অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে ৩৬৩ টন সিগারেটের কাঁচামাল খালাস, ২৪৫০ কোটি টাকা রাজস্ব ক্ষতি
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের ফিল্টার তৈরির প্রায় ৩৬৩ টন কাঁচামাল আমদানি ও অবৈধভাবে বাজারজাতের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা শনাক্ত করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) গোয়েন্দা দল।
এসব কাঁচামাল থেকে উৎপাদিত সিগারেট থেকে সরকার প্রায় ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকার রাজস্ব বঞ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
একইভাবে, আরও ৪টি অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের কাঁচামাল আমদানির তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। এসব প্রতিষ্ঠানের আমদানি তথ্য ও ব্যাংক হিসাবের তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকে চিঠি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি, এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআিইসি) চট্টগ্রাম কাস্টম বন্দর দিয়ে খালাসের অপেক্ষায় থাকা সিগারেট তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ৪৮ টন অ্যাসিটেট স্ট্র'র চালান আটক করে। চালানটি গত ১৮ আগস্ট আমদানি করে মতিঝিল এলাকার ইউনিক ট্রেডার্স।
তবে, সরেজমিনে প্রতিষ্ঠানটির কোনো অস্তিত্ব পাননি কর্মকর্তারা। চালানটি খালাসের জন্য সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টে ফাইজ ট্রেডিং কোম্পানি লিমিটেডের মাধ্যমে আমদানি পর্যায়ে ১৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হয়েছে।
একইসঙ্গে ওই কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহার করা হলে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব সংশ্লিষ্ট হতে পারত বলে সিআইসির হিসাবে উঠে এসেছে।
অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের কাচামাল আমদানি করে ভ্যাট ফাঁকি ও অবৈধ সিগারেট তৈরি নতুন নয়। এ বিষয়ে ২০২৪ সালের ১ জুন ‘কাউন্সিলরের অবৈধ সিগারেট বাণিজ্য’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে দ্য ডেইলি স্টার। প্রতিবেদন প্রকাশের পর তৎকালীন শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল আলমকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কয়েক মাসের তদন্ত শেষে কমিটি ওই বছরের ডিসেম্বরে প্রতিবেদন দাখিল করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি চক্র অন্তত ২০টি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের নামে সিগারেটের কাঁচামাল আমদানি করে দেশে নকল সিগারেট তৈরি করছে। এতে ১১ টি প্রতিষ্ঠান অস্তিত্বহীন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ ধরনের আমদানি বন্ধে ভ্যাট নিবন্ধিত সিগারেট ও বিড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্যদের কাঁচামাল আমদানি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়। যদিও তখন ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের জন্য সিগারেটের কাঁচামালে আমদানি দ্বিগুণ শুল্ক আরোপ করে হলেও অবৈধ সিগারেট পুরোপুরি বন্ধ করা যায়নি।
সবশেষ গত ২৪ আগস্টের গেজেটের মাধ্যমে শুধু সিগারেট ও বিড়ি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে সিগারেটের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ দেওয়া হয়।
নাম প্রকাশ না করে সিআইসির এক কর্মকর্তা দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, 'গত ২৪ আগস্টের গেজেট অনুযায়ী কোনো ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানের সিগারেটের কাঁচামাল আমদানির সুযোগ নেই। তবে প্রতিষ্ঠানটি যেহেতু গেজেটের আগে আমদানি করেছে তাই তাদের পণ্য খালাসের সুযোগ ছিল। কিন্তু আমাদের কাছে তথ্য থাকায় সেটি আটক করি। কোনো আমদানিকারক সাড়া না দেওয়ায় সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট আমাদের সঙ্গে দেখা করেন এবং এ চালানের জড়িত রাজস্ব পরিশোধ করেন।'
তিনি বলেন, 'অতীতে খালাস নেওয়া ৩৬৩ টন কাঁচামাল কোথায় বিক্রি করেছে তার হিসাব দেওয়ার পাশাপাশি বিক্রি থেকে ভ্যাট পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। তা করতে পারলে চালানটি খালাসের সুযোগ নেই।'
আমদানি নথি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইউনিক ট্রেডার্স গত এক বছরে ৩৬৩ টন সিগারেট কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব কাঁচামালের প্রকৃত ব্যবহার ও সরবরাহ চেইন নিয়ে অনুসন্ধান করছে এনবিআর।
সংস্থাটির প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, পুরো আমদানির কাঁচামাল স্থানীয়ভাবে সিগারেট উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়ে থাকলে প্রায় ২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা রাজস্ব ঝুঁকিতে পড়েছে।
এসব কাঁচামাল কারা ব্যবহার করেছে এবং করছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান কর্মকর্তারা।
সিআইসি থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, দুটি সিগারেট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের মূল্য ঘোষণা নথিপত্র অনুযায়ী প্রতি কেজি অ্যাসিটেট স্ট্র থেকে প্রায় ৮ হাজার ৯৩৭ শলাকা সিগারেট উৎপাদন সম্ভব। এ হিসাবে ৪৮ হাজার ১৪৩ কেজি অ্যাসিটেট স্ট্র দিয়ে প্রায় ৪৩ কোটি ২ লাখ ৫৪ হাজার শলাকা সিগারেট উৎপাদন করা সম্ভব। ১০ শলাকার প্রতি প্যাকেট হিসাবে এতে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার প্যাকেট সিগারেট উৎপাদন করা যেত।
প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মিডিয়াম সেগমেন্টের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ৯২ টাকা এবং স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে মূসক ও সম্পূরক শুল্কসহ প্রযোজ্য রাজস্বের হার প্রায় ৮২ শতাংশ ধরে হিসাব করে সংস্থাটি এতে প্রায় ৩২৪ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হতো।
অন্যদিকে, হাই সেগমেন্টের সিগারেটের প্রতি প্যাকেটের খুচরা মূল্য ১৬০ টাকা ধরে একই হারে হিসাব করলে সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়ায় প্রায় ৫৬৪ কোটি টাকা।
