যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব বাণিজ্যকে ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে: রেহমান সোবহান
যুক্তরাষ্ট্র ও এর নেতৃত্বাধীন প্রভাবশালী দেশগুলো বিশ্ব বাণিজ্যকে আবারও ঔপনিবেশিক যুগে নিয়ে যাচ্ছে। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় তারা দুর্বল দেশগুলোকে ভয় দেখিয়ে নিজেদের পণ্য কিনতে বাধ্য করছে।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক রেহমান সোবহান এসব কথা বলেছেন। আজ রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন’-এর ‘দ্য নিউ ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক ডিসঅর্ডার’ শীর্ষক অধিবেশনে তিনি এ মন্তব্য করেন।
রেহমান সোবহান বলেন, আমরা বাণিজ্যের ঔপনিবেশিক মডেলে ফিরে যাওয়া দেখছি। শুল্কের চাপে পণ্য কিনতে বাধ্য হচ্ছে অনেক দেশ।
রেহমান সোবহান বলেন, আপনার পণ্য কিনতে বাধ্য করার মানে হলো, আপনি আর প্রতিযোগিতামূলকভাবে উৎপাদন করতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক উদ্দেশ্যেও শুল্ক ব্যবহার করছে। রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্য করায় তারা ব্রাজিল, কানাডা, চীন এবং এমনকি ভারতকেও চাপে রাখছে।
তার মতে, এশিয়ার দেশগুলোর উত্থানের বিপরীতে এটি পাশ্চাত্যের ‘বিকৃত’ প্রতিক্রিয়া।
তিনি বলেন, উপনিবেশবাদের সময় দেশ দখলের মাধ্যমে বাজার কুক্ষিগত করা হতো। কিন্তু এশিয়ার উত্থান ঘটেছে মূলত ‘বাজারের নিয়মেই’। এর প্রতিক্রিয়ায়, প্রতিযোগিতার বদলে বাজারেই হস্তক্ষেপ করছে পুরোনো শক্তিগুলো।
১৮৯০-এর দশকে প্রেসিডেন্ট উইলিয়াম ম্যাকিনলি বাজার সুরক্ষার মাধ্যমে মার্কিন শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। সেই উদাহরণ টেনে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত অর্থনীতির জন্য এটি এখন অচল কৌশল।’
রেহমান সোবহান বলেন, তারপরও এশিয়া অর্থনৈতিক বিশ্বের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। ক্রয়ক্ষমতার দিক থেকে চীন ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন তারা প্রধান অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবেও যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাবের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়েছে। ইসরায়েলকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ আখ্যা দিয়ে এই যুদ্ধের জন্য তাদের দায়ী করেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের আমদানি পণ্য এশিয়ার দেশগুলো থেকে এলেও রপ্তানি গুটিকয়েক বাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই তিনি এশিয়ার ‘ভ্যালু চেইনের’ সঙ্গে বাংলাদেশকে ওতপ্রতভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা নিশ্চিতভাবেই আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়াকে এসব দেশের ভ্যালু চেইনে যুক্ত করেছি। কিন্তু সেখানে আমাদের জন্য যেসব সুযোগ তৈরি হচ্ছে, সেগুলোর সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনাকে মেলাতে পারিনি।’
রেহমান সোবহান বলেন, ‘ভবিষ্যতের কৌশলগত পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা তেমন দক্ষ নই। আর এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে আরও বেশি অকার্যকর।’
তার মতে, বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলগত গুরুত্ব বঙ্গোপসাগরে নয়, বরং দেশের মধ্যেই নিহিত। পদ্মা ও যমুনা সেতু ব্যবহার করে বাংলাদেশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং শেষ পর্যন্ত ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
এর আগে আজ সকালে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) আয়োজিত এই ফোরামের পঞ্চম আসরের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিন দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক ফোরামে ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ২০০ জন বক্তা, ৩০০ জন প্রতিনিধি এবং ১ হাজারের বেশি অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছেন।