কুড়িগ্রামে সারের দাবিতে আন্দোলনে মামলা: কৃষকেরা ঘরছাড়া

এস দিলীপ রায়
এস দিলীপ রায়
সুকান্ত হালদার
সুকান্ত হালদার

সারের দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে মামলা হওয়ার পর কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার অন্তত পাঁচটি গ্রামের কৃষকেরা এখন গ্রেপ্তার ও হয়রানির আতঙ্কে দিন পার করছেন।

এই মাসের শুরুতে সারের দাবিতে বিক্ষোভের সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করার ঘটনায় এই মামলা দায়ের করা হয়। মামলায় ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও ৫০ থেকে ৬০ জনকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন দুজন। আট দিন কারাগারে থাকার পর তারা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

তবে অনেক কৃষক জানিয়েছেন, রাতে পুলিশের অভিযানের ভয়ে তারা এখন বাড়িতে ঘুমাচ্ছেন। এ কারণে মাঠে আমন ধান ও শীতকালীন সবজির খেতে ঠিকমতো পরিচর্যা করাও সম্ভব হচ্ছে।

যেভাবে ঘটনার শুরু

গত ৭ সেপ্টেম্বর বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের গোনাইয়ের কুটি গ্রামে সার ডিলার আমজাদ হোসেনের দোকানের বাইরে শত শত কৃষক জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

কৃষকদের অভিযোগ, আমন ধান চাষের জন্য সারের ব্যাপক চাহিদা আছে। তবে তাদেরকে মাত্র পাঁচ থেকে সাত কেজি করে সার দেওয়া হচ্ছিল। অনেকে জানান, কয়েকবার দোকানে গিয়েও তারা সার পাননি। অনেকেই স্বজনপ্রীতির অভিযোগও তোলেন।

একপর্যায়ে বিক্ষোভকারীরা বাঁশ ও আবর্জনায় আগুন দিয়ে রাস্তা অবরোধ করেন। পরে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার ঘটনাস্থলে গেলে একদল কৃষক তাকে কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ করে রাখেন। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে। পরদিন আবদুল জব্বার ভূরুঙ্গামারী থানায় মামলাটি দায়ের করেন।

আতঙ্কে গ্রামবাসী

গত শুক্রবার বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়নের পাঁচটি গ্রাম ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্কিত দেখা যায়।

গোনাইয়ের কুটি গ্রামে খেতে কাজ করা কয়েকজন কৃষক প্রথমে কথা বলতেই রাজি হননি; সাংবাদিককে তারা সাদাপোশাকের পুলিশ বলে ভুল করেছিলেন। ৫৫ বছর বয়সী কৃষক শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমরা ভেবেছিলাম আপনারা থানা থেকে এসেছেন। ভয় পেয়ে কিছুক্ষণ আগেই তিন কৃষক কাজ ফেলে চলে গেছেন।’

একই চিত্র দেখা যায় কৃষকদের বাড়িতে গিয়েও। বাড়ির ভেতরে থাকা পুরুষ সদস্যদের ডাকার আগে পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা সবার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে নিচ্ছিলেন।

গ্রামবাসীরা জানান, অনেক পুরুষ এখন দিনের বেলা খেতে কাজ করলেও রাতে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গিয়ে ঘুমাচ্ছেন। এমনকি গ্রেপ্তারের ভয়ে সারের ডিলারের কাছেও যাচ্ছেন না অনেকে।

গোনাইয়ের কুটি মধ্যপাড়া গ্রামের শিউলি বেগম (৩৪) জানান, মামলায় নাম আসার পর থেকে গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে তার স্বামী সুলতান মোল্লা বাড়িতে থাকছেন না। দেড় বিঘা জমিতে আমন ধান আর এক বিঘায় বেগুন চাষ করেছেন তিনি। তবে অনিশ্চয়তার কারণে জমিতে কাজে যেতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘আদালতের খরচ চালানোর মতো টাকা নেই বলে আমরা আগাম জামিনের ব্যবস্থাও করতে পারছি না।’

৬২ বছর বয়সী কৃষক কলিম উদ্দিন জানান, এই মামলায় তার ছোট ভাই আবদুস সালামকেও আসামি করা হয়েছে। ভয়ে সে এখন বাড়িছাড়া। তিনি বলেন, ‘আমি দিনে খেতে কাজ করলেও রাতে আত্মীয়ের বাড়িতে থাকি। পুলিশ প্রতি রাতেই অভিযান চালাচ্ছে।’

মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া দুই কৃষক হাজতবাসের অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলন, জেল থেকে বের হওয়ার পর থেকে তারা আর কাজে মন বসাতে পারছেন না। ৪৭ বছর বয়সী আল আমিন মোল্লা আট দিন জেলে থাকার পর জামিন পেয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অনেক কষ্ট পেয়েছি। ওই দিনগুলোর কথা কোনো দিন ভুলব না।’ তার স্ত্রী রওশন আরা বেগম জানান, স্বামীকে ছাড়িয়ে আনতে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।

আরেক কৃষক সুরুজ মিয়াও (৪৫) আট দিন জেল খেটে জামিনে বাড়ি ফিরেছেন।

বঙ্গসোনাহাট ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জহুরুল ইসলাম জানান, এই মামলার কারণে বেশ কয়েকটি গ্রামে আতঙ্ক ছড়িয়েছে। মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘অনেক কৃষক বাড়িছাড়া হয়ে আছেন। প্রয়োজনের তুলনায় কম সার পাওয়া নিয়ে প্রায় প্রতিবছরই এমন বিবাদ হয়।’

বঙ্গসোনাহাট ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান শাহজাহান আলী মোল্লাও মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় কৃষকেরা সারের জন্য বিক্ষোভ করেছেন, রাস্তা অবরোধ করেছেন। কৃষি কর্মকর্তাদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও আছে। সেখানে কোনো মামলা হয়নি। শুধু আমাদের ইউনিয়নেই মামলা দেওয়া হলো। কৃষকেরা এমনিতেই গরিব, তাদের এই বাড়তি ভোগান্তি থেকে রেহাই দেওয়া উচিত।’

তবে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবদুল জব্বার এ বিষয়ে বলেন, ‘বিক্ষোভের সময় আমার ওপর হামলা হয়েছিল। বিষয়টি এখন পুলিশের হাতে।’

ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বড় পরিসরে অভিযান চালানোর বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, ‘কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হবে না। ঘটনার ভিডিও ফুটেজ দেখে আসামিদের শনাক্ত করা হচ্ছে।’

ভূরুঙ্গামারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃতা দেবনাথ বলেন, ‘মামলার কারণে কোনো কৃষক বাড়ি ছেড়েছেন বলে আমার কাছে তথ্য নেই।’

কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক অন্নপূর্ণা দেবনাথ জানান, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং জেলা প্রশাসন সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নিচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যারা দোষী নন, তাদের ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন বগুড়া প্রতিনিধি মোস্তফা সবুজ]