৮ দিনের ব্যবধানে ফের বৃষ্টিতে ডুবল খুলনা শহর, ড্রেনেজ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন

দীপংকর রায়
দীপংকর রায়

মাত্র আট দিনের ব্যবধানে আবারও বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে খুলনা শহরের বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল।

নগরীর অনেক এলাকায় হাঁটুসমান, কোথাও কোথাও তারও বেশি।  গত রাতে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, রিকশা ও ইজিবাইকচালক—সবাইকে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়া সহকারী মিজানুর রহমান জানান, গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকে আজ সকাল ৯টা পর্যন্ত ৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

এর আগে ১ জুলাই মাত্র ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই খুলনা শহরের বিস্তীর্ণ এলাকা তলিয়ে গিয়েছিল।

জলাবদ্ধতা

এ পরিস্থিতিতে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে নেওয়া প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। প্রকল্পের আওতায় গত সাড়ে পাঁচ বছরে সাতটি খাল খনন ও দুই শতাধিক ড্রেন নির্মাণ-সংস্কার করা হয়েছে।

‘শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতার সমাধান হয় না। কোথায় থেকে পানি আসবে, কোথায় যাবে, খালের ধারণক্ষমতা—এসব বিষয় নিয়ে সমন্বিত গবেষণা ছাড়া প্রকল্প নেওয়ার ফল এখন নগরবাসী ভোগ করছে।’

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নগরীর সামগ্রিক জলপ্রবাহ, খালের ধারণক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ নগরায়ণের বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। পর্যাপ্ত গবেষণা ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাবে অনেক স্থানে বড় প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত হয়ে ড্রেনে পরিণত হয়েছে।

খুলনা নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর শেখ বলেন, ‘এবার যতবার বৃষ্টি হচ্ছে, ততবারই আমাদের বাড়ির নিচতলায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি যাচ্ছে। আগেও বৃষ্টি হলে দুর্ভোগে পড়তাম, কিন্তু এক দিনে পানি সরে যেত। এখন বিপদ হয়েছে অন্য রকম, আমাদের এলাকায় পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই।’

জলাবদ্ধতা

‘প্রায় এক বছর আগে কবীর বটতলা থেকে কারিগরপাড়া পর্যন্ত আমাদের এলাকার সড়ক ও পাশের ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু বাড়িঘর থেকে ওই ড্রেনে বৃষ্টির পানি যাওয়ার কোনো কার্যকর সংযোগ রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠান ও নিচতলা পানিতে তলিয়ে যায়। অনেক বাড়ি যেন ছোট ছোট পুকুরে পরিণত হয়েছে। একবার পানি জমলে তা নামতে সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত সময় লাগে" বলেন তিনি।

আলমগীর আরও বলেন, ‘আগে বৃষ্টির পানি কিছুটা হলেও দ্রুত নেমে যেত। এখন রাস্তা ও ড্রেন উঁচু করায় আমাদের বাড়িগুলো নিচু হয়ে গেছে। পানি বের হওয়ার পথ পাচ্ছে না। এতে ব্যাহত হচ্ছে চলাচল। দীর্ঘদিন পানি জমে থাকায় ঘরের মেঝে, দেয়াল ও আসবাবপত্র নষ্ট হচ্ছে। দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, সেই সঙ্গে বেড়ে গেছে মশার উপদ্রব।’

নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তুহারা কাঁচা বাজারের মুদি দোকানি আব্দুর রব তার দোকানের সামনে হাঁটু সমান পানি দেখিয়ে দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, একটু বৃষ্টি হলেই সিটি করপোরেশনের এই কাঁচাবাজার ডুবে যায়। বাজারের ব্যবসায়ীদের নানা রকমের দুর্ভোগে পড়তে হয়।

‘বর্ষা হলেই আমার ব্যবসা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে যায়। হাঁটু সমান ময়লা পানি ভেঙে কেনাকাটা করতে কে এই বাজারে আসবে!’

তিনি বলেন, ‘অথচ বাজারের পাশেই একটা বড় ড্রেন আছে। দীর্ঘদিন ধরে এটার সংস্কার কাজ চলছে। এই বর্ষায়ও কাজ চলছে। এই কাজ কবে শেষ হবে তা তো জানি না! দুর্ভোগও যাবে না। কেসিসি কর্মকর্তারা যদি ঠিকাদারকে তাগিদ দিত, তাহলে এই কাজ আগেই শেষ হয়ে যেত।’

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, ‘শুধু ড্রেন নির্মাণ করলেই জলাবদ্ধতার সমাধান হয় না। কোথায় থেকে পানি আসবে, কোথায় যাবে, খালের ধারণক্ষমতা—এসব বিষয় নিয়ে সমন্বিত গবেষণা ছাড়া প্রকল্প নেওয়ার ফল এখন নগরবাসী ভোগ করছে।’

তিনি বলেন, গত ১৫ বছরে নগরীর তালতলা খালসহ অন্তত ১৩টি খালকে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। আগে যেসব খালের প্রস্থ ৬০ থেকে ৭০ ফুট, কোথাও কোথাও ১০০ ফুট পর্যন্ত ছিল, সেগুলো এখন মাত্র ১২ থেকে ১৩ ফুট প্রশস্ত ড্রেনে পরিণত হয়ে গেছে। পাশাপাশি খালের দুই পাশের বড় অংশ স্থানীয় মানুষের চলাচলের জন্য সড়ক হিসেবে রেখে দেওয়ায় পানি ধারণ ও প্রবাহের জায়গা অনেক কমে গেছে। ফলে অল্প সময়ে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন সম্ভব হচ্ছে না।

জলাবদ্ধতা

খুলনার নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘খাল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নদী-খাল ভরাট, জলাধার দখল ও জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি শহরে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।’

‘আমার নিজের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে। গত রাতের বৃষ্টিতে স্কুলের পাঁচটি শ্রেণির কক্ষ হাঁটু সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। এ রকম অবস্থা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রেও তৈরি হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি।

শিলু আরও বলেন, আগে দেখেছি ড্রেনের নিচের অংশ কংক্রিটের ঢালাই দিতো না সিটি করপোরেশন। ড্রেনের পানি মাটি চুইয়ে ভূ-গর্ভে চলে যেত। এখন ড্রেনের নিচের অংশও বেঁধে দেওয়া হচ্ছে। আবার পরিষ্কার না করায় পলিথিন-পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ফলে ড্রেনে পানির জমে থাকছে।

‘শুধু নতুন অবকাঠামো নির্মাণ নয়, ড্রেন ও খালের কার্যকারিতা বজায় রাখতে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

নগরীর ৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর চৌরাস্তা এলাকার ইজিবাইকচালক ছোটন গাজী বলেন, ‘বর্ষাকালে বৃষ্টি হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যোগ হয়েছে জলাবদ্ধতার ভোগান্তি। আজ সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে বিপদে পড়েছি। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। বয়রা বাজারের কাছে একটি গ্যারেজে রেখে চলে আসছি।’

এদিকে নতুন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অধিকাংশ ড্রেনের ওপর কংক্রিটের ঢাকনা বা স্ল্যাব বসানো হয়েছে। এতে ওপরের অংশে যানবাহন ও মানুষের চলাচল সহজ হলেও ড্রেন পরিষ্কার করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি) সূত্র অনুসারে, নগরীতে মোট ড্রেনের দৈর্ঘ্য প্রায় এক হাজার ১৬৫ কিলোমিটার।

খুলনা সিটি করপোরেশনের 'খুলনা শহরের জলাবদ্ধতা দূরীকরণে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন (১ম পর্যায়)' শীর্ষক ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের আওতায় গত কয়েক বছরে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ হয়েছে।

এই প্রকল্পের পরিচালক খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম ডেইলি স্টারকে বলেন, এই প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ১৪৭ কিলোমিটার ১৬৯টি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। এর সবগুলোই ঢাকনাযুক্ত ড্রেন।

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রধান কনজারভেন্সি অফিসার মো. আনিসুর রহমান বলেন, আমরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছি। গত কয়েক দিনের বৃষ্টির কারণে আমরা আপাতত এই কাজ বন্ধ রেখেছি। কারণ ড্রেন থেকে তোলা নরম কাদা মাটি বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে আবার ড্রেনে চলে যাচ্ছে।

‘খুলনার জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, এটি একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক বছরে অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ দুটোই কমে গেছে। একইসঙ্গে নদী-খালের সঙ্গে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।’

‘তাছাড়া নতুন নির্মিত ঢাকনাযুক্ত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি বা বিশেষায়িত মেশিন সিটি করপোরেশনের কাছে নেই। ফলে শ্রমিকরা ভারী স্ল্যাব একটা একটা করে খুলে পরিষ্কার করেন। এটা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। অনেক স্থানে আবর্জনা জমে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। চলমান প্রকল্পের আওতায় আধুনিক ময়লা পরিষ্কার করার যন্ত্র কেনার ব্যবস্থা রাখা আছে। যন্ত্র এলে পরিষ্কার করার কাজটা আরও সহজ হবে,’ যোগ করেন তিনি।

সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড পার্টিসিপেটরি রিসার্চের (সিইপিআর) চেয়ারপারসন হিসেবে কাজ করছেন গৌরাঙ্গ নন্দী। এ প্ল্যাটফর্ম জলবায়ু পরিবর্তন, পরিবেশ সংরক্ষণ, নগর পরিকল্পনা, নদী-খাল রক্ষা ও জ্বালানি নীতি নিয়ে কাজ করে।

গৌরাঙ্গ ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘খুলনার জলাবদ্ধতার মূল কারণ শুধু অপর্যাপ্ত ড্রেন নয়, এটি একটি পরিকল্পনাগত সংকট। গত কয়েক বছরে অনেক প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তর করা হয়েছে। এতে পানির ধারণক্ষমতা ও স্বাভাবিক প্রবাহ দুটোই কমে গেছে। একইসঙ্গে নদী-খালের সঙ্গে শহরের নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি।’

‘শুধু নতুন ড্রেন নির্মাণ করে টাকার অপচয় করলে হবে না, প্রাকৃতিক খালের ধারণক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, আধুনিক রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু ও নদী-খালের সঙ্গে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগ নিশ্চিত করা না গেলে খুলনার জলাবদ্ধতা থেকে স্থায়ী মুক্তি মিলবে না। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অল্প সময়ে ভারী বৃষ্টিপাত বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে,’ বলেন তিনি।