসঙ্গে ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় ক্ষতির মুখে পড়েছে শিল্প-কারখানা ও ব্যবসা-বাণিজ্য।

নগরীর টঙ্গী, গাজীপুর সদর, জয়দেবপুর, চান্দনা চৌরাস্তা, বোর্ডবাজার, কোনাবাড়ী, কাশিমপুর, গাছা, পূবাইল, টঙ্গী পূর্ব ও পশ্চিমসহ বিভিন্ন এলাকায় এক থেকে দেড় ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও এক ঘণ্টা, কোথাও দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকছে।

জেলার কাপাসিয়া শ্রীপুরে কালিগঞ্জ কালিয়াকৈর এলাকায় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দিনের বিভিন্ন সময়ে চার থেকে পাঁচবার পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শিল্প-কারখানাগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট মারাত্মক প্রভাব ফেলছে।

গাজীপুরের এসপিএম ডিজাইন লিমিটেডের অ্যাডমিন ম্যানেজার ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘আমাদের কারখানায় প্রায় এক হাজার শ্রমিক কাজ করেন। লোডশেডিংয়ে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ হচ্ছে, ফলে কারখানা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।’

শ্রীপুর উপজেলার বৈরাগীরচালা গ্রামের মুমতাহিনা ফুডস অ্যান্ড অয়েলস মিলের মালিক আব্দুস সাত্তার ভূঁইয়া জানান, গত কয়েক সপ্তাহে লোডশেডিংয়ের কারণে তার কারখানায় তেল উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সরিষা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন ব্যাহত হয়। তিনি নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার দাবি জানান।

গাজীপুর সদর এলাকার শিক্ষক মাওলানা ফাইজ উদ্দিন বলেন, ‘দিন ও রাতের অধিকাংশ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পরীক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়েছে।’

মাওনা এলাকার ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাচালক রায়হান (১২)। মা ও বোনকে নিয়ে তার পরিবারের অন্ন সংস্থানের জন্য এই ছোট বয়সেই রিকশা চালাতে হয় রায়হানকে। দ্য ডেইলি স্টারের সঙ্গে আলাপকালে সে বলে, ‘বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাটারি চার্জ দিতে পারি না। ফলে রিকশা নিয়ে বের হতে পারছি না। পরিবার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।’

গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ঘন ঘন লোডশেডিং ও অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের প্রতিবাদে গত বৃহস্পতিবার পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করে বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। উপজেলার মৌচাক পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জোনাল অফিসের সামনে এ ঘটনা ঘটে।

বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের দাবি জানান।

প্রতিবাদ সভায় হাফেজ মাওলানা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এক সপ্তাহ ধরে আমরা নিয়মিত বিদ্যুৎ পাচ্ছি না। দিনে ঘণ্টা পরপর বিদ্যুৎ আসে, তাও মাত্র ১০ মিনিটের জন্য। বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। শ্রমিকরা ডিউটি শেষে ঠিকমতো বিশ্রামও নিতে পারছেন না।’

ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ এর মৌচাক জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোহাম্মদ রফিকুল আজাদ বলেন, ‘এলাকাবাসী অফিস ঘেরাও করেছিল। পরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের আশ্বাস দিলে তারা কর্মসূচি প্রত্যাহার করে চলে যান।’

তিনি বলেন, ‘মৌচাক ও বান্নারা এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট হলেও সরকারি বরাদ্দ অনুযায়ী মাত্র ৩২ মেগাওয়াট সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এটি জাতীয় সমস্যা। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং এড়ানো যাচ্ছে না। অনেক কারখানার মালিক আমাদের জানিয়েছেন, লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং নির্ধারিত সময়ে পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় তারা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন।’

ময়মনসিংহ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এর শ্রীপুর জোনাল অফিসের জেনারেল ম্যানেজার আনোয়ারুল আলম জানান, শ্রীপুর উপজেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা ১৮০ মেগাওয়াট। এর মধ্যে শ্রীপুর জোনাল অফিসের আওতায় চাহিদা ৪০ মেগাওয়াট। বর্তমানে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ লোডশেডিং করতে হচ্ছে।

গতকাল জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, কারিগরি ত্রুটির কারণে দেশের দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ঢাকাসহ দেশের অন্যান্য এলাকায় বাধ্য হয়ে লোডশেডিং দিতে হচ্ছে।

জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, বিদ্যুৎকেন্দ্র দুটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সঞ্চালন গ্রিড থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কমে গেছে।

তিনি বলেন, ‘একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার টিউব লিক হয়ে যাওয়ার কারণে উৎপাদন বন্ধ করতে হয়েছে। অন্যদিকে, বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র উত্তাল থাকার কারণে কয়লা খালাস করা সম্ভব না হওয়ায় আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন আংশিক বন্ধ হয়ে গেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এতে আমাদের সঞ্চালন লাইন থেকে প্রায় ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ নাই হয়ে গেছে। সংসদে এই বিবৃতি দেওয়ার আগে আমি বিরোধীদলীয় নেতা ড. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি।’

এ পরিস্থিতিকে জাতীয় সংকট হিসেবে উল্লেখ করে এটি কাটিয়ে উঠতে তিনি সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান।

একইসঙ্গে আগামী দুইদিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং লোডশেডিংয়ের তীব্রতা কমে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।