মাসুদ হত্যা মামলা: ২ বছরেও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবদুল্লাহ আল মাসুদকে পিটিয়ে হত্যার দুই বছর পরও মামলার তদন্তে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি।
মাসুদের মৃত্যুর চার দিন পর ২০২৪ সালের ১১ সেপ্টেম্বর তার বড় ভাই মো. বেহেস্তি রাজশাহী নগরের মতিহার থানায় অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা করেন।
এরপর মামলাটি থানা থেকে গোয়েন্দা শাখায় (ডিবি) এবং পরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) হস্তান্তর করা হয়। তবে তদন্তকারীরা এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি জানাতে পারেননি।
রাজশাহী পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (এসপি) মো. আব্দুল জলিল দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘২০২৫ সালের জুনে মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। তবে এ মামলায় এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে আমি মন্তব্য করতে পারছি না। তদন্ত কর্মকর্তা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।’
মামলায় কোনো আসামিকে শনাক্ত করা হয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেদিন থানায় অনেক মানুষ ছিল। কিন্তু তাদের কাউকে আসামি করা হয়নি। ভিডিও দেখে ইচ্ছেমতো কাউকে আসামি হিসেবে শনাক্ত করা যায় না। আমাদের তদন্ত করতে হবে।’
মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক জালাল উদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘আমি রাজশাহীর বাইরে আছি। তাই তদন্তের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে পারছি না।’
শনিবার পিবিআই কার্যালয়ে গেলে পরিদর্শক জালাল উদ্দিন বলেন, ‘তদন্তের স্বার্থে আমরা কোনো তথ্য দিতে পারি না। তদন্ত চলমান থাকায় বিষয়টি এখনো অত্যন্ত গোপনীয়। শুধু বলতে পারি, আমাদের তদন্ত চলছে।’
এর আগে জালাল উদ্দিন ডেইলি স্টারকে বলেছিলেন, ‘কয়েকবার চেষ্টা করেও বাদীর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ফলে তদন্তে তেমন অগ্রগতি হয়নি।’
ওই সময় তিনি আরও বলেন, ‘এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার আগে আমাকে মামলার নথি পর্যালোচনা করতে হবে।’
তবে মাসুদের পরিবার এ দাবি নাকচ করেছে।
মাসুদের স্ত্রী বিউটি আরা বেগম বর্তমানে তাদের একমাত্র মেয়েকে নিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে থাকেন।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের পর তদন্তকারীরা মাত্র দুবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। সর্বশেষ যোগাযোগ হয় ২০২৫ সালে। এরপর থেকে মামলার বিষয়ে কেউ আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেনি।
তিনি আরও বলেন, ‘ন্যায়বিচার পাওয়ার আশা প্রায় ছেড়েই দিয়েছি।’
এদিকে, মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা পুলিশ কর্মকর্তারাও জানিয়েছেন, বর্তমানে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তেমন কোনো তথ্য নেই।
২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় চার দিনের মেয়ের জন্য ওষুধ কিনতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন বিনোদপুর বাজারে গেলে মাসুদের ওপর হামলা করে একদল লোক।
পরে তাকে গুরুতর আহত অবস্থায় বোয়ালিয়া থানায় সোপর্দ করা হয়। সেখান থেকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
মাসুদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের (বর্তমানে নিষিদ্ধ) সাবেক সহসম্পাদক ও সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সদস্য ছিলেন।
মৃত্যুর মাত্র পাঁচ দিন আগে কন্যাসন্তানের বাবা হয়েছিলেন মাসুদ।
এর আগে ২০১৪ সালের এপ্রিলে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আরেকটি নৃশংস হামলা থেকে বেঁচে যান মাসুদ। ওই হামলায় তার ডান পা গোড়ালির নিচ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একটি হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়।
পরে তিনি কৃত্রিম পা ব্যবহার করতেন। ২০২৪ সালের গণপিটুনির সময় তার অবশিষ্ট পাটিও ভেঙে দেওয়া হয়।
অনেক বছর বেকার থাকার পর ২০২২ সালে সরকারি চাকরির জন্য তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখেছিলেন মাসুদ। সেসময় বিষয়টি গণমাধ্যমে আলোচনায় আসে।
তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুপারিশের পর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ২০২২ সালের ডিসেম্বরে তাকে মেডিকেল সেন্টারের স্টোর কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সেখানে কর্মরত ছিলেন।