মধুমতীর ভাঙনে বিলীন বসতভিটা, যাওয়ার জায়গা নেই পরিবারগুলোর
‘আমার সাত ছেলের ঘরই ভেঙে গেছে। সবাই এক জায়গায় থাকতাম। এখন আমাদের কোনো জায়গা নেই’— বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন প্রায় ৭০ বছর বয়সী হেমেলা বেগম।
মধুমতী নদীর ভাঙনে একে একে তার সাত ছেলের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। ভেঙে গেছে তার দুই নাতির ঘরও। চোখের সামনে সব হারিয়ে দিশেহারা এই নারী।
গত শুক্রবার থেকে গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার জালালাবাদ ইউনিয়নের ইছাখালী গ্রামের ডুবসী ও শিকদারপাড়া এলাকায় মধুমতী নদীর বাঁ তীরে ভাঙন শুরু হয়েছে।
ভাঙনে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৩০টি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২০টি পরিবারের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। আরও ১১টি পরিবার নদীর পাড়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এফ এম মারুফ রেজা।
তিনি দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘এবার তুলনামূলকভাবে বেশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা ভাঙনের কবলে পড়েছে এবং ভাঙনের গতি বেশি। ফলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি হচ্ছে। গত পাঁচ দিনে ১২০ বিঘার বেশি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।’
স্থানীয়দের অভিযোগ, ভাঙন চললেও গত পাঁচ বছরে তা ঠেকাতে স্থায়ী কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এই সময়ে শতাধিক পরিবার নড়াইলে চলে গিয়ে ‘পার ইছাখালী’ নামে নতুন গ্রাম গড়ে তুলেছে। তাদের হিসাবে, পাঁচ বছরে প্রায় ৫০০ বিঘা জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
হেমেলা বেগম বলেন, ‘যেদিন ভাঙন শুরু হয়, সেদিন আসরের সময় অজু করতে ঘরে এসেছিলাম। তখন ছেলের বউ বলছিল— মা আসেন, সব চলে যাচ্ছে।’
‘সেদিনই পাঁচটি ঘর নদীতে চলে যায়। পরদিন আরও ঘর ভেঙেছে। এখন আমাদের কোনো জায়গা নেই। কোথায় যাব, কীভাবে থাকব, কিছুই জানি না। এবার ভাঙন এত তাড়াতাড়ি হয়েছে যে চোখের সামনে ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেছে। কিছু মালামাল সরাতে পেরেছি, বাকিটা পারিনি।’
শুধু হেমেলা নন, অনিশ্চয়তায় রয়েছেন নদীপাড়ের বাসিন্দা সাগরিকা বেগমও। চারবার নদীভাঙনের কবলে পড়েছেন তিনি। এবার তার বর্তমান ঘরটিও ভাঙনের কবলে পড়তে যাচ্ছে। মালামাল সরিয়ে নিতে পারলেও ঘর সরিয়ে নেওয়ার মতো সামর্থ্য নেই তার।
সাগরিকা বেগম (৪৫) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ঘরের মালামাল সরিয়ে নিয়েছি, এখন শুধু ঘরটুকু নদীর পাড়ে পড়ে আছে। এর আগে চারবার নদীতে আমার ঘর গেছে।’
তিনি বলেন, ‘স্বামী মারা গেছেন। আছে শুধু একটি ছেলে। আমাদের যাওয়ার মতো আর কোনো জায়গা নেই। সাহায্য না পেলে আমাদের চলে যেতে হবে।’
ভাঙনে ঘর হারিয়ে নদীর পাড়েই দিন-রাত কাটাচ্ছেন কৃষক রহমত। তার ছয়-সাতটি ঘরসহ বাড়ির প্রায় সবকিছু নদীতে চলে গেছে।
ক্ষতিগ্রস্ত রহমত আলী শেখ (৪২) দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত শুক্রবার থেকে ব্যাপক ভাঙন হচ্ছে। কেউ খোঁজ নেয়নি। অন্য কোথাও ঘর তোলার জায়গা নেই, তাই বাধ্য হয়ে নদীর পাড়েই থাকছি।’
গোপালগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মো. জাকারিয়া ফেরদৌস দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘জালালাবাদ ইউনিয়নের ডুবসী মোল্লাপাড়া ও শিকদারপাড়ায় প্রায় ৪০০ মিটার এলাকায় ভাঙন দেখা দিয়েছে। সেখানে চার হাজার জিও ব্যাগ সরবরাহ করে বালু ফেলা হয়েছে। দ্রুত ভাঙন প্রতিরোধের কাজ শুরু হবে।’
তিনি বলেন, ‘এর আগে ২৫০ মিটার এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। নতুন ৪০০ মিটার এলাকায় কাজের অনুমোদন দ্রুত পাওয়া গেলে ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।’