মন্ত্রীর ঘোষণার পরও অগ্রিম কর পরিশোধের প্রণোদনা থেকে বঞ্চিত হতে পারেন যে কারণে

মো. আসাদুজ্জামান
মো. আসাদুজ্জামান

চলতি অর্থবছরের বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের, বিশেষ করে যারা সময়মতো ও আগেই রিটার্ন জমা দেন, তাদের জন্য সুখবর দিয়েছিলেন।

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছিলেন, সব শ্রেণির করদাতাই সারা বছর রিটার্ন জমা দিতে পারবেন। আর যারা বছরের শুরুতেই রিটার্ন জমা দেবেন, তারা কর প্রণোদনা হিসেবে রেয়াত পাবেন।

কিন্তু এখানেই রয়েছে একটি জটিলতা। যে করদাতারা জুনের আগেই তাদের পুরো আয়কর পরিশোধ করে ফেলেছেন, তারা নতুন ঘোষিত আগাম রিটার্ন জমার ক্ষেত্রে ঘোষিত ৫ শতাংশ প্রণোদনা বা রেয়াত থেকে বঞ্চিত হতে যাচ্ছেন।

করদাতা, কর বিশেষজ্ঞ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক কর্মকর্তারা বিষয়টি নিয়ে সমতার প্রশ্ন তুলেছেন।

অর্থ আইন ২০২৬ এ বলা হয়েছে, যারা ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দেবেন, তারা ‘প্রদেয় করে’র ৫ শতাংশ অথবা সর্বোচ্চ ২৫ হাজার টাকা (যেটি কম হয়) রেয়াত পাওয়ার যোগ্য হবেন।

এখানে সমস্যাটি দেখা দিয়েছে 'মোট কর দায়ের' পরিবর্তে 'প্রদেয় কর' শব্দগুচ্ছ ব্যবহার করায়।

ধরা যাক, একজন করদাতার মোট করের পরিমাণ ৫ লাখ টাকা, যা তিনি অগ্রিম কর বা উৎসে কর কাটার মাধ্যমে পুরোটাই পরিশোধ করেছেন।

তিনি যখন রিটার্ন জমা দেবেন, তখন সমন্বয়ের পর তার আর কোনো 'প্রদেয় কর' অবশিষ্ট থাকবে না। ফলে তার রেয়াত পাওয়ার কোনো সুযোগই নেই।

অন্যদিকে, একই পরিমাণ কর দায় থাকা সত্ত্বেও এবং অগ্রিম রিটার্ন জমার সময় বকেয়া থাকলেও 'প্রদেয় করের' অংশ হিসেবে পুরো ২৫ হাজার টাকা রেয়াত পাওয়া সম্ভব।

কর আইনজীবীদের মতে, এই বিধানটির মাধ্যমে যাদের পুরস্কৃত হওয়ার কথা, উল্টো তারা নিরুৎসাহিত হতে পারেন।

ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের সভাপতি ও কর বিশেষজ্ঞ সাব্বির আহমেদ দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'উদ্দেশ্য যদি হয় স্বেচ্ছায় কর পরিশোধকে উৎসাহিত করা, তাহলে যে করদাতারা ইতোমধ্যে কর পরিশোধ করেছেন তাদের অসুবিধায় ফেলা উচিত নয়।'

'দেরিতে করদাতাদের দ্রুত রিটার্ন জমা দিতে উৎসাহিত করা, আর আগে থেকেই কর পরিশোধকারী অনুগত করদাতাদের পুরস্কৃত করার মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য থাকা উচিত,' বলেন তিনি।

এই বিষয়টি চাকরিজীবীদের জন্য বেশি প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে সারা বছর ধরে যাদের কর উৎসে কেটে নেওয়া হয় এবং যেসব করদাতা আনুমানিক দায়ের বিপরীতে অগ্রিম কর প্রদান করে থাকেন। কারণ পরে চূড়ান্ত দায়ের সঙ্গে এই করের অর্থ সমন্বয় করা হয়।

এনবিআরের সাবেক সদস্য সৈয়দ মো. আমিনুল করিম বলেন, এই বিধানটি ইক্যুইটি বা সমতার প্রশ্ন তোলে।

তিনি ডেইলি স্টারকে বলেন, 'একজন ব্যক্তি ভালো করদাতা এবং আগেই কর দিয়েছেন, তাহলে তিনি নতুন বিধানের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। আর যিনি কর দেননি, তিনি লাভবান হবেন। এটি ন্যায়বিচারের নীতি লঙ্ঘন করে।'

আমিনুল করিম বলেন, 'আইন সংশোধনের প্রয়োজন নেই, পরিপত্রের মাধ্যমে একটি ব্যাখ্যা দিলেই সমস্যার সমাধান হতে পারে।'

'আইন পরিবর্তন করতে হবে এমন নয়। পরিপত্রের ব্যাখ্যায় পরিবর্তন আনতে হবে। যারা নিয়মিত কর দেন তারা অসুবিধায় পড়ছেন বলে আমি মনে করি এটি একটি ভুল এবং এটি সংশোধন করা উচিত,' যোগ করেন তিনি।

এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেস লিমিটেডের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, এই বিধানের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন চাকরিজীবীরা, যাদের কর শতভাগ উৎসে কেটে সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়।

তিনি বলেন, 'নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরতদের শতভাগ কর কেটে সরকারি কোষাগারে জমা হয়। সুতরাং, প্রকৃতপক্ষে নিয়ম মেনে চলা করদাতাদের আপনি শাস্তি দিচ্ছেন আর অনিয়মিতদের পুরস্কৃত করছেন।'

তিনি নিট প্রদেয় পরিমাণের বদলে মোট কর দায়ের ওপর ভিত্তি করে প্রণোদনা হিসাব করার পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, 'এটি মোট পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত ছিল, কারণ আপনি যেভাবেই হোক ২৫ হাজার টাকার বেশি রেয়াত দিচ্ছেন না। যেহেতু এটি নিট পরিমাণের ওপর নির্ভর করছে, তাই এটি একটি বৈষম্য তৈরি করছে।'

রিটার্ন জমার সময়সীমা বারবার বাড়ানোর চর্চা বন্ধ করতে ব্যক্তি করদাতাদের রিটার্ন জমার কাঠামোতে পরিবর্তনের অংশ হিসেবে এনবিআর এই প্রণোদনা চালু করেছিল।

নতুন বিধান অনুযায়ী, ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন জমা দিলে কোনো কর রেয়াত পাওয়া যাবে না। এ ছাড়া ডিসেম্বরের পর রিটার্ন জমা দিলে করদাতাদের অতিরিক্ত কর পরিশোধ করতে হবে।

১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে জমা দিলে প্রদেয় করের ওপর ২ শতাংশ বা ৩ হাজার টাকা (যেটি বেশি হয়) অতিরিক্ত দিতে হবে। আর ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে জমা দিলে প্রদেয় করের ৫ শতাংশ বা ৫ হাজার টাকা (যেটি বেশি হয়) অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে।

বাজেট প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনবিআরের এক কর্মকর্তা জানান, প্রণোদনা ও অগ্রিম করের শর্তগুলো বুঝতে নতুন বিধানগুলো একসঙ্গে পড়তে হবে।

তিনি বলেন, 'যে পরিমাণ অগ্রিম কর প্রদেয়, তা জুনের মধ্যেই দিতে হবে। তা না হলে বকেয়া অংশের ওপর অতিরিক্ত কর আরোপ করা হবে। যেমন, একজন ব্যক্তির প্রদেয় কর যদি হয় ১০০ টাকা এবং তিনি যদি জুনের মধ্যে ৯০ টাকা দেন, তবে অবশিষ্ট ১০ টাকার ওপর তাকে কর দিতে হবে।'

যেসব করদাতা ইতোমধ্যে পুরোটাই পরিশোধ করেছেন তাদের জন্য এটি বৈষম্যমূলক কি না—জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'আমরা এই খাতে সমতা নিশ্চিত করছি।' বিষয়টি সম্পর্কিত সব বিধান একসঙ্গে দেখলে পরিষ্কার হবে বলেও জানান তিনি।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এনবিআরের আরেক এক কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিক পরিকল্পনাটি ছিল আরও ব্যাপক।

তিনি বলেন, 'শুরুতে পুরো কর দায়ের ওপরই রেয়াত দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তা কমানো হয়েছে।'

'কর আইন সংশোধন করা ছাড়া আপাতত এই সমস্যা সমাধানের কোনো পথ নেই,' বলেন তিনি।