ঐতিহ্য ফেরাতে চলনবিলে পুঁথি পাঠের আসর

নিজস্ব সংবাদদাতা, পাবনা

বিদ্যুতের আলোয় ঝলমল করে এখন গ্রামবাংলার রাত। হাতে হাতে স্মার্টফোন, ঘরে ঘরে টেলিভিশন-ইন্টারনেট। অথচ পাবনার চাটমোহরের একটি গ্রামে বৃহস্পতিবার রাতে যেন ফিরে এসেছিল বহু বছর আগের সেই চেনা দৃশ্য।

উঠানে কুপি ও হারিকেনের আলো, মাটিতে বিছানো হোগলা পাটি আর চারপাশে গোল হয়ে বসে আছেন সবাই। তাদের কারও হাতে মোবাইল নেই, নেই টেলিভিশনের শব্দ। সবার মনোযোগ পুঁথি পাঠে।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাতে চাটমোহর উপজেলার বিলচলন ইউনিয়নের সোনাহারা পাড়া গ্রামে বসেছিল ঐতিহ্যবাহী পুঁথি পাঠের এই আসর। হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন দেখতে সেখানে জড়ো হন গ্রামের নানা বয়সী মানুষ।

বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

এ বিষয়ে স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠক ডা. এস এম আতিকুল আলম বলেন, পুঁথি পাঠ গ্রামবাংলার বহু পুরোনো লোকঐতিহ্য। একসময় সারাদিনের কাজ শেষে গ্রামের মানুষ পুঁথি পাঠের আসরে জড়ো হতেন। শিল্পীদের কণ্ঠের সুরে গল্প শুনে তারা বিনোদনের পাশাপাশি মানসিক প্রশান্তিও পেতেন।

হারিয়ে যেতে বসা লোকসংস্কৃতির এই আয়োজন দেখতে সেখানে জড়ো হন গ্রামের নানা বয়সী মানুষ। ছবি: সংগৃহীত

‘আধুনিক প্রযুক্তির বিস্তারে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে গেছে। পুরোনো দিনের সেই পরিবেশ ফিরিয়ে আনতেই এই আয়োজন,’ বলেন তিনি।

সেদিন কুপি ও হারিকেনের আলোয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আসাদুজ্জামান দুলাল পাঠ করেন কালজয়ী পুঁথি ‘হানিফ পালোয়ান ও বিবি সোনাভান’।

পরে ঐতিহ্য সংগ্রাহক মো. লইমুদ্দিন প্রামাণিক শোনান গাজী কালু ও চম্পাবতীর গল্প।

বিভিন্ন বয়সের মানুষ মাটিতে পাটি বিছিয়ে বসে উপভোগ করেন পুঁথি পাঠ। অনেকের কাছেই এটি ছিল পুরোনো দিনের গল্প শোনার সুযোগ, আবার তরুণদের কাছে ছিল গ্রামবাংলার হারিয়ে যেতে বসা একটি সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন করে পরিচিত হওয়ার অভিজ্ঞতা।

বাংলা পুঁথি সাহিত্যের রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। সপ্তদশ শতকের শেষভাগ ও অষ্টাদশ শতকের শুরুর দিকে কবি ফকির গরীবুল্লাহর ‘আমির হামজা’ পুঁথির মাধ্যমে এ ধারার চর্চা ব্যাপকতা লাভ করে।

বিলুপ্তপ্রায় লোকসংস্কৃতি ও সাহিত্য ঐতিহ্য নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে এ আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ছবি: সংগৃহীত

পুঁথি সাহিত্যে আরবি, ফারসি ও স্থানীয় ভাষার মিশ্রণ তৎকালীন বাংলার লোকজ সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হয়ে আছে।

চাটমোহরের সমাজসেবক ও চলনবিল আন্দোলনের এসএম মিজানুর রহমান বলেন, আধুনিক প্রযুক্তির প্রভাবে পুঁথি পাঠের মতো লোকজ সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে। একসময় প্রায় প্রতিটি গ্রামেই পুঁথি পাঠের আসর বসত। এখন সেই পাঠকও খুব একটা পাওয়া যায় না। তরুণ প্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হওয়া দরকার।

আসরটি আয়োজন ও সমন্বয়ে ছিলেন সজল বিশ্বাস, বিপ্লব আচার্য, নিয়মুল মুক্তা, প্রভাষক আব্দুল মান্নান, অম্লান ভট্টাচার্য, সৌরভ কুন্ডু ও শুভ কর্মকার।

আয়োজন শেষে স্থানীদের প্রত্যাশা ছিল, হারিয়ে যেতে বসা পুঁথি পাঠ যেন কেবল এক রাতের আয়োজন হয়ে না থাকে। প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে নিয়মিত এমন আসর বসুক, নতুন প্রজন্ম জানুক তাদের শিকড়ের গল্প, লোকসংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের কথা।